চালে চালবাজি! দেশী চাল বিদেশী দামে
চালে চালবাজি! দেশী চাল বিদেশী দামে

চালে চালবাজি! দেশী চাল বিদেশী দামে

জিয়াউল হক মিজান

জনসংখ্যা ও চাল উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকা এবং সঠিক সময়ে চালের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার না করায় তিন কোটি মেট্রিক টন চাল উৎপানদকারী দেশ বাংলাদেশ এখন চরম চাল সঙ্কটে ভুগছে। উপযুক্ত সময়ে আমদানি না করায় সরকারি সংগ্রহও নেমে এসেছে শূূন্যের কোঠায়। সরকারের কঠোরতা ও নজরদারির অভাব এবং সংশ্লিষ্টদের অতিকথনের সুযোগে চালের বাজারের ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এসবের ফলে দেশবাসীকে দেশী চাল কিনে খেতে হচ্ছে বিদেশী চালের দামে।


পর্যালোচনায় দেখা যায়, বছরের শুরুর দিকে দেশের বাজারে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম যখন ৩৮ থেকে ৪০ টাকা তখন ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ আশপাশের দেখগুলোয় চালের দাম ছিল ২৮ থেকে ৩০ টাকা। আমদানির ওপর ২৮ শতাংশ শুল্ক আরোপিত থাকায় ব্যবসায়ীরা তখন চাল আমদানিতে আগ্রহ দেখায়নি। এপ্রিল মাসের দিকে এসে কয়েক লাফে ১০ থেকে ১২ টাকা বেড়ে দেশে মোটা চালের দাম দাঁড়ায় ৪৮ থেকে ৫২ টাকা। বিভিন্ন মহল থেকে তখন তীব্র দাবি উত্থাপন করা হলেও সরকার চালের আমদানি শুল্ক কমায়নি। 


দুই মাস চুপ থেকে জুনে আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। ব্যবসায়ীদের আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার সুযোগ দেয়া হয় বিনা পুঁজিতে। কিন্তু তত দিনে মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে গেছে। বিশ্ববাজারে চালের দাম বেড়ে যায় কেজিতে আট থেকে দশ টাকা। ফলে সরকার যেখানে আশা করেছিলে দেশে চালের দাম কেজিতে ছয় টাকা কমবে সেখানে এক মাস অপেক্ষা করার পর কমেছে মাত্র দুই টাকা। কিন্তু সে কমাও স্থায়িত্ব পায়নি। কয়েক দিনের ব্যবধানে দাম আবারো বাড়তে থাকলে গত মাসে সরকার চালের আমদানি শুল্ক আরো ৮ শতাংশ কমিয়ে মাত্র ২ শতাংশ নির্ধারণ করে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বাজারে চালের দাম বেড়েই চলেছে।


রাজধানী ঢাকার খুচরা বাজারে গতকাল প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হয় ৪৫ থেকে ৪৮ টাকায়। মাঝারি মানের চালের কেজি ৪৬ থেকে ৫০ টাকা। আর সরু চালের জন্য গুনতে হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৬২ টাকা। এক সপ্তাহ আগেও চাল বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি দুই থেকে পাঁচ টাকা কম দরে। গত এক বছরে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ১২ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত। চালের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির জন্য কম উৎপাদনকে বাড়িয়ে দেখানো এবং সময়মতো বিদেশ থেকে আমদানির উদ্যোগ না নেয়াকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।


পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমদানি শুল্ক কমানোর পর থেকে গত তিন মাসে বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি হয়েছে চার লাখ টনের মতো। সরকারিভাবে এসেছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন। কিন্তু তাতেও চালের দাম কমছে না, উল্টো বাড়ছে। এর কারণ হিসাবে আমদানিকারকেরা জানান, সরকার আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করতে বিলম্ব করায় কম দামে চাল আমদানির সুযোগ থেকে ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন। তত দিনে রফতানিকারক দেশ, ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তাছাড়া বেনাপোল-পেট্রাপোলসহ স্থল বন্দরেগুলোয় জটের কারণে ভারতীয় অংশে ট্রাকের ভাড়াও অনেক বেড়েছে। বন্দরে একটি ট্রাক খালাস করতে ২০ থেকে ২২ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে বলে জানান আমদানিকারকেরা।


জানা যায়, সন্তোষজনক বাড়তি মজুদ থাকায় আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে চালের শুল্ক হার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করেছিল সরকার। এর সাথে রেগুলেটরি ডিউটি তিন শতাংশ যোগ হওয়ায় ব্যবসায়ীদের ২৮ শতাংশ শুল্ক গুণতে হতো। ফলে গত দেড় বছর ধরে বেসরকারি পর্যায়েও চাল আমদানি প্রায় বন্ধ ছিল। কিন্তু চালের মজুদ কমতে কমতে দেড় লাখ মেট্টিক টনের ঘরে চলে আসায় এবং দাম কেজিপ্রতি ৬০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় আমদানি শুল্ক কমাতে বাধ্য হয় সরকার। রমজানের শেষভাগে এসে আমদানি বাড়াতে বিদ্যমান শুল্কহার ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় সরকার। আগস্টের মাঝামাঝিতে এসে আরো ৮ শতাংশ কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় মাত্র ২ শতাংশ। তফসিলি ব্যাংকগুলোকে বিনা বিনিয়োগে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার অনুমতি দেয়ার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।


কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১০ বছরে দেশে চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০০৬ সালে প্রতি কেজি মিনিকেট চালের গড় দাম ছিল ২৭ টাকা ৯৫ পয়সা। ২০১৬ সালে ওই চালের দাম হয় ৪৮ টাকা ৩৪ পয়সা। ২০০৬ সালে নাজিরশাইলের দাম ছিল ২৫ টাকা ৫৪ পয়সা। ২০১৬ সালে ওই চালের দাম হয় ৫৫ টাকা ৭৮ পয়সা। ২০০৬ সালে পাইজাম চালের দাম ছিল ২৩ টাকা। গত বছর ওই চালের দাম ছিল ৪০ টাকা ৩৭ পয়সা। ২০০৬ সালে পারিজা স্বর্ণার দাম ছিল ১৯ টাকা ২৫ পয়সা। গত বছর ওই চালের দাম ছিল ৩৭ টাকা ১৯ পয়সা। ২০০৬ সালে বিআর এগারো-আটের দাম ছিল ১৮ টাকা ২৫ পয়সা। গত বছর ওই চালের দাম ছিল ৩৫ টাকা ৪১ পয়সা। 


অনুসন্ধানে জানা যায়, চালের বাজারে অস্থিতিশীলতার জন্য সরকারের ক্রয়নীতিও অনেকাংশে দায়ী। সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যস্বত্বভোগী বানাতে অধিক দামে ধান-চাল কিনছে। এর ফলে কৃষক লাভবান না হলেও দলীয় লোকেরা উপকৃত হচ্ছে। আর বাজার অস্থিতিশীল হয়ে তার দায় চাপছে দেশের সব মানুষের কপালে। গত বছর ধানের বাম্পার ফলন হওয়ায় ২৩ টাকা দরে ধান এবং ৩২ টাকা দরে চাল ক্রয় করে সরকার। কিন্তু ক্রয়নীতিতে দুর্বলতা এবং দলীয় লোকদের মধ্যস্বত্ব ভোগের কারণে কৃষক এ দাম পায়নি। সরকার ৯২০ টাকা দর বেঁধে দিলেও মৌসুমের শুরুতে কৃষক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। আর এই সুযোগটা নিয়ে ধান মজুত করেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযাযী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৬৮ হাজার টন চাল উৎপাদিত হয়েছে; যা আগের বছরের চেয়ে ২ লাখ ৫৮ হাজার টন বেশি। চলতি অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্য তিন কোটি ৫০ লাখ টন। হওরের পরিস্থিতি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের দেয়া তথ্যানুযায়ী, এবার বোরো মওসুমে ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। এ থেকে ১ কোটি ৯১ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করেছিল সরকার। তবে হাওর তলিয়ে যাওয়ায় তা কিছুটা কম হওয়ার আশঙ্কা আছে। হাওরের দুই লাখ ২৪ হাজার হেক্টরে বোরোর আবাদ হয়েছিল। সেখান থেকে প্রায় ৯ লাখ টন চাল উৎপাদনের আশা করেছিল অধিদফতর। তবে সেখানকার বড় অংশের ধানই নষ্ট হয়ে যাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন তারা।

যদিও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম দাবি করেছেন হাওর ডুবে গেলেও চালের কোনো ঘাটতি হবে না। তিনি দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকে। হাওরে ছয় লাখ টন কম উৎপাদন হলেও কোনো ঘাটতি হবে না। অথচ সেই খাদ্যমন্ত্রীই ক’দিন আগে চাল কিনতে মিয়ানমারে গিয়েছিলেন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.