রোহিঙ্গা বিপর্যয়ে আমাদের করণীয়

সংবিধান ও রাজনীতি
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

কয়েকটি পত্রিকার শিরোনাম
কয়েকটি বহুলপ্রচারিত দৈনিক পত্রিকার সাম্প্রতিক (পাঁচ-সাত দিন আগের মাত্র) ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা থেকে কয়েকটি দৃষ্টি আকর্ষণীয় তথা গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম উদ্ধৃত করছি। বাকি অনুচ্ছেদগুলোতে রোহিঙ্গা সমস্যার কিছু আঙ্গিক নিয়ে আলোচনা করব। পত্রিকার শিরোনামগুলো পাঠককে বিষয়টি মনের ভেতরে গেঁথে রাখতে সাহায্য করবে বলে মনে করি। কালের কণ্ঠের (৭ সেপ্টেম্বর) প্রথম পৃষ্ঠার লিড শিরোনাম : ‘সন্ত্রাস দমনের নামে রাখাইনে গণহত্যা’। যুগান্তর (৭ সেপ্টেম্বর) প্রথম পৃষ্ঠার লিড শিরোনাম : ‘মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন’। মানবজমিন (৬ সেপ্টেম্বর) প্রথম পৃষ্ঠার পাশাপাশি দু’টি লাল রঙের ব্যানার শিরোনামের একটি : ‘ঠাঁই নেই নতুন ক্যাম্পে, খাদ্য পানি সঙ্কট’। প্রথম আলো (৬ সেপ্টেম্বর) প্রথম পৃষ্ঠার লিড শিরোনাম : ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশের আহ্বান : রোহিঙ্গাদের ফেরাতে চাপ দিন’। বাংলাদেশ প্রতিদিন (৬ সেপ্টেম্বর) প্রথম পৃষ্ঠার লাল রঙের লিড শিরোনাম : ‘রোহিঙ্গা উৎকণ্ঠা বিশ্বজুড়ে’। নয়া দিগন্ত (৭ সেপ্টেম্বর) প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনাম : ‘রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব প্রদানের আহ্বান জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের’। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বকোণ (৯ সেপ্টেম্বর) প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনাম : ‘রোহিঙ্গা রাজ্য কক্সবাজার... কুতুপালংয়ে পাঁচ হাজার একর জমি বরাদ্দ দেয়ার পরিকল্পনা’। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা দৈনিক পূর্বদেশ (৯ সেপ্টেম্বর) প্রথম পৃষ্ঠার লিড শিরোনাম : ‘রোহিঙ্গার ভারে বিপর্যয়ের আশঙ্কা... (যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের স্বীকৃতি) রোহিঙ্গাদের নিয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ’।
তিনটা বিষয় বাদ দিয়ে লিখছি?
গত ২৭ আগস্ট দিন শেষে রাত ১০টার পর ঢাকা মহানগরের যেকোনো জায়গা থেকে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান অপহরণ বা গুম বা নিখোঁজ হয়েছেন; আজ অবধি তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। ইংরেজি পরিভাষায় এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স। বিএনপি চেয়ারপারসন ও মহাসচিব, ২০ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দ এবং কল্যাণ পার্টির সর্বস্তরের নেতাকর্মী এ প্রসঙ্গে প্রতিবাদ করেছেন, তাকে ফেরত দেয়ার দাবি জানিয়েছেন, তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে লিখতে মন খুব চাচ্ছে। অপরপক্ষে আগামীকাল ১৪ সেপ্টেম্বর সকালবেলা, কল্যাণ পার্টির ১০ সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধিদল যাবে নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রিত সংলাপে। সেটা নিয়েও লিখতে মন চাচ্ছে। কারণ, নির্বাচনী বিধিবিধান ও আনুষঙ্গিক বিষয় যেগুলো সেখানে উপস্থাপনযোগ্য, সে ব্যাপারে জনসাধারণের সাথে আগেভাগেই শেয়ার করতে চেয়েছিলাম। এ দুটো বিষয়ের কোনোটাই করছি না। আবার পুরনো চলমান বিষয়টিও স্থগিত করলাম। অর্থাৎ গত ৬ সেপ্টেম্বর এবং এর আগে ২৩ আগস্ট ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে লিখেছি, আজ বুধবারও লেখার কথা ছিল সে বিষয়ে। কিন্তু সব বাদ দিলাম। কারণ, প্রতিবেশী নিজের ঘরে আগুন দিয়েছে, সে আগুন আমার ঘরেও লেগেছে। এ আগুন আগুন খেলা বাস্তবে রোহিঙ্গাদের চরম মানবিক বিপর্যয়।
দেশে দেশে নিপীড়িত জনগণের বিক্ষোভ
কোনো একটি জনগোষ্ঠী যদি অনুভব করে বা মনে করে যে, অন্য একটি জনগোষ্ঠী তাদের বঞ্চিত, নিপীড়িত ও অপমানিত করছে; তাহলে সেই বঞ্চিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠী প্রতিবাদ করতে বাধ্য। প্রতিবাদের ভাষা ও মাধ্যম স্থান-কাল-পাত্রভেদে ভিন্ন হতেই পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা ফিলিপাইনের দক্ষিণাংশে অবস্থিত মিন্দানাও প্রদেশের কথা; ভারতশাসিত কাশ্মির রাজ্যের কথা; ভারতের আসাম প্রদেশ বা নাগাল্যান্ড প্রদেশের কথা; রাশিয়ার চেচনিয়া অঞ্চলের কথা ও শ্রীলঙ্কার উত্তর-পশ্চিম অংশের তামিল জনগোষ্ঠীর কথা বলতে পারি। ইসরাইল নামক ইহুদিবাদী রাষ্ট্রের অত্যাচারের প্রতিক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিবাদের ভাষা ও ধরনের কথা বলতে পারি। ১৯৬০-এর দশকের তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদের ভাষা কী ছিল, সেটা আলাদাভাবে বলার কোনো প্রয়োজনই নেই।
রোহিঙ্গা সমস্যার সংক্ষিপ্ত ইতিকথা
পাঠক অনুগ্রহ করে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত মিয়ানমার নামক রাষ্ট্রের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রসঙ্গটি ওপরের উদাহরণগুলোর আলোকে বিবেচনা করুন। মিয়ানমার রাষ্ট্রে অনেকগুলো ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী আছে; তার মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী একটি। এটাই সত্য, অন্য সব ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ধর্মীয় পরিচয়ে খ্রিষ্টান বা বৌদ্ধ হলেও একমাত্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ধর্মে হলো মুসলমান। বিশেষত, ১৯৬২ সাল থেকে বার্মার কেন্দ্রীয় সরকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাথে নিপীড়নমূলক, বঞ্চনামূলক আচরণ করতে থাকে। কেন্দ্রীয় সরকার হীনস্বার্থে এবং নেতিবাচক দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে বার্মা রাষ্ট্রকে মুসলমানমুক্ত করতে চায়; বার্মার কোনো মুসলমান, ইসলামি নাম রাখতে পারে না বরং তাকে বার্মিজ নাম রাখতে হয়। রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলমানদের বার্মার নাগরিকত্বই কোনো দিন প্রদান করা হয়নি। তাদের লেখাপড়া করতে ও ভালো কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য করতে দেয়া হয়নি। ফলে তারা একটি অনগ্রসর জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যেই চলে অত্যাচার-নির্যাতন। কোনো সময় এরূপ অমানবিক আচরণ বেশি ভয়ঙ্কর হয়, কোনো সময় কম ভয়ঙ্কর হয়। যখন বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তখন রোহিঙ্গা জনগণ জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আসতে বাধ্য হয়। অবস্থার উন্নতি হলে কিছু শরণার্থী নিজের দেশে ফিরে যায়; কিছু শরণার্থী বাংলাদেশেই থেকে যায়। এ রকম করতে করতে গত ৩০-৪০ বছরে বেশ কিছু রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে থেকে গিয়েছে। রাখাইন প্রদেশ থেকে সরাসরি অথবা বাংলাদেশ হয়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করেছে। আবার এটাও বাস্তব, চার-পাঁচ বছর ধরে রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন বাড়তে বাড়তে ২০১৬-১৭ সালে এসে চরম ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শিকার হচ্ছে গণহত্যার। ফলে বন্যার পানির মতো রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুর স্রোত বাংলাদেশের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটের আরেকটি ক্ষুদ্র, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক আছে; পরের অনুচ্ছেদে আলোচনা করছি।
সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট
১৯৮০-এর দশকে এবং এর কিছু পর পর, রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা জনগণের মধ্য থেকে দু-একটি চরমপন্থী সশস্ত্র সংগঠনের উত্থান ঘটেছিল। ২০১৩ সালে একটি সংস্থা জন্ম নেয় মিয়ানমারের মাটিতে। এর নাম ‘আরকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি’ (ইংরেজিতে নামের চারটি শব্দের আদি অক্ষর নিলে নাম হয় : আরসা)। এরূপ সংস্থার জন্মের প্রত্যক্ষ কারণ হচ্ছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনায় তাদের সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত চরম নির্যাতন আর পোড়ামাটি নীতি। ফলে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর প্রতিশোধপরায়ণ হয়। এর ধরন হচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কিংবা পুলিশের থানা বা চেকপোস্ট, সরকার বা সেনাবাহিনী বা পুলিশের গাড়িবহর বা টহলদল ইত্যাদির ওপর হামলা করা। আরসা গত বছরের অক্টোবরে প্রথম এই কাজ শুরু করেছিল এবং কয়েক দিন আগে আগস্ট মাসের ২৫ তারিখ বড়সড় আকারে এরূপ গেরিলা কর্মকাণ্ড নব উদ্যমে শুরু করে। তাদের আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশ রোহিঙ্গা জনগণের গ্রামে গ্রামে ব্যাপকভাবে সর্বাত্মক আক্রমণ চালায়। ফলে সাধারণ নিরীহ রোহিঙ্গা জীবন বাঁচানোর জন্য সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশের দিকে ধাবিত হয়।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া
অতীতেও মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর অত্যাচারের কারণে রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে এসেছে। যেমন ১৯৭৮ সালে। আলাপ-আলোচনার পর সুশৃঙ্খলভাবে তাদের ফেরত দেয়া সম্ভব হয়েছে। ওই সময়ের সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপ কাক্সিক্ষত ফল দিয়েছিল, কিন্তু এবারের সমস্যাটির মাত্রা বৃহৎ ও বিবিধ আঙ্গিকের। ফলে বাংলাদেশে বলাবলি, লেখালেখি চলছেই। অপর দিকে চলছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করার জন্য জনগণের তৎপরতা। বিশেষভাবে এরূপ তৎপরতা আছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে। গত শনিবার নিজেও চট্টগ্রাম মহানগরে এরূপ দু’টি সংস্থার সাথে মিলে কাজ করেছি। উদ্দেশ্য রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণতৎপরতায় শরিক হওয়া, অন্যদের সচেতন ও শরিক করা। ওইরূপ একটি সামাজিক-অরাজনৈতিক-সেবামূলক সংগঠনের নাম হচ্ছে ‘আমরা চাটগাঁবাসী’ এবং অপর মানবাধিকার ও মানবতাবাদী সেবামূলক সংগঠনের নাম ‘হিউম্যানিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’। বাংলাদেশ সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা যেমন আছে, তেমনি সমালোচনাও আছে। তবে সার্বিকভাবে দেশের গণমানুষের চেতনা হলো, বিপদগ্রস্ত ও দুর্যোগ-আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের সাথে সহমর্মিতা এবং মানবিক সহযোগিতা।
ন্যাশনাল সলিডারিটি ফর দি রোহিঙ্গা
এ কথাটির মর্মার্থÑ রোহিঙ্গাদের জন্য জাতীয় সংহতি। বাংলাদেশের নাগরিকদের সচেতন মহলে এ প্রসঙ্গে তৎপরতা বৃদ্ধির জন্য দুই দিন আগে (১১ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টা থেকে ৩টা) একটি আলোচনা সভা আহ্বান করেছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে আমি (অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক) চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে ‘চাটগাঁইয়া’, মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, দেশের একজন নাগরিক, সেনাবাহিনীর একজন সাবেক সৈনিক, একজন কলাম লেখক, টিভি আলোচক এবং রাজনীতির অঙ্গনে ২০ দলীয় জোটের একটি শরিক দলের চেয়ারম্যান তথা একজন রাজনৈতিক কর্মী। কিন্তু এই আলোচনা সভার নিমিত্তে অরাজনৈতিক নিরপেক্ষ-নির্মোহ পরিপ্রেক্ষিত পরিবেশ-দৃষ্টিভঙ্গিতে মেহমানদের দাওয়াত দিয়েছি এবং আলোচনা সঞ্চালন করেছি। নিজে ছিলাম সঞ্চালক এবং বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুর রউফ সভাপতিত্ব করেন। ব্যানারে নাম ছিলÑ ‘ন্যাশনাল সলিডারিটি ফর দি রোহিঙ্গা’। সভার বিষয় ছিলÑ ‘মিয়ানমার কর্তৃক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা (জেনোসাইড)ও জাতিগত নিধনপ্রক্রিয়ার (এথনিক ক্লিনজিং) ফলে বাংলাদেশ সীমান্তে সৃষ্ট রোহিঙ্গা মানবিক বিপর্যয় প্রসঙ্গে আলোচনা।’ মূল থিম ছিলÑ ‘বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা এবং বিপদগ্রস্ত বিপর্যস্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর মানবিক আহ্বানে সাড়া দেয়াÑ এ দুটোর মধ্যে সমন্বিত অবস্থান সৃষ্টি করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সহমর্মীদের প্রতি একটি আহ্বান।’ আলোচনা সভায় অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। হুবহু এ নামে একটি ফেসবুক পেজ আছে এবং একটি ইউটিউব চ্যানেল আছে। আলোচনা চলার সময় লাইভ-স্ট্রিমিং করে ফেসবুকে দেখানো হয়েছে। আগ্রহীরা এখনো দেখতে পারবেন। ওই আলোচনা সভায় আলোচনার সুবিধার্থে বিষয়ভিত্তিক কাঠামো উপস্থাপন করেছিলাম। সেটি প্রায় হুবহু এই কলামে পুনরায় লিপিবদ্ধ করছি।
মিয়ানমারের অপরাধগুলো
এক. রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে মিয়ানমার সরকার ও রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার উপেক্ষা করছে। দুই. রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হত্যা নিপীড়ন ধর্ষণ জখম অগ্নিসংযোগ অপহরণ ইত্যাদি কর্ম পরিচালনার মাধ্যমে গণহত্যা তথা জেনোসাইড-অপরাধ করছে। এটা মারাত্মক আন্তর্জাতিক অপরাধ। তিন. নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর তথা নিজ দেশের জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন করে প্রতিবেশী দেশের জন্য নিরাপত্তা সমস্যা, পরিবেশ সমস্যা, অর্থনৈতিক সমস্যা, সামাজিক সমস্যা ও মানবিক সমস্যা সৃষ্টি করার কোনো অধিকার মিয়ানমারের নেই। চার. মিয়ানমারের অপরাধগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে, কনভিনসিং মাত্রায় উপস্থাপন করা প্রয়োজন বা উপস্থাপনযোগ্য। মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে কিংবা সম্ভব হলে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের নালিশ আন্তর্জাতিক আদালতে আনা সম্ভব বলে অনেকেই মনে করেন।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ
এক. বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন কারণে মানবিক বিপর্যয় অতীতেও সৃষ্টি হয়েছে, বর্তমানেও হচ্ছে। ওইরূপ বিপর্যয় যেভাবে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে বা পেরেছিল, রোহিঙ্গা মানবিক বিপর্যয় তা করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও শান্তি পরিমণ্ডলে (ইন ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোম্যাটিক অ্যান্ড পিস এরিনা), রোহিঙ্গা বিপর্যয়কে উপযুক্ত গুরুত্ব দিয়ে কনভিনসিং মাত্রায় উপস্থাপন করা প্রয়োজন। দুই. আমরা যার বা যাদের মানবিক বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা করছি, তথা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, ঘটনাক্রমে ধর্মীয় পরিচয়ে তারা মুসলমান হলেও মিয়ানমারের জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বাংলাদেশ যেহেতু একটি মুসলিমপ্রধান দেশ, সেহেতু একটি আবেগ থেকে উৎসারিত স্নায়বিক চাপ বাংলাদেশের মানুষের ওপর অবশ্যই বিদ্যমান; এইরূপ আবেগ সচরাচর উপেক্ষা করা যায় না। এটাকে এ রকমও বলা যায়, বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গা মানুষের পাশে দাঁড়ানো অথবা রোহিঙ্গা মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানো, বাংলাদেশের মানুষের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব বা বাংলাদেশের মুসলমানদের ধর্মীয় প্রান্তিক দায়িত্ব। মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টি বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়ার প্রতি নিবদ্ধ থাকা স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো থেকে কূটনৈতিক সহমর্মিতা এবং বস্তুগত সহযোগিতা আদায় করা বাংলাদেশ সরকারের কাজ। সে কাজে আমরা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উপাত্ত
এক. বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের কক্সবাজার জেলা পূর্ণভাবে এবং বান্দরবান জেলা ও চট্টগ্রাম জেলা আংশিকভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুবাদে সৃষ্ট বিপর্যয়ে প্রভাবিত বা আক্রান্ত। এ জেলাগুলোর প্রশাসনিক ভৌত কাঠামো এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক সক্ষমতা, এমন বিপর্যয় মোকাবেলা করার জন্য যথেষ্ট নয়। অতএব বাংলাদেশের সার্বিক জনগণের পক্ষ থেকে সহায়তা একান্তই প্রয়োজন। দুই. বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ মাত্র কিছু দিন আগে ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হয়েছে। উত্তর অংশ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে অতি সম্প্রতি। খাদ্য মজুদ আশঙ্কাজনক না হলেও সন্তোষজনক নয়। তিন. বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল বিভাজিত। এর কারণ, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের অতি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন। কারণ, জানমালের নিরাপত্তার অভাব, গুম, অপরহণ, হত্যা ইত্যাদির আতঙ্ক। সরকারের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল। স্বৈরাচারী মিয়ানমার সরকার, বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক দুর্বলতাকে আমলে নিয়ে কিছু করছে কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন বটে। করতেও পারে, না-ও করতে পারে। চার. একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের প্রথাগত নিরাপত্তা সমগ্র জাতির মনোবল এবং আবেগের সাথে জড়িত। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে দেশের সীমান্ত রক্ষার প্রক্রিয়ার সামর্থ্য, মানবিক বিপর্যয়ের প্রসঙ্গে এবং মিয়ানমারের আচরণের কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আলোচ্য বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। মিয়ানমার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছেÑ এরূপ অভিযোগ দেশবাসীকে মর্মাহত করছে। তবে মিয়ানমার কর্তৃক সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক সৌজন্য লঙ্ঘনের প্রতিউত্তর কী হলে ভালো হবে, সেটি আলোচনাযোগ্য বিষয়; খোলামেলা না হলেও উপযুক্ত ফোরামে। যা-ই করা হোক না কেন, বিশ্বাসযোগ্য ও দর্শনীয় হওয়া বাঞ্ছনীয়।
ভূরাজনৈতিক বা ভূকৌশলগত উপাত্ত
এক. উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি প্রদেশের মধ্যে অনেকগুলোতেই ইনসার্জেন্সি এবং কাউন্টার ইনসার্জেন্সি পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল ও আছে। মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিম অংশসহ মিয়ানমার রাষ্ট্রের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর আবাসভূমিতে, ইনসার্জেন্সি এবং কাউন্টার ইনসার্জেন্সি পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল ও আছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলেও এরূপ পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে এরূপ পরিস্থিতি অতীতে ছিল, মাঝখানে ম্রিয়মাণ হয়েছিল, পুনরায় এখন তা সৃষ্টি হয়েছে। দুই. বর্তমান বিশ্ব টেররিজম বা সন্ত্রাসবাদ, মিলিটেন্সি বা চরমপন্থা, মাদক পাচার ও মাদকাসক্তি, অবৈধ পন্থায় অস্ত্র ব্যবসা ও অস্ত্র পাচার ইত্যাদি উপসর্গে আক্রান্ত। ঘোলাপানিতে যেমন মাছ শিকার সহজ, উপদ্রুত ভৌগোলিক এলাকার সাথে যদি বিপর্যস্ত ও বিক্ষুব্ধ মনোভাবাপন্ন জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ হয়, তাহলে এই উপসর্গগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। উপসর্গগুলোর প্রভাবে বিস্তীর্ণ এলাকা ও অনেক জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতএব আরাকান বা রাখাইন যদি উপদ্রুত হয়, তাহলে এর প্রতিবেশী ভৌগোলিক এলাকাগুলোও উপদ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
এক. বাংলাদেশ অতীতেও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আশ্রয় দেয়ার প্রক্রিয়ার গুণগত মান বা পদ্ধতিগত মান যথেষ্ট উন্নত ছিল না বলে প্রতীয়মান। ফলে বিদেশে রোহিঙ্গা ইস্যুটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইতিবাচকভাবে প্রতিফলিত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেতিবাচকভাবে প্রতিফলিত। অতএব এবার আশ্রয় দেয়ার এবং আশ্রিতদের ব্যবস্থাপনা গুণগত মান উন্নত করা অতীব প্রয়োজন। দুই. প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলার সময়ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ার চালিকাশক্তি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কূটনীতি। রাষ্ট্রীয় কূটনীতিকে প্রভাবান্বিত করে ভূরাজনৈতিক (জিও পলিটিক্যাল) ও ভূকৌশলগত (জিও স্ট্র্যাটেজিক) উপাত্তগুলো। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশকে ঘিরে, মিয়ানমারের অমানবিক অকূটনৈতিক আচরণ থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে বাংলাদেশের প্রতি বন্ধুসুলভ মনোভাব আছে এমন (প্রতিবেশী বা আঞ্চলিক ও দূরবর্তী) রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক আচরণ এবং দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের অনুকূলে আনা প্রয়োজন। অতএব যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, জাতিসঙ্ঘ, ওআইসি ইত্যাদি দেশ ও সংস্থার সাথে বাংলাদেশ সরকারের ইন্টারঅ্যাকশন প্রণিধানযোগ্য ও আলোচনাযোগ্য। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাবে চীন কর্তৃক ভেটো প্রদান এবং এবার মিয়ানমার সফরে গিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্তব্যগুলো আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সমাগত। অতএব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক মহলে এ বিষয়ে অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ অতি আবশ্যক।
কল অব দি আওয়ার (সময়ের ডাক)
‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’ এই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে বাংলাদেশের মানুষকে সচেতন করে জাতীয় সংহতি গড়ে তোলা, বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য ইতিবাচক মনোবৃত্তি গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক সহায়তা ও সাহায্য আনয়নের লক্ষ্যে পরিবেশ ও পরিস্থিতি সৃষ্টি করা একান্তই প্রয়োজন। জাতীয় সংহতি গড়ে তোলা যাবে কি যাবে না, সেটা আলোচিত বিষয় হতে পারে; কিন্তু আহ্বান জানাতে দোষ নেই, চেষ্টা করতে দোষ নেই। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে ব্যক্তি ইবরাহিম এই আহ্বান জানাচ্ছি। পাঠকের পরামর্শ, সুধীজনের পরামর্শকে স্বাগত জানাই (ই-মেইলে বা ফেসবুকে)।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
যোগাযোগ : mgsmibrahim@gmail.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.