পেটের সন্তানকে বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রাখলেন রোহিঙ্গা নারী
পেটের সন্তানকে বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রাখলেন রোহিঙ্গা নারী

পেটের সন্তানকে বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রাখলেন রোহিঙ্গা নারী

কক্সবাজার (দক্ষিণ) সংবাদদাতা

সীমান্ত পয়েন্ট পার হয়ে পায়ে হেঁটে গত সোমবার ১৯ জনের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উখিয়া বালুখালী অস্থায়ী শিবিরের দিকে আসছেন জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী মাজেদা বেগম। বিধ্বস্ত ও নির্বাক খুদিজার কোলে দুই দিনের এক নবজাতক। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ পালিয়ে আসার পথে মিয়ানমার সীমান্তের জঙ্গলে এই শিশুর জন্ম হয়েছে। ছেলেটির এখনো নাম রাখা হয়নি, কিন্তু তার জীবন শুরু হয়েছে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে, যেখানে নেই বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন বা বেঁচে থাকার মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

নবজাতক ছেলের মা মাজেদা বেগম জানান, ‘ঈদুল আজহার দিন আরকানের বুচিডং এলাকার তংবাজারে কয়েকজন বৌদ্ধ এসে আমাদের সাথে কথা আছে বলে সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে আমাদের গ্রামের ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার থেকে মর্টারশেল নিক্ষেপ করে আমাদের গ্রামের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। এতে আমার বাড়ির সব কিছু পুড়ে যায়। সাথে কিছুই নিয়ে আসতে পারিনি। ১৩ দিন হেঁটে আসার পর সোমবার ভোরে সীমান্ত অতিক্রম করি। এরমধ্যে গত রোববারে সকালে সীমান্তের পাহাড়ি জঙ্গলে আমার সন্তানের জন্ম হয়। গত দুইদিন ধরে কিছুই খাইনি। তারপর হেঁটে এই পর্যন্ত আসলাম। 


মাজেদা বেগম কোলে নেয়া শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে আরো বলেন, আসার সময় এক দিকে প্রাণ রক্ষার ভয়, অন্য দিকে আমার প্রসববেদনা। আশপাশে নেই কোনো ডাক্তার বা ধাত্রী। প্রতি পদে পদেই প্রাণ হারানোর ভয়ের মধ্যে আমার সন্তানের জন্ম হয়েছে। নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য পাহাড়-জঙ্গল বেয়ে আমরা শুধু ছুটছি। নিজ গ্রামে জ্বলছে আগুন। নিজের জীবনের চাইতে অনাগত সন্তানের চিন্তাই মাথায় বেশি। সন্তানকে বাঁচাতেই গর্ভাবস্থায় এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। মাজেদার সাথে পালিয়ে আসার সময় তার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়িসহ ১৯ জন সদস্য ছিল। তার স্বামী বলেন, প্রসব বেদনায় কাতর ছিল মাজেদা। প্রসব বেদনার যন্ত্রণা তাকে এবং আমাদের ভোগাচ্ছিল। ব্যথার সময়কার দৃশ্যগুলো বলে বোঝানো যাবে না। পাশে কোনো ডাক্তার নেই, কোনো ওষুধের ব্যবস্থা ছিল না।


সীমান্ত পেরিয়ে আসার সময় পথেই জন্ম হয়েছে এই রকম শতাধিক রাষ্ট্রহীন-নাগরিকতাহীন, আশা-স্বপ্ন-ভবিষ্যতহীন মানব শিশুর। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও গর্ভধারণী মা সন্তান জন্ম দিতে পেরে খুব খুশি।

নাফ নদী থেকে আরো ৪ লাশ উদ্ধার
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় শাহপরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়া এলাকায়  নৌকাডুবির ঘটনায় আরো চার রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল রাতে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি নৌকা ডুবে যায়।

আজ বুধবার সকালে জালিয়াপাড়া এলাকার নাফ নদী থেকে মধ্যবয়সী একজন পুরুষ ও এক শিশুর লাশ এবং সকাল পৌনে দশটার দিকে নাজিরপাড়া এলাকায় নদী থেকে আরো এক নারী ও শিশুর লাশ উদ্ধার করে স্থানীয় লোকজন। 

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে আরো দুই শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়।

ডুবে যাওয়া নৌকায় ১৮ জন যাত্রী ছিল। এর মধ্য ৬-৭ জন সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও অনন্ত ১১ জন নিখোঁজ রয়েছে। রাতে দুই শিশুর লাশ উদ্ধার করেছে স্থানীয় লোকজন। ধারণক্ষমতার বেশি লোক ওঠায় নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে বলে জানান বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গারা।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাংবাদিকদের জানান, পুলিশ লাশগুলো দাফনের ব্যবস্থা করছে।

পুরুষ সদস্যদের কোথায় রেখে এসেছেন রোহিঙ্গা নারীরা?
 অনেক রোহিঙ্গা নারী অভিযোগ করছেন, তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে
সপ্তাহ খানেক আগে টেকনাফের কুতুপালং ক্যাম্পে এসেছেন আলমাস খাতুন। এখনো থাকার বন্দোবস্ত হয়নি। ক্যাম্পে এক পরিচিতজনের সাথে আছেন। জানতে চেয়েছিলাম তার সাথে পরিবারের আর কে কে এসেছেন বাংলাদেশে।
আলমাস খাতুন বলেন, তার স্বামী এবং একমাত্র ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এরপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের ধরে নিয়ে গেছে। তিনি জানেন না আদেৌ তারা বেঁচে আছেন কিনা।
আলমাস খাতুনের মত অনেক নারী ও শিশু বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবারের পুরুষ সদস্যরা তাদের সাথে আসেনি। তাহলে তাদের পরিণতি কী হয়েছে?

রাখাইন রাজ্য থেকে আসা আরেকজন নারী শরণার্থীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আমার সাথে কথা বলার সময় তিনি কান্নায় ভেংগে পড়ছিলেন।


এই নারী বলছিলেন তার স্বামী এবং তার তিন ছেলেকে তার সামনেই হত্যা করা হয়েছে। দুই ছেলে পালিয়ে যাওয়ার সময় পিছন থেকে গুলি করা হয়। সেখানেই মৃত্যুর কোলে লুটিয়ে পড়ে।
তিনি আরো বলছিলেন পৃথিবীতে এখন আমার কেউ নেই। সব শেষ হয়ে গেছে।
গত ২৫শে অগাষ্ট হতে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজারের বেশি শরণার্থী বাংলাদেশে এসেছে বলে ধারণা করছে ত্রাণ সংস্থাগুলো। কিন্তু স্থানীয় মানুষ এবং জনপ্রতিনিধিরা বলছে শরণার্থীর সংখ্যা আসলে সাড়ে ৫ লাখের বেশি।

এই বিপুল সংখ্যাক শরণার্থীর বড় অংশই নারী এবং শিশু।
পালিয়ে আসা এসব মানুষ বলছে তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যদের বেশির ক্ষেত্রেই হত্যা করা হয়েছে। অথবা নিখোঁজ আছে।


মোহাদ্দেসা নামে এক নারী বলছেন তার স্বামী, এক ছেলে এবং শ্বশুরকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হত্যা করেছে। তিনি বলছিলেন, সেনাবাহিনীর সন্দেহ ছিল তার স্বামী আল ইয়াকিন নামের একটি গ্রুপের সদস্য।


মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের উপর হামলার কারণ হিসেবে আরাকান রোহিংগা স্যালভেশন আর্মি বা আরসাকে দায়ি করছে। এই সংগঠনটি স্থানীয় ভাবে হারাকাহ আল ইয়াকিন নামে পরিচিত ছিল।
তবে স্থানীয় ভাবে একটা গুঞ্জন রয়েছে, বেশ কিছু পরিবারের পুরুষ সদস্যরা মিয়ানমারে রয়ে গেছেন তাদের ভাষায় লড়াইয়ে অংশ নেয়ার জন্য। তবে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত হয়েছেন আবুল কালাম। তিনি অবশ্য এই তথ্যকে নাকচ করে দিলেন।
তিনি বলেন, তাকে গুলি করার সময় তারা বলেছে যে এই দেশ মুসলমানদের জন্য নয়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.