চিলকট রিপোর্ট ও ‘তাহাদের’ যুদ্ধাপরাধ
চিলকট রিপোর্ট ও ‘তাহাদের’ যুদ্ধাপরাধ

চিলকট রিপোর্ট ও ‘তাহাদের’ যুদ্ধাপরাধ

জি. মুনীর

‘ইরাক ইনকোয়ারি’ ছিল ব্রিটিশ সরকারের একটি তদন্ত। এই তদন্তের উদ্দেশ্য ছিল ইরাক যুদ্ধের ব্যাপারে কী ঘটেছিল তা অনুসন্ধান করে ভবিষ্যতের ব্রিটিশদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় চিহ্নিত করা। এটি ‘চিলকট ইনকোয়ারি’ নামেও অভিহিত হয়। কারণ, পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট এই তদন্ত কমিটির সভাপতি ছিলেন স্যার জন চিলকট। এই তদন্ত চলে প্রিভি কাউন্সিলরদের দিয়ে গঠিত পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটির মাধ্যমে। কমিটির সদস্যদের বাছাই করেছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন নিজে। ২০০৯ সালে এ কমিটি গঠনের সাত বছরেরও বেশি সময় পর এই তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ্য বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় ২০১৬ সালের ৬ জুলাই। এই প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক মহলে ও গণমাধ্যমে চিলকট রিপোর্ট নামেই সমধিক অভিহিত।

এই প্রতিবেদনে বলা হয় : তখন সাদ্দাম হোসেন ব্রিটিশ স্বার্থের প্রতি কোনো আশু হুমকি ছিল না; সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপকবিধ্বংসী অস্ত্র (ডব্লিউএমডি- ওয়েপনস অব মাস ডেস্ট্রাকশন) রয়েছে বলে দেয়া যে গোয়েন্দা রিপোর্টের কথা বলে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সূচনা করা হয়, সে গোয়েন্দা রিপোর্ট নিশ্চিত তথ্যভিত্তিক ছিল না; যুদ্ধের বিকল্প শান্তিপূর্ণ প্রয়াসের উপায় শেষ না হওয়ার আগেই এই আগ্রাসী যুদ্ধ চালানো হয়; এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করেছে; যুদ্ধের বৈধ ভিত্তি চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া সন্তোষজনক হওয়া থেকে অনেক দূরে ছিল; যুদ্ধোত্তর ইরাক পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা ছিল পুরোপুরি অপর্যাপ্ত; এই যুদ্ধে সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়নি; ব্লেয়ার সরকারের বর্ণিত লক্ষ্য এই যুদ্ধে অর্জিত হয়নি; টনি ব্লেয়ার তার দাবির পক্ষে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেছিলেন, ইরাক জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৪৪১ নম্বর প্রস্তাব ভঙ্গ করেছে; যুদ্ধের কোনো বৈধতার সিদ্ধান্ত একমাত্র আন্তর্জাতিক আদালতই দিতে পারে; ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সামরিক অভিযান অনুমোদিত হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার জর্জ বুশকে ইরাক সম্পর্কিত ব্যাপারে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেন : ‘I will be with you whatever’ এবং ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের কোনো প্রয়োজন ছিল না।

প্রথমে প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইরাক ইনকোয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ‘ইন ক্যামেরা’য়। এতে সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমকে বাইরে রাখা হবে। ‘ইন ক্যামেরা ট্রায়ালে’র বিপরীতে রয়েছে ‘ট্রায়াল ইন ওপেন কোর্ট’ বা প্রকাশ্য আদালতের বিচার, যেখানে বাদি ও আসামিপক্ষসহ উভয় পক্ষের আইনজীবী, সাক্ষী ও অন্যান্য ব্যক্তি হাজির থাকতে পারেন। তা সত্ত্বেও পরে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি ছেড়ে দেয়া হয় জন চিলকটের ওপর। তিনি বললেন, এই তদন্তের বেশির ভাগ কার্যক্রমই যথাসম্ভব প্রকাশ্যে চালানো অপরিহার্য।

তদন্তের উন্মুক্ত অধিবেশন শুরু হয় ২০০৯ সালের ২৪ নভেম্বর। শেষ হয় ২০১১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। ২০১২ সালে ব্রিটিশ সরকার ভেটো দেয় ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের আগের ক্যাবিনেট মিটিংয়ের সারসংক্ষেপসহ অন্যান্য ইনকোয়ারি ডকুমেন্ট প্রকাশের ব্যাপারে। একই সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আদালতের একটি রুলিংয়ের ওপর আপিল করে ইরাক আগ্রাসনের দিনকয়েক আগের জর্জ ডব্লিউ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের মধ্যকার কথোপকথনের বিষয়বস্তু প্রকাশ আটকে দিতে সফল হয়। তখন ব্রিটিশ সরকার বলে- এই কথোপকথন প্রকাশ করলে ব্রিটিশ-আমেরিকার সম্পর্কে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। কথা ছিল, চিলকট রিপোর্ট ২০১৪ সালের মধ্যে প্রকাশ করা হবে। লর্ড-ইন-ওয়েটিং, লর্ড ওয়ালেস অব সেলটেয়ার সরকারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই রিপোর্ট পকাশ করা ঠিক হবে না। ২০১৫ সালের অক্টোবরে চিলকোট প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের কাছে চিঠি লিখে জানান, ২০১৬ সালের এপ্রিলে এই রিপোর্টের বিষয়বস্তু তৈরি হবে এবং এটি প্রকাশের প্রস্তাবিত তারিখ ২০১৬ সালের জুন অথবা জুলাই। সে অনুযায়ী ২০১৬ সালের ৬ জুলাই এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়।

এই রিপোর্ট প্রকাশের পর টনি ব্লেয়ার ইরাক যুদ্ধে ব্রিটেনের যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বিচারের মুখোমুখি হওয়ার হুমকির মুখে পড়েছেন। রিপোর্টে এই যুদ্ধে যোগ দেয়ার ব্যাপারে তার সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হয়। সমালোচনা করা হয় ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের। রিপোর্ট মতে, এই যুদ্ধ সূচনা করা হয় ভুয়া গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। তখন সাদ্দাম হোসেন কোনো হুমকির কারণ ছিলেন না, তাকে বাগে আনার ব্যাপারে কোনো কূটনৈতিক উপায়ও অবলম্বন করা হয়নি। এই দখলের অবসান ঘটে ছয় বছর পর এবং এ যুদ্ধে কোনো সফলতা আসেনি।

ব্রিটেনের ১৭৯ জন সামরিক ব্যক্তি নিহত হয় ইরাক যুদ্ধে। তাদের পরিবারবর্গ ব্লেয়ারকে অভিহিত করেন ‘টেরোরিস্ট’ হিসেবে। লেবার দলের নেতা জেরেমি করবিন এ ব্যাপারে ক্ষমা চান এবং বলেন, এটি ‘a stain on our party and our country’। টনি ব্লেয়ার বলেন, ‘জন চিলকট তার রিপোর্টে যেসব ত্রুটিবিচ্যুতির কথা উল্লেখ করেছেন, তার দায়িত্ব আমি নিলাম’। যাদের প্রিয়জন নিহত হয়েছেন, তাদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু এর পরও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিতর্কিত ইরাক আগ্রাসন চালিয়ে সাদ্দামকে উৎখাত করার যুদ্ধের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল বলে তিনি মনে করেন। অথচ চিলকট বলেছেন, এই হস্তেক্ষেপ ছিল ‘ব্যাডলি রং’।

চিলকটের রিপোর্টই শুধু নয়, ইরাক আগ্রাসন পরবর্তী সময়ে বহু রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলোতে বলা হয়েছে- সাদ্দামের কাছে কোনো ডব্লিউএমডি ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বাকি দুনিয়ার জন্য ইরাক কোনো হুমকি ছিল না। ইরাক সম্পর্কিত মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টগুলো ছিল পুরোপুরি ভুয়া। মিথ্যা অভিযোগ তুলে ইরাকে আগ্রাসন চালানো হয় এবং সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয়। আজ থেকে ১১ বছর আগে এক প্রহসনের বিচারের মাধমে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয় সাদ্দাম হোসেনকে। তার বিরুদ্ধে অপরাধ সংজ্ঞায়িত করেছে তৎকালীন বিশ্বপ্রভুরা, বুশ-ব্লেয়ার আর তাদের সহযোগীরা।

আজ থেকে ১৪ বছর আগে ২০০৩ সালে বুশ-ব্লেয়ার ও তাদের মিত্ররা সামরিক আগ্রাসন চালায় ইরাকে। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ৪০টিরও বেশি দেশের একটি জোটের আগ্রাসী যুদ্ধ। বিভিন্ন সূত্রের অনুমিত হিসাব মতে, এ যুদ্ধে পাঁচ লাখ থেকে ১০ লাখ ইরাকি নিহত হন।
বহু বছর পর ২০১৬ সালে আমরা হাতে পাই ২৬ লাখ শব্দসংবলিত এই চিলকট রিপোর্ট। এতে টনি ব্লেয়ারের ইরাক যুদ্ধের ব্যাপক নিন্দা জানানো হয়। কিন্তু ইউকে হাইকোর্ট ইরাক যুদ্ধের ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার বিষয়টি বন্ধ করে দিয়েছে। ইরাকি সেনাবাহিনীর সাবেক চিফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল ওয়াহিদ শান্নান আর-রিবাত আশা করছেন, ইরাকে আগ্রাসন পরিচালনার জন্য বেসরকারিভাবে ব্লেয়ারকে বিচারের মুখোমুখি করবেন। সাবেক এই ইরাকি সামরিক কর্মকর্তা চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তার ব্যাপারে আদালতে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য।

২০১৭ সালের ৩১ জুলাই এ সংক্রান্ত ২০০৬ সালে ইউকে হাউজ অব লর্ডসের দেয়া রুলিং : ‘Because of a decision by the House of Lords binding in this court, there is no crime of aggression under domestic UK law.’ পর্যালোচনার আবেদন আদালত খারিজ করে দেন। ২০০৬ সালের হ্উাজ অব লর্ডসের রুলিংয়ে বলা হয়েছিল : There is no such crime as the crime of aggression under the law of England and Wales. সেই সূত্রে ২০০৩ সালের যুদ্ধপরাধের বিচার থেকে তিনি অব্যাহতির সুযোগ ভোগ করছেন। সন্দেহ নেই, তিনি এ নিয়ে সুখবোধের মধ্যেই আছেন।

২০০৬ সালের রুলিংয়ে আরো বলা হয়েছিল, তাকে বিচারের মুখোমুখি করার যেকোনো প্রচেষ্টা চালানো হলে ইউকের অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্টের আওতায় বর্তমানে গোপন রাখা অনেক কিছুই প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। এই রুলিং কার্যত তার বিরেুদ্ধে ফৌজদারি মামলার পথও রুদ্ধ করে দেয়া হয়। যেসব আইনজীবী টনি ব্লেয়ারের এই ইনডেমনিটি সমর্থন করছেন, তারা বলছেন : The crime of aggression is recognized by international law; but, there is no such offence in English law., অপর দিকে লর্ড চিফ জাস্টিস ব্যারন থমাস ও জাস্টিস ডানকান ওয়েসেলি যুক্তি দিয়েছেন : There was no such crime, and, therefore, there’s “no prospect” of the case against Blair succeeding.

এসব দেখেশুনে বলতে ইচ্ছে করছে : হায়রে ইংলিশ আইন, হায়রে গণতান্ত্রিক ব্রিটিশদের অফিসিয়াল সিক্রেট ল’! এ ব্যাপারে রেসপেক্ট পার্টি নেতা জর্জ গ্যালাওয়ে বলেন, ‘ইংল্যান্ডে যদি আগ্রাসী যুদ্ধবিরোধী কোনো আইন না থেকে থাকে, তবে আইন হচ্ছে একটি গাধা। আদালতের দুই বিচারকের সিদ্ধান্ত হচ্ছে : ইরাক যুদ্ধের জন্য টনি ব্লেয়ারের বিচার করা যাবে না। এ ব্যাপারে তাকে ইমিউনিটি দেয়া হয়েছে। কিন্তু নুরেমবার্গ ট্রায়ালে ব্রিটেন মূলত আগ্রাসী যুদ্ধ পরিচালনার অপরাধে বিচার করেছে বেঁচে থাকা ফ্যাসিস্ট জার্মান পশুদের, যদিও জার্মান ডিক্টেটরের পরিচালিত গণহত্যা বৈধ ছিল জার্মান আইনের আওতায়। তখন এমনকি ‘আগ্রাসী যুদ্ধ’ সম্পর্কিত কোনো বৈধ সংজ্ঞাও ছিল না। এর পরও ব্রিটেন যথার্থভাবেই নাৎসি পশুদের বিচার করেছে এবং এদের বহু লোককে দেয়া হয়েছে ফাঁসি। সেই মুহূর্ত থেকে অনুসিদ্ধান্ত হিসেবে এ ধরনের আগ্রাসী যুদ্ধকে ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থায় আইনসম্মতভাবে অবৈধ বলে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে।’

গ্যালাওয়ে বলেন, ইরাকে টনি ব্লেয়ারের যুদ্ধ ‘ওয়ার অব লাস্ট রিসোর্ট’ তথা শেষ অবলম্বনের যুদ্ধ ছিল না এবং ব্রিটেনের এ যুদ্ধে যাওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল না। এর পরিণতি এগিয়ে যাচ্ছে হিটলারাইট ক্রাইমের গুরুতর অবস্থার দিকে। এই যুদ্ধে ১০ লাখেরও বেশি লোক নিহত হয়েছে এবং প্রতিদিনই নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। একটি সার্বভৌম দেশে আগ্রাসন চালানো হয়েছে, দেশটি দখল করে নেয়া হয়েছে, ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। অবৈধভাবে ধরে নিয়ে মানুষকে গোপন কারাগারে নির্যাতন করা হয়েছে। টনি ব্লেয়ারের যুদ্ধের ফলে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় সন্তানেরাও সারা জীবন এক মুহূর্তও শান্তিতে ও নিরাপদে থাকতে পারবে না। এটাই নির্জলা এক চার্জশিট। কেউ বলে না, এই চার্জশিট কখনোই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যাবে না ব্রিটিশ আদালতে। এটাই যদি ন্যায়বিচার হয়, তবে আমি এক ব্যানানা।’

এই যদি হয় অবস্থা তবে বলতেই হয় : সংজ্ঞার উদ্ভব ঘটে সত্য, আর একই সংজ্ঞা বহন করে বিভিন্ন অর্থ, গ্রহণযোগ্যতা, বৈধতা এবং জোর করে এর ক্ষেত্র, স্বার্থ, চাহিদা সময়ে সময়ে বদলানো যায়। ব্লেয়ারের ইরাক সম্পর্কিত যুদ্ধাপরাধের ঘটনার ওপর কমপক্ষে আংশিকভাবে হলেও আলোকপাত এসেছে বহুল আলোচিত চিলকটের রিপোর্টের সূত্রে। এই রিপোর্টটি যুদ্ধাপরাধ সংজ্ঞায়নের জন্য যথেষ্ট। আমরা দেখেছি, এই রিপোর্টে ব্লেয়ারের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে ইরাক দখলের যুদ্ধের জন্য। কারণ, সাদ্দামের কাছে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে, এমন মিথ্যা অভিযোগে একটি আগ্রাসী যুদ্ধ চালিয়ে দেশটি দখল করে নেয়া হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে।
ব্লেয়ার এ যুদ্ধে লোক ক্ষয়ের ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, তার ভুল কাজের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি ঘটনার শিকার ইরাকিদের দুর্ভোগের ব্যাপারটি আন্তরিকতার সাথে অনুভব করেন বলেও জানিয়েছেন। কিন্তু এর পরেও তিনি বলেছেন, তার ইরাক যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত ছিল সঠিক। তিনি বলেছেন, তিনি এ ব্যাপারে প্রচুর সময় নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। তিনি ব্যাপারটি বিশ্লেষণে জীবনের অনেকটা সময় ব্যয় করেছেন।

তাহলে প্রকৃতপক্ষে ঘটনাটি দাঁড়ালো এমন: মিথ্যা অভিযোগ তুলে আগ্রাসী যুদ্ধ চালিয়ে একটি দেশ দখল করে নেয়া হলো, যেখানে কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ ছিল না সমস্যা সমাধানে, আর এ যুদ্ধে লাখ লাখ নিরস্ত্র-নিরপরাধ মানুষ হত্যা করা হলো এবং তা এখনো অব্যাহত, দেশটি অবৈধভাবে দখলকারী একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীও এই অনুপ্রবেশের ডিজাইনার হিসেবে দুঃখপ্রকাশ ও ক্ষমাপ্রার্থনা করেও এই যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তকে ‘সঠিক’ মনে করছেন। কারণ, দখলকারী দেশটির আইনে এই যুদ্ধ চালানো কোনো ‘অপরাধ’ নয়। তাহলে এই যুদ্ধে ১০ লাখেরও বেশি লোক হত্যার শিকার এবং আরো ততধিক আহত হলেও আগ্রাসী দেশটির আইনে এটি ‘উত্তম কর্ম’। আসলে সাম্রাজ্যবাদীরা আইন তৈরি করে এভাবেই, যেখানে তাদের পরিচালিত গণহত্যা সংজ্ঞায়নের জন্য কোনো আইন খুঁজে পাওয়া যায় না। আর সে সুযোগ নিয়েই বুশ-ব্লেয়াররা ও তাদের সহযোগীরা নানা ধরনের মিথ্যা অজুহাত সাজিয়ে নানা দেশে আগ্রাসন চালিয়ে দখল করে নিয়েছে কিংবা সরকার উৎখাত করে সেখানে বসিয়েছে তাদের পুতুল সরকার। আর এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নির্বিচারে চালিয়েছে গণহত্যা, যার শিকার হয়েছে লাখ লাখ বেসামরিক মানুষ। কিন্তু এই গণহত্যার জন্য দায়ীরা ভোগ করছেন ইনডেমনিটি তাদের তৈরি আইনে।

এরাই বলছে, আগ্রাসী ইরাক যুদ্ধে ব্লেয়ারের যুদ্ধাপরাধ সংগঠনের ব্যাপারে তাদের দেশে কোনো আইন নেই। কিন্তু আমরা জানি, শক্তিশালী যোগাযোগ চ্যানেল ইন্টারনেট উদ্ভাবনের আগে ইন্টারনেট সম্পর্কিত কোনো আইন ছিল না, আইন ছিল না টেস্ট টিউব বেবি, সারোগেট মাদার, সি বেড মাইনিং, রোবট-বডি-টয়. দ্রোন, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও এমনি আরো অনেক বিষয়ে। এখন এসব বিষয়ে নতুন নতুন আইন প্রণীত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের আনা হচ্ছে আইনের আওতায়। অনেক দেশে ঔপনিবেশিক আমলের অনেক আইন বাতিল করতে হয়েছে মানবতার স্বার্থে। ইরাক ও আফগানিস্তানে সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের দোসরদের পরিচালিত আগ্রাসী যুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের সুস্পষ্ট সংজ্ঞায়ন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে প্রয়োজনে আইন করতে হবে মানবজাতির ভবিষ্যৎ বিপর্যয় এড়ানো নিশ্চিত করতে হলে। নইলে আজকের মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত পরিকল্পিত গণহত্যার হোতা সু চি ও তার দোসরেরা পার পেয়ে যাবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.