অসহায় রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ কী

আলমগীর কবির

নদীর পানির সাথে প্রতিদিন কত রোহিঙ্গার চোখের অশ্রু মিশে যায় সেটা এখন অনুমান করাও কঠিন। সময় যত গড়াচ্ছে রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্ব তত প্রকাশ পাচ্ছে। সপ্তাহ তিন আগেও যেসব রোহিঙ্গার গোলা ভরা ধান ছিল, তারা এখন আশ্রিত অবস্থায় চেয়ে থাকেন ত্রাণের আশায়। বাংলাদেশের সীমান্তে স্থাপন করা আশ্রয়শিবিরগুলোর পাশ দিয়ে কোনো যানবাহনের শব্দ শোনা গেলে শিশু-তরুণ-বৃদ্ধা দৌড়ে যান, ‘এই বুঝি ত্রাণের গাড়ি এলো’ চিন্তা করে। অনেক সময় ত্রাণ মেলে, না পেলে আশায় থাকেন পরবর্তী গাড়ির আশায়।’ কয়েক সপ্তাহে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে গণমাধ্যমকর্মীরা এসেছেন খবর সংগ্রহ করতে। তাদের সাথে দেয়া রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, মাতৃভূমিতে কতটা নিষ্ঠুর আর অমানবিক আচরণের স্বীকার হয়ে প্রতিবেশী দেশে কোনোরকম জীবন নিয়ে পালিয়ে এসেছেন তারা। অথচ ওই দেশের গণতন্ত্রীপন্থী নেত্রী অং সান সু চি ২০১২ সালে নিউ ইয়র্কে একটি বক্তৃতায় চমৎকার ভাষায় বলেছিলেন: ‘চূড়ান্তভাবে আমাদের ল্য হওয়া উচিত বাস্তুচ্যুত, গৃহহীন ও আশাহীন মানুষমুক্ত একটি পৃথিবী নির্মাণ। তা হবে এমন এক পৃথিবী, যার প্রতিটি প্রান্ত হবে সত্যিকার এক আশ্রয়স্থল। সেখানে প্রতিটি মানুষ থাকবে স্বাধীন এবং তাতে থাকবে শান্তিতে বসবাসের পরিস্থিতি।’
তার বক্তব্য শোনে উপস্থিত সবাই করতালি দিয়েছিলেন। পরে যখন সামরিক জান্তা সরকারের কাছ থেকে সু চির দল ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল তখন রোহিঙ্গাদের নিয়ে খোঁজখবর রাখেন এমন মানুষগুলো আশা করেছিল এবার বুঝি শান্তির সুবাতাস পাবেন নির্যাতিত এই জনগোষ্ঠী। কিন্তু বাস্তবতা হলো উল্টো, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ নির্যাতিত হওয়ার ইতিহাসে সু চির আমলের মতো করুণ অবস্থায় তাদের কোনো দিনও পড়তে হয়নি।
প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববাসীর নীরব ভূমিকা দেখা গেলেও এখন তাদের কিছুটা হলেও উদ্যোগী ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেশী দুই বড় দেশ চীন ও ভারত বিষয়টাকে দেখছে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ হিসেবে। ঐতিহাসিকভাবেই মিয়ানমারের সাথে চীনের সম্পর্ক বেশ নিবিড়। তাদের ঘনিষ্ঠতার ইতিহাসও অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়ের। আর ভারত সীমান্তের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিধন করতে প্রতিবেশী মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে নজর দিয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। প্রতিবেশী দুই বড় দেশের সাথে ইসরাইলেরও মিয়ানমার সরকারের সাথে সহযোগিতামূলক যোগাযোগ রাখছে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে তুরস্ক অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। তাদের সক্রিয়তা আন্তর্জাতিক সমাজের ওপর যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, সেটা অনস্বীকার্য। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষত জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ যে খুব কার্যকর ভূমিকা পালনে সম হবে, এমন আশা করার কারণ নেই। অতীতে চীন ও রাশিয়া একত্রেই মিয়ানমারের পে তাদের ভেটো প্রয়োগ করেছে। পারস্য উপসাগরের দেশগুলো বা সৌদি আরবের প থেকে কোনো ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ আশা করার কারণ নেই, যদিও রোহিঙ্গাদের মুসলিম পরিচিতির কারণে অনেকেই এগিয়ে আসার দাবি করছে।
তবে গত কয়েক দশকে বারবার বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযান এবং মিয়ানমারের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের প্রতি সেনাবাহিনী ও রাজনীতিবিদদের প্রত্য ও পরো সমর্থনের কারণে সৃষ্ট সঙ্ঘাতের পরিণতিতে রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ১০ শতাংশের বেশি দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে। তারা এখন ‘তৃতীয় দেশে’ অবস্থান করছে। বর্তমান পরিস্থিতির আগে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা পাঁচ লাখ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, এখন নতুন করে এসেছে প্রায় তিন লাখ। সে হিসেবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা আট লাখ। ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত কমপে এক লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যাদের একটা বড় অংশ বিভিন্ন শিবিরে জীবন যাপন করছে। এই চিত্র দেখিয়ে দেয় যে, সাম্প্রতিক এই যে পরিস্থিতি, তার আশু কারণ যা-ই হোক, গত কয়েক দশকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে সরিয়ে দেয়ার েেত্র সেনাবাহিনী ও সরকারের পরিকল্পনাই কার্যত বাস্তবায়ন হচ্ছে। এখন আন্তর্জাতিক চাপে পরে মিয়ানমার সরকার যদি রোহিঙ্গাদের সাথে কিছুটা নমনীয় আচরণ করেও তাতে দীর্ঘমেয়াদি বিষয়টি সুরাহা হবে বলে আশা করা যায় না। তাই সব হারিয়ে নিঃস্ব রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ কী তা অনিশ্চিত। বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয়দাতা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপরও নানাভাবে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বিষয়টি অনুধাবন করে জাতিসঙ্ঘের আগামী সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে চারটি বিষয় উপস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রথমত, মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে যারা এই ক’দিন এবং আগে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা সুরক্ষা অঞ্চল গড়ে তুলতে হবে যাতে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। চতুর্থত, মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে, যা এত দিন ধরে তারা ছিনিয়ে নিয়েছে। এই চারটি মূল বিষয়কে উপস্থাপন করে রোহিঙ্গাদের একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হবে।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.