৫৭ ধারার ৬৫ শতাংশ অভিযোগ মিথ্যা

আইন কেন হয়রানির হাতিয়ার?

তথ্য ও যোগাযোগ আইন বা আইসিটি অ্যাক্টের বহুল বিতর্কিত ৫৭ ধারার মামলায় গত এপ্রিল মাসে একজন সাংবাদিককে ঢাকার রমনা থানা পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। এমনকি এরপর তাকে রিমান্ডেও নেয়া হয়েছে। অবশেষে ২৩ আগস্ট সাইবার ট্রাইব্যুনাল মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন। আদালত ওই সাংবাদিককে অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছেন। কিন্তু মামলাটি না টিকলেও এই কয়েক মাস তার হয়রানি কম হয়নি। কেবল এই মামলাটি নয়, ৫৭ ধারায় দায়ের করা মামলাগুলোর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মিথ্যা বলে জানা গেছে।
একটি সহযোগী দৈনিক এ প্রসঙ্গে জানিয়েছে, আইসিটি অ্যাক্টের ৬৫ শতাংশ মামলাই অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে আদালতে খারিজ হয়ে গেছে। তবু এই আইনে মামলা করা থেমে নেই। আইজিপি গত ২ আগস্ট থানাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন ৫৭ ধারায় মামলা নেয়ার আগে পুলিশ সদর দফতরের অনুমতি নিতে। এর ঠিক আগের দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগরে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় ৫৭ ধারায়।
সাইবার ক্রাইমের বিচারের জন্য স্থাপিত ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে এর কাজ শুরু হওয়ার পর ৮২৫টি মামলা বিচারের জন্য এসেছে। এগুলোর মধ্যে ৩৭৫টি মামলার রায় দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ মামলায় আসামির শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৬৫ ভাগ মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ফলে মামলাগুলো খারিজ হয়ে গেছে। সাইবার ট্রাইব্যুনালে যত মামলা আসে, এর ৯০ ভাগই ৫৭ ধারার মামলা। আগস্ট মাস পর্যন্ত ৪৫০টি মামলা এখানে বিচারাধীন রয়েছে। পাঁচ বছরেও নিজস্ব এজলাস না থাকায় বিচারকার্যক্রম চালাতে হয় মন্থরগতিতে। এমন অবস্থায় মাঝে মধ্যে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিচারকাজ চালাতে হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের নেই নিজস্ব মালখানাও।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ থেকে গত জুন মাস পর্যন্ত আইসিটি অ্যাক্টের ৯২৭ মামলার চার্জশিট জমা দেয়া হয়েছে। পুলিশ এর ২১ শতাংশ মামলার বেলায় অভিযোগের সত্যতা পায়নি। ২০১২ সালে সারা দেশের থানাগুলোয় এই আইনে দায়েরকৃত মামলা ছিল মাত্র ১৯টি। কিন্তু এই সংখ্যা এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে, চলতি বছর প্রথম ছয় মাসেই এই আইনে মামলা হয়েছে ৩৫২টি। ছয় বছরে আইসিটি অ্যাক্টে দায়ের করা মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪১৭টিতে। সংশ্লিষ্ট দুই হাজার ৮৭৩ জন আসামির মধ্যে এক হাজার ৪৯২ জনকে করা হয়েছে গ্রেফতার।
একজন আইনজ্ঞ আলোচ্য দৈনিক পত্রিকাকে বলেছেন, ‘আইসিটি অ্যাক্ট ভালো কাজে ব্যবহারের উপায় নেই। এর মাধ্যমে মানুষ হয়রানি ছাড়া কিছু পাচ্ছে না। এই আইনে জামিন হয় না। তাই মামলা বাড়ছে। রায় যা হোক না কেন, বাদির উদ্দেশ্য থাকেÑ বিবাদিকে যত বেশি পারা যায় বন্দী রাখা ও হয়রানি করা।’
দেশে আজ বহুলালোচিত ইস্যুগুলোর একটি হলো, আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ নং ধারা। এটিকে উদ্দেশ্যমূলক হয়রানির হাতিয়ার এবং গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী হিসেবে অভিহিত করে বিশেষ করে সাংবাদিকসমাজসহ বুদ্ধিজীবীমহল এই ধারা বাতিলের জোর দাবি জানিয়েছেন। ‘আইনটির অপব্যবহার হবে না এবং এটি কার্যকর করার উদ্দেশ্য গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ নয়’Ñ সরকারের ঊর্ধ্বতনপর্যায় থেকে এমন আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তবে এর বিপরীত চিত্রই পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। বিশেষত ৫৭ নং ধারার কারণে অনেক নির্দোষ মানুষ অসৎ ব্যক্তিদের চক্রান্তে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অপর দিকে, কূটবুদ্ধির মামলাবাজ লোকেরা আইনটির ব্যবহার করে তাদের হীনস্বার্থ হাসিল করতে চায়। ৫৭ ধারার যেসব মামলা শেষাবধি নাকচ হয়ে গেছে, সেগুলোতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা মামলা চলাকালে বিনা অপরাধে দৈহিক-মানসিক যাতনা এবং তাদের পরিজন দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। এই ক্ষতিপূরণ হবে কিভাবে?
যেকোনো আইনের উদ্দেশ্য হতে হবে মানুষের সমস্যার প্রতিকার। তা যখন হয়রানির হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কিছু হতে পারে না। আমাদের প্রত্যাশা, ৫৭ নং ধারার ব্যাপারে গণদাবিতে সাড়া দিয়ে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.