বন্দিদের সাথে দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে ৬৩ দিনের অনশন

বিপ্লবী যতীন্দ্র নাথ দাসের ৮৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী যতীন্দ্র নাথ দাস ৬৩ দিন অনশনের পর ১৯২৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। রাজবন্দিদের সাথে জেল কর্তৃপক্ষের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে তিনি এই অনশন শুরু করেছিলেন।

যতীন্দ্র নাথ দাস ১৯০৪ সালের ২৭ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন ভারতীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং বিপ্লবী ভগৎ সিংয়ের সহকর্মী। আত্মত্যাগী, সাহসী মানুষটি লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়ে ১৯২৯ সালের ১৪ই জুন গ্রেপ্তার হন। জেলবন্দীদের অধিকারের দাবিতে ওই বছরই ১৩ই জুলাই অনশন শুরু করেন তিনি। ৬৩ দিন অনশনের পর ১৩ই সেপ্টেম্বর মাত্র ২৪ বছর বয়সে জেলেই মৃত্যু হয় তাঁর। স্বাধীনতার পর তাঁর সম্মানে কলকাতা মেট্রোর হাজরা অঞ্চলের মেট্রো স্টেশনটির নামকরণ করা হয় যতীন দাস পার্ক মেট্রো স্টেশন।

যতীন্দ্রনাথ দাসের জন্ম কলকাতায়। তাঁর পিতার নাম বঙ্কিমবিহারী দাস। ১৯২০ সালে ভবানীপুর মিত্র ইন্সটিটিউশন থেকে ম্যাট্রিক পাস করে কংগ্রেসের সদস্য হয়ে অসহযোগ আন্দোলনেযোগ দেন। ১৯২৮-২৯ সনে বঙ্গবাসী কলেজের ছাত্র ছিলেন। ১৯২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বন্যার্তদের যথেষ্ট সাহায্য করেন।

১৯২৯ সালের ১৪ জুন যতীন দাসকে তাঁর কলকাতার বাড়ি থেকে লাহোর পুলিশের নির্দেশে গ্রেপ্তার করা হয়। মূলত ঐ সময় ইস্যু ছিল লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার বিচারাধীন বলে এই গ্রেপ্তার। পরবর্তী সময়ে এরা জেলের ভেতর রাজনৈতিক বন্দিদের মর্যাদার দাবীতে এবং মানবিক সুযোগ সুবিধার আন্দোলনে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। তাঁরা ১৩ জুলাই থেকে ভগৎসিং ও বটুকেশ্বর দত্তের সমর্থনে অনশন সংগ্রাম আরম্ভ করে।

যতীন দাস ছাড়া আর কারো অনশন আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ছিল না। ভাবাবেগে চালিত হয়ে অনশন সংগ্রামে যোগ দিতে নিষেধ করেছিল অন্য সাথীদের। সে বলল, রিভলবার পিস্তল নিয়ে লড়াই করাই চেয়ে অনেক বেশি কঠোর এক অনশন সংগ্রামে আমরা নামছি। অনশন সংগ্রামীকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে হয়।

যতীন দাস আরো বলেন, সে নিজে অনশন আরম্ভ করলে যতদিন না সরকার দাবী মেনে না নেয়, ততদিন অনশন চালিয়ে যাবে। সবাইকে বলে তাড়াহুড়ো করে কোন কিছু না করাই ভাল। যতীন দাসের হুশিয়ারি সত্ত্বেও পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐতিহাসিক লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার অনশন শুরু হয়। ওদিকে মামলার কাজও চলছিল।

১৯২৩ সনে বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ সান্যাল কলকাতার ভবানিপুরে ঘাঁটি করলে তিনি এই দলে যোগ দেন। পরে দক্ষিণেশ্বরের বিপ্লবী দলের সংগেও তাঁর যোগাযোগ হয়। ১৯২৪ সালে দক্ষিণ কলকাতায় "তরুণ সমিতি" প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই সময় গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা জেলে প্রেরিত হন। জেল কর্তৃপক্ষের আচরণের প্রতিবাদে ২৩ দিন অনশন করেন। ১৪ জুন ১৯২৯ তারিখে লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি হিসেবে লাহোর জেলে প্রেরিত হন। এখানে রাজবন্দিদের উপর জেল কর্তৃপক্ষের দুর্ব্যবহারের জন্য অনশন শুরু করেন। এই সময় তাঁকে বহুবার জোর করে খাওয়াবার চেষ্টা করা হয়।

৬৩ দিন অনশনের পর তিনি মারা যান। এইভাবে মৃত্যুবরণ করার ফলে রাজবন্দিদের উপর অত্যাচার প্রশমিত হয়েছিলো। এই বীর শহিদের লাশ কলকাতায় আনা হলে দুই লাখ লোকের এক বিরাট মিছিল নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে শোকযাত্রায় কেওড়াতলা শ্মশানঘাট পর্যন্ত অনুগমন করে। মৃত্যুর আগে অতি কষ্টে ক্ষীণ কন্ঠে তিনি তাঁর শেষ ইচ্ছা ব্যাক্ত করে গেলেন- "নৈষ্ঠিক শাস্ত্র বিশ্বাসী বাঙালি ফ্যাসনে আমাকে কালীবাড়ী নিয়ে যাওয়া বা অন্যান্য সৎকর্ম করিও না। আমি একজন ভারতীয়। আমি কেবল বাঙালির নই"।

তাঁর মৃত্যুতে যতীন দাসের বৃদ্ধ পিতা বঙ্কিমচন্দ্র দাস বলেছিলেন - "ওঁ নারায়ণ, যে দেশদ্রোহিরা মাতৃভুমিকে বিদেশীর হাতে সমর্পণ করেছিল, তাদের সকলের প্রায়শ্চিত্য স্বরূপ আমার আদরের খেঁদুকে অশ্রু / অর্ঘ সহ তোমার চরণে সমর্পণ করলাম"। অনশন চলাকালীন শান্তিনিকেতনে তপতী নাটকের মহড়া চলছিল, এই ঘটনায় মর্মাহত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাটকের মহড়া বন্ধ রাখেন এবং সেই রাতেই রচনা করেন 'সর্ব খর্ব তারে দহে তব ক্রোধ দাহ' গানটি, যেটি পরে 'তপতী' নাটকে অন্তর্ভুক্ত হয়।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.