রোহিঙ্গা নারী শিশুর মানবিক বিপর্যয়

শওকত আলী রতন


সংবাদমাধ্যমে এখন একটা ছবিই বেশি দেখা যায়। নৌকায়, পানিতে পায়ে হেঁটে ক্লান্ত-শ্রান্ত শত শত নারী কোলে শিশু নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসছে। সাথে নেই কোনো সহায়সম্বল, নেই থাকাখাওয়ার নিশ্চয়তা তারপরও জীবন বাঁচানোর তাগিদে সবাই পাড়ি দিচ্ছে মাইলের পর মাইল পথ।
স্মরণকালের ভয়াবহ ও পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলমান জাতিগোষ্ঠী। যুগ যুগ ধরে এই জাতিগোষ্ঠীর লোকজন মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে শান্তিপূর্ণ বসবাস করে এলেও সে দেশের সরকার তাদের বিরুদ্ধে তুচ্ছ অভিযোগ এনে দেশটির সামরিক বাহিনী বিশাল এই জনগোষ্ঠীর ওপর নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ নামে এই অভিযানে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে নিরীহ জনগণকে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। পৃথিবীর কোনো জাতিই এমন অমানুষিক নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। কম সময়ে এত অধিক প্রাণহানি ও দেশ থেকে বিতাড়িত করার ঘটনা বিরল। ন্যক্কারজনক ঘটনার বিশ^জুড়ে নিন্দার ঝড় বইলেও সে দেশের সরকার সমাধানের পথে না হেঁটে উল্টো এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে নিহত ও আহতদের মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যাই বেশি বলে জানা গেছে। এখনো হাজার হাজার শিশু নারী রাখাইনে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
মানবতা গুমরে কাঁদলেও রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার জন্য পাশে দাঁড়ায়নি বিশ^নেতাদের কেউ। রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাড়িঘর, জমিজমা ও সহায়সম্বল সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব। বেঁচে থাকার জন্য যে রসদটুকু থাকা প্রয়োজন সেটিও ফেলে এসেছে নিজ মাতৃভূমিতে। আজ তাদের কিছু নেই। নেই নতুন করে বেঁচে থাকার তেমন কোনো স্বপ্নও। তবু বাঁচতে চায় তারা। এজন্যই সীমাহীন কষ্ট মাথায় নিয়ে শেষ আশ্রয় হিসেবে ছুটছেন বাংলাদেশের দিকে। মানবতার দৃষ্টিতে বাংলাদেশ সরকার সাড়া দিয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। তবে এসব মানুষের আহারের ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে সবাই।
২৪ আগস্ট মধ্যরাতের পর রোহিঙ্গাদের ওপর হেলিকপ্টার দিয়ে গানশিপের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হলে নিরুপায় হয়ে প্রাণ ভয়ে রাতেই বসতভিটা ও বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যায় লাখ লাখ মানুষ। জীবন বাঁচানের জন্য আশ্রয় নেয় বনেজঙ্গলে। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। সেখানে সেনাবাহিনী নির্বিচারে গুলি ও জবাই করে তাদের হত্যা করে। আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে রোহিঙ্গাদের। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী স্বজনদের চোখের সামনেই এমন হত্যাযজ্ঞ চালায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের। তারপরও নিরস্ত্র রোহিঙ্গারা এর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারায় মৃত্যুভয়ে যে যার মতো ছুটোছুটি করে পালিয়েছে।
স্বজনদের চোখের সামনে কারো মা-বাবা, কারো ভাই-বোন আবার কারো স্ত্রী-সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। নারী ও শিশুদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। সহায়সম্বল ফেলে যেভাবে পেরেছে সেনাবাহিনীর হাত থেকে বাঁচার তাগিদে হন্যে হয়ে দিগি¦দিক ছুটেছেন।
কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে তার সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও তার ভয়াবহতার ছিটেফোঁটা কিছু চিত্র সবার নজড়ে এসেছে। যা প্রতিটি মানুষের বিবেককে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। তথ্য সূত্রে জানা যায়, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ১০ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে সরকারি বাহিনী। সীমান্তে স্থলমাইন পুঁতে রাখায় বিস্ফোরণের ঘটনায় অনেক লোকের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে প্রবেশের সময় নাফ নদীতে নৌকা ডুবিতে প্রাণ গেছে শতাধিক শরণার্থীর। এদের বেশির ভাগ শিশু ও নারী। কেবল জীবনকে সঙ্গী করে নাফ নদী পার হয়ে লাখ লাখ শরণার্থী কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার সীমান্তে ২০টি পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। সীমান্তের রাস্তায় এখন রোহিঙ্গাদের ঢল। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ প্রবেশ করছে। সবশেষ তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত ১৫ দিনে তিন লাখ শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই শরণার্থীরা পাহাড়ি এলাকায় বর্তমানে অবস্থান করছে। কেউ খোলা আকাশের নিচে আবার কেউ তাঁবু টানিয়ে খেয়ে-না-খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। বৃষ্টিতে ভিজে আর রোদে শুকিয়ে এসব মানুষের জীবন বিপন্ন। শরণার্থীশিবিরে আসা খাদ্য সঙ্কটে প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ সাধারণ রোহিঙ্গা নাগরিক। টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা রোহিঙ্গারাও চরম মানবেতর অবস্থায় আছে। রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের খাদ্যসহায়তা দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়। অনেকেই খাদ্যাভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এদের মধ্যে নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
সহায়সম্পদ ও আত্মীয়স্বজন হারিয়ে রোহিঙ্গারা কোনোরকমে বাঁচার আশায় আশ্রয় নিয়ে খেয়ে- না-খেয়ে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দিন পার করছেন। এ দিকে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় পথে পথে মৃত্যু হচ্ছে অনেকের। বাংলাদেশে আসা তিন লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর চোখেমুখে বেঁচে থাকার স্বপ্ন থাকলেও তা যেন এক ধূ-ধূ বালুচরের মতোই। অনেকের অনাহারে অর্ধাহারে কাটছে জীবন। সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছে নারী ও শিশুরা। ঘোর অন্ধকারের মতোই এখন তাদের জীবন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.