বিশ্বমানের জনসম্পদ তৈরিই হোক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অঙ্গীকার

আনিসুর রহমান এরশাদ

দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম অনুষঙ্গ মানসম্মত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা। এ দেশের উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে সমৃদ্ধ হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণসহ দেশের কৃষি এবং শিল্পের সার্বিক উন্নয়নের অভিলক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা, প্রতিকূলতা এবং সমস্যা সত্ত্বেও এসব বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করে যাচ্ছে দেশের ব্যবসা, উৎপাদন, শিল্প-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় ও দক্ষ জনশক্তি গঠন এবং উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভিত্তি গড়তে।

যদিও প্রশ্ন উঠেছে- উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট যে হারে বাড়ছে, গুণগতমান সেই হারে বাড়ছে কি-না তা নিয়ে। এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, আলোকিত জনগোষ্ঠী গড়ার মাধ্যমেই আলোকিত দেশ গড়া সম্ভব। আর শিক্ষায় গুণগত মান বৃদ্ধির মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় শিক্ষার অগ্রগতি ও সক্ষমতা অর্জন। অর্থনীতির ভিত্তিকে মজবুত ও টেকসই করে দেশকে বিশ্বের বুকে পৃথক পরিচিতি দিতে হলে কোয়ানটিটি নয় কোয়ালিটি নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক।

যেহেতু উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। সেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় পাবলিক কিংবা প্রাইভেট যাই হোক না কেনো; বিশ্বমানের জনসম্পদ তৈরিতে যথেষ্ট সক্ষম প্রতিষ্ঠানকে হতেই হবে। সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক ১১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় ৩ শতাধিক কলেজ ও ইনস্টিটিউটকেই সময়োপযুগী শিক্ষাদানের সামর্থ্য থাকতে হবে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষাসহ বিভিন্ন পেশাভিত্তিক প্রায় আড়াই শতাধিক বিষয়-কোর্স পরিচালনা করছে এসব বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট ইনস্টিটিউটসমূহ। এসবের মাধ্যমে যাতে সময়ের চাহিদা পূরণের উপযোগি মানুষ তৈরি হয় সেটি নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারক ও প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ইতিবাচক দিক হচ্ছে- দেশ ও জাতিকে সামনে এগিয়ে নিতে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষিত দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করছে এসব বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান। উচ্চতর দক্ষতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন এ জনশক্তি দেশের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও শিল্প-বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় যোগ দিচ্ছে। মেধা, মনন ও চিন্তাশীলতা দিয়ে অংশীদার করছে সার্বিক উন্নয়নের। অনেকে দেশের বাইরেও প্রতিষ্ঠা লাভের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করছেন। লাখ লাখ দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছেলেমেয়েরা যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন; তা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নামমাত্র বেতন, আবাসিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কারণে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে স্বল্পবিত্ত আর্থিক ক্ষমতার পরিবারের মেধাবী সন্তানেরা উপকৃত হচ্ছেন।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে বলেই এখনো ডাকসু কিংবা টিএসসিতে এক টাকায় চা পাওয়া যায়, দুই টাকায় সিঙ্গারা কিংবা ২০ টাকায় দুপুর কিংবা রাতের খাবার। সাভারের জাহাঙ্গীরনগর থেকে ১ টাকায় গুলিস্তানে আসা যায়। ফলে চরম দরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তানেরাও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে শিক্ষাজীবন। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও দরিদ্র মেধাবীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, বৃত্তি দিচ্ছে। এতে সামগ্রিকভাবে দেশ ও জাতির সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া নিশ্চিত হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসা, প্রকৌশল ও কৃষি গবেষণা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর একঝাঁক মেধাবী তরুণ নেতৃত্ব জাতিকে উপহার দিচ্ছে যারা অবশ্যই একদিন বর্তমান বাংলাদেশের চিত্র পুরোপুরি পাল্টে দিতে সক্ষম হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ৪০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারি রয়েছেন; যাদের বেকারত্ব দূর হয়েছে, জীবন-জীবিকার উপায় বের হয়েছে। ভালোমানের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির মাধ্যমেও মানব সম্পদের কাম্য ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে নিম্নমানের শিক্ষার্থীরাও নিজেদের মানকে আরও উন্নত করতে পারছে দূরদর্শী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। বেসরকারি বিশ্বদ্যিালয়ে উদ্যোক্তা ও সফল ব্যবসায়ীদের সাফল্যই নিশ্চিত হচ্ছে এমনটি নয়, মেধাবী ও সম্ভাবনাময় তরুণরাও শিক্ষকতায় এসে জ্ঞান বিতরণ ও গবেষণায় যুক্ত হতে পারছেন। আর শিক্ষার্থীরাও দেশেই উচ্চশিক্ষা নিয়ে নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখছেন।

স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত অর্থের অভাবে শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিতকরণে উপবৃত্তি প্রদানের লক্ষ্যে ‘প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট’ নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে এবং এই তহবিল থেকে এখন এক কোটি ২৮ লাখ শিক্ষার্থী বৃত্তি পাচ্ছে। এর ফলে কোনো শিক্ষার্থী দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার গুণগত মান ও গবেষণা বাড়ানোর ব্যপারে সচেতনতা বেড়েছে। দিনদিনই আপডেট হচ্ছে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস ও পড়াশুনার মান।

নেতিবাচক দিক হচ্ছে- এতসব উন্নতি সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষায় সোনালী অতীত বর্তমানে নকল, প্রশ্নফাঁস, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির কারণে ম্লান হচ্ছে। এদেশের গবেষক ও গবেষণার প্রশংসায় একসময় বিশ্ব মনীষীরা পঞ্চমুখ ছিলেন। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর কয়েক দশকের মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণার উঁচু মান ও আবাসিক চরিত্রের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল থেকে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর (যিনি সত্যেন বোস নামে পরিচিত) পাঠানো একটি প্রবন্ধ পড়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘আমার মতে বসু কর্তৃক প্ল্যাংক-সূত্র নির্ধারণের এই পদ্ধতিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’

বিশ্বখ্যাত আরেক বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলন উদ্বোধন করতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। ঢাকায় একসময়ে গড়ে উঠেছিল এক শক্তিশালী গবেষক দল, যারা মৌলিক পদার্থের প্রকৃতি সম্বন্ধে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিল। এসব গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছিলেন কে এস কৃষ্ণান, এস আর খাস্তগীর, কাজী মোতাহার হোসেন ও আরও অনেকে। বিখ্যাত রোনাল্ড ফিশার ঢাকার বিমানবন্দরে নেমেই কাজী মোতাহার হোসেনের খোঁজ করতেন। এই ঐতিহ্যের জন্যই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জগন্নাথ হলে বসে লিখতে পেরেছিলেনঃ ‘এই কথাটি মনে রেখো, তোমাদের এই হাসি খেলায়...’। কিন্তু এখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমন মানের অনেক সার্টিফিকেটধারীরা বের হচ্ছে যারা উদ্যোক্তা হয়ে নেতৃত্বদান দূরে থাক, কোনোরকম কর্মসংস্থান করতেও হিমশিম খাচ্ছেন, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বিশ্ববাজারে তো নয়ই দেশীয় বাজারেও টিকতে পারছে না।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে টিআইবি এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) এর বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে নানা অনিয়মের চিত্র ওঠে এসেছে। সেসব প্রতিবেদন সম্পর্কে সব ধরনের মিডিয়াতেই লেখা-লেখি বা বলা-বলি হয়েছে। অনিয়ম বন্ধের সুপারিশও প্রকাশ পেয়েছে। আমি সে সম্পর্কে বিশেষ উল্লেখ করছি না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষার্থীদের জঙ্গী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা মারাত্মকভাবে পরিলিক্ষিত হয়েছে।

এজন্য মানবিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রতের জন্য বাংলা, ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, খেলাধুলা ইত্যাদি এক্সট্রা কারিকুলার কার্যক্রম প্রবর্তন করার কথা বলা হচ্ছে। শিক্ষকরাও পেশাদরিত্ব বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন। অনেক শিক্ষকই মূলশিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, বাড়তি আয়-রোজগারের ধান্ধা করছেন। শিক্ষা ছুটি, বিদেশে অননুমোদিত ছুটি নিয়ে অবস্থান, খন্ডকালীন চাকরি- এসব করুণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অবৈধভাবে পরিচালনা, মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছড়াছড়িও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ডিগ্রি প্রাপ্ত গ্রাজুয়েটদের বাজারে চাহিদা তৈরি করতে না পারলে প্রমাণিত হবে- সে প্রতিষ্ঠানের গ্রাজুয়েটদের বাজারে চাহিদা নেই তাদের প্রোডাক্ট মানসম্পন্ন নয়। ফলে সঠিকমানের গ্রাজুয়েট তৈরি চ্যালেঞ্জিং বটে।

উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে দরকার গবেষণা ও উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদের দিক নির্দেশনা। আমাদের শিক্ষক- গবেষকদের মেধা কাজে লাগাতে হলে তাঁদের গবেষণার পরিবেশ ও সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, কলা ও পরিবেশ বিজ্ঞানের মানসম্পন্ন গবেষণার জন্য যে আর্থিক বরাদ্দ দরকার, তা না থাকায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মুখ থুবড়ে পড়েছে। তারপরও যতটুকু বরাদ্দই হোক- এটাও নিশ্চিত করা দরকার, গবেষণার জন্য প্রদত্ত অর্থ যাতে সফল ও কার্যকরভাবে ব্যয় করা হয়, ক্রয়েই যাতে সব সাফল্য কেন্দ্রীভূত না থাকে, সব কৃতিত্ব যাতে সীমিত সম্পদের দেশের অর্থ বরাদ্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। অর্থায়নের জন্য যোগ্য গবেষক নির্বাচন ও যথাযথ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এই অর্থায়নকে অর্থবহ করা সম্ভব। ছাত্ররাজনীতিরও গুণগত পরিবর্তন দরকার। জনবল গড়ার ক্ষেত্র ও ধরন নিয়ে জাতীয় পরিকল্পনা দরকার। কেননা সবার জন্য উচ্চশিক্ষা কোনো দেশেই প্রচলিত নেই। উচ্চশিক্ষা বলতে যদি হায়ার এডুকেশন, তথা মাস্টার্স-পিএইচডি ডিগ্রি বোঝায়; তা বাস্তব কারণে সবার জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না। কারণ কম মেধাবীরা উচ্চশিক্ষা নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

অনেক শিক্ষক পেশাগত দায়িত্ব সচেতন নয়। শিক্ষাছুটি শেষে কাজে যোগ না দিয়ে চাকরিবিধি লংঘন করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে আর দেশে ফিরেন না, অননুমোদিত ছুটি ভোগ করে বেতন নেন, কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক নির্ধারিত সময়সূচি মেনে ক্লাস নেন না, অনেকে নির্ধারিত ৩০টি ক্লাসের জায়গায় ৫ থেকে ১০টি ক্লাস নিয়ে কোর্স শেষ করেন, অনেকে ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ক্লাস না নিয়ে ছুটির দিনে ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসে আসতে বাধ্য করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে দেখা যায় শিক্ষকতার মুখ্য উদ্দেশ্যকে বিসর্জন দিয়ে শিক্ষকতার নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন কনসালটেন্সি, এনজিও নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ফলে ছাত্রদেরকে যথাযথ পাঠদান করতে পারেন না, না পড়িয়ে পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। শিক্ষকদের কাজ গবেষণা করা, জ্ঞানের নতুন নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করা, সৃজনশীল প্রকাশনা বের করা। কিন্তু অনেক শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকেই পার্টটাইম জব মনে করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্যে পার্টটাইম কাজের ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিছু বৃত্তির ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। বিদেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার খরচ চালিয়ে নেয়ার মতো কাজের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এমন সুযোগ সুবিধা না থাকায় দরিদ্র বাবা মায়ের সীমাহীন কষ্ট করতে হয়। এমতাবস্থায় সামান্য প্রলোভনে তারা পথভ্রষ্ট হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জঙ্গি সংগঠনে সম্পৃক্ততা, মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানিগুলো দ্বারা প্রতারিত হওয়া, দেহব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ততার খবর পত্রপত্রিকায় এসেছে। তার মানে শিক্ষার্থীদের আয়- রোজগারের একটা উপায় থাকা দরকার। এজন্যে দরকার সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিশেষ পরিকল্পনা ও উদ্যোগ।

শিক্ষক রাজনীতি বা শিক্ষকদের গ্রুপিং এর কারণে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে দেখা গেছে শিক্ষক-রাজনীতি ও ছাত্র-রাজনীতি মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। শিক্ষকদের রাজনীতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। উপাচার্য নিয়োগে স্বচ্ছ পদ্ধতি থাকা জরুরি। যেকোনো মূল্যেই শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে হবে। যে বিশ্ববিদ্যালয় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলে খ্যাত ছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ এশিয়ার প্রথম ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশ্বের প্রথম ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নেই কেন, সেই প্রশ্নটি করা কি অন্যায্য হবে? এ ব্যর্থতার দায় কি রাষ্ট্রের, না বিশ্ববিদ্যালয়ের, নাকি এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা? শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান উন্নত না হলে ‘জ্ঞানভিত্তিক সমাজ’, ‘একবিংশ শতকের উপযোগী শিক্ষা’, ‘উন্নয়ন সহায়ক মানবসম্পদ’ ইত্যাদি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

বিদ্যমান সঙ্কট নিরসনে করণীয় হচ্ছে- সুবিধাবাদী শিক্ষকদের জন্য তিরস্কার ও নিবেদিত প্রাণদের জন্য পুরস্কার চালু, গবেষণা খাতকে উপেক্ষা না করে গুরুত্ব দান, ছাত্র বৃত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি, দলীয় পরিচয়ের চেয়ে মেধাবীদেরকেই অগ্রাধিকার দান, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে খরচ যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যূনতম মান বজায় রাখা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ, অর্থ অপচয় বন্ধ করা, অধ্যাপক ও শিক্ষক সংকট দূর করা, মৌলিক বিষয় পড়ানোকে গুরুত্ব প্রদান, শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান করা, দেশপ্রেমিক ও মানবপ্রেমিক ‘মানুষ’ হওয়ার শিক্ষা প্রদান, বিশ্ববিদ্যালয়কে যোগ্য মেধাবঞ্চিত না করা, গ্রন্থাগারের সোনালি অতীত ফিরিয়ে আনা, ছাত্র সংসদ চালু করে জঙ্গি তৈরির পথ বন্ধ করা, মেধা পাচার রোধ করা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা প্রদান, ইউজিসিকে আরো শক্তিশালী করা, ইউজিসিকে দুর্নীতিমুক্ত করা, টিআইবি’র সুপারিশকে আমলে নেয়া, জনপ্রতিনিধিদের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, সার্টিফিকেট বাণিজ্য না করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা স্বাতন্ত্র্য আছে, ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য আছে। ১৯৩৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের প্রদত্ত সমাবর্তন বক্তৃতায় স্কুল-কলেজ, পলিটেকনিক্যাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কিছু মূল্যবান কথা বলেছিলেন, ‘A university, true to its ideals, should with courage and firmness, stand against the current, however strong it may be. It should boldly proclaim that a very different thing from a technical college or a place of vocational training. It has got some definite and specific objects to serve, and these may be defined as advancement of learning by dissemination of knowledge and exploration of new truths, and creation of personality and leadership, in other words, the highest possible development of intellect and character, Humanism is the watchword of the University; the pursuit of the highest standard of knowledge is its distinctive character, and a passionate search for truth is the sublime ideal’। এই বৈশিষ্ট্যগুলো আজও খন্ডানো সম্ভব নয়।

অথচ অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদেরকে প্রকৃত দেশপ্রেমিক ‘মানুষ’ হওয়ার শিক্ষা প্রদানের বদলে নিছক সার্টিফিকেট প্রত্যাশী মেশিনে পরিণত করছে। দেশপ্রেম, মানবিকতা, সৃজনশীল মুক্ত চিন্তা, প্রগতিশীলতা ইত্যাদি বিষয় আত্মস্থ করার দীক্ষা গ্রহণ থেকে তাদেরকে প্রায় সম্পূর্ণ বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, খেলাধুলা, সাহিত্যচর্চা, সমাজসেবা, যৌথ উদ্যোগী মনোভাব সৃজন ইত্যাদির চর্চা প্রায় শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা হয়েছে। অথচ এসব ছাড়া একজন ব্যক্তির পক্ষে দেশপ্রেমিক, মানবিক, প্রগতিবাদী, সৃজনশীল হওয়া, তথা সচেতন ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন সর্বাঙ্গীণভাবে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠা যে অসম্ভব তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হল মুক্তবুদ্ধি ও সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র, যা কিনা সত্যিকারের মানুষ তৈরি করে, প্রতিবাদী চেতনার জন্ম দেয়। শিক্ষিত দাস আর লোভনীয় বেতনের কাজ করার উপযোগী মানুষ সৃষ্টিই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ নয়।

যদি বিরাজমান সঙ্কটগুলোর সমাধান করে সম্ভাবনার বিকাশের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করে বিশ্বমানের জনসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হয় তবে এ জাতির উন্নতি ও অগ্রগতি কেউ থামাতে পারবে না। বিশ্বায়নের এই যুগে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে সম্মানজনক আসনে সমাসীন করতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্ব বাড়ানোর কোনো বিকল্প পথ নেই। যোগ্য ও দক্ষ মানুষই পারবে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে প্রতিটি সেক্টরকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে সামনে এগিয়ে নিতে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংশ্লিষ্টদের জাতীয় স্বার্থে ব্যক্তিগত ও দলীয় ক্ষুদ্র স্বার্থ পরিত্যাগ করে নিবেদিত হওয়া সময়ের অনিবার্য দাবি।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.