রহমতের ইচ্ছাপূরণ

মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন

হাবাগোবা রহমত। সবাই তাকে রাজা নামেই ডাকে। সবার মুখে রাজা ডাক শুনতে শুনতে রহমতের আসলেই রাজা হওয়ার ইচ্ছা জাগে। রহমান একদা পাশের বাড়ির রানীর প্রেমে পড়ে গেল। এক আবেগঘন প্রেম। জীবনের প্রথম প্রেম বলে কথা। একদিন সাহস করে রানীর কাছে তার মনের কথা বলেই ফেলল। কিন্তু রানী নাক ছিটকাল। বলল, ‘আমি শুধু নামেই নয়, রূপসৌন্দর্যেও রানীর মতো। আমি প্রেম করব রাজার সাথে। শুধু নামে নয়, কাজের রাজার সাথে। তুমি যদি সত্যিই রাজা হতে পারো, তাহলেই কেবল আমার সামনে এসো। এখন সামনে থেকে দূর হও।’ রানীর কথাগুলো রহমতের হৃদয়ে বিদ্ধ হলো বিষবাণের মতো। সেদিন অর্ধরাত্র সে ঘুমাতে পারেনি। মধ্য রাত্রে দুই চোখ বন্ধ করতেই সে স্বপ্নের রাজ্যে চলে গেল।
স্বপ্নে দেখল, রানীর প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে মনের দুঃখে সে বনের পথে হেঁটে চলেছে। ঘুরতে ঘুরতে একদিন এক জ্যোতিষীর দেখা পেল। বলল, ‘জ্যোতিষী বাবা, আমি রাজা হতে চাই। জ্যোতিষী রেগে গেল।’ বলল, ‘বনের রাজা সিংহ। সিংহকে পরাজিত করতে পারলেই তুই বনের রাজা হতে পারবি বৎস।’
-বনের নয়, আমি রাজ্যের রাজা হতে চাই। পথ দেখান।
জ্যোতিষী আরো রেগে গেল। মনে মনে বলল, ‘হাবাগোবা ছেলে হতে চায় রাজ্যের রাজা। দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা। সে বলল, ‘পথ দেখাতে পারি, তবে পাঁচশত টাকা লাগবে। পাঁচশত টাকা নিয়ে মুচকি হেসে বাম হাতের ইশারা করল জ্যোতিষী।
Ñযা, ওই যে দেখা যাচ্ছে তাজ পাহাড়। সেই পাহাড়ে গিয়ে বাস কর। রাজা হবি তবে।
জ্যোতিষীর কথামতো পাহাড়ে চলে গেল রহমত।
এ দিকে ওই রাজ্যের রাজ পরিবার অবকাশ যাপনে তাজ পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এলো। পরিবারের সবাই ফিরে চলে গেল। কিন্তু দলচ্যুত হলো রাজকুমারী। রাজকুমারী ফিরে যেতে পারেনি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে তার বুকের ধুকধুকানি বেড়ে চলছে। এদিক-সেদিক পায়চারী করছে। চাঁদনী রাতে রূপসী রাজকুমারীকে দেখে রহমত ভয়ে ভয়ে ফিস ফিস করে বলল, ‘আসমান থেকে নেমে আসা কোনো পরী নয়তো!’ সে রাজকুমারীর আরো কাছে এলো।
-তুমি কি পরী?
-না, আমি পরী নই। আমি রাজকুমারী। কিন্তু তুমি কে?
-আমি সাধারণ এক যুবক। রাজা হতে চাই। জ্যোতিষী বলেছে আমি এই পাহাড়ে বাস করলে রাজা হতে পারব। এই পাহাড়ে অনেক হিংস্র জানোয়ার আছে। রাতে এখানে প্রাণনাশের সম্ভাবনা আছে। আমি গুহায় থাকি। চল সেখানে। আজ না হয়...।
হিংস্র জানোয়ারের কথা শুনে রাজকুমারী আরো ভয় পেয়ে গেল। তার চোখ দুটো টলমল করতে লাগল।
-কিন্তু আপনি যদি...
-একজন রাজকুমারীকে আমি কিই বা করতে পারি বলুন। রহমত মুচকি হেসে বলল।
কিছু দিন পর রাজার কানে খবর এলো, রাজকুমারী অন্তঃসত্ত্বা। রাজা মহাচিন্তায় পড়ে গেলেন ‘এই খবর যদি রাজ্যের জনগণ জানে তাহলে আমার ইজ্জত পাংচার’। সুতরাং রাজা রানীর কাছে রাজকুমারীর সব ঘটনা শুনে লোক প্রেরণ করলেন। বললেন, ‘তাজ পর্বতের যে যুবক গুহায় থাকে তাকে সসম্মানে রাজ দরবারে নিয়ে এসো। রহমত রাজার প্রেরিত লোক দেখে অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় দৌড়াতে লাগল। কিন্তু দৌড়ালে কী হবে। রাজার লোকজন তাকে ধরে চ্যাংদোলা অবস্থায় রাজসভায় হাজির করল। রহমত ভাবল, রাজা হওয়া তো দূরের কথা, রাজ কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে এবার জীবন পার করতে হবে।
কিন্তু রাজা রহমতকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘তুমি রাজ পরিবারের নতুন প্রজন্মের জন্মদাতা। সুতরাং তুমিই হবে আমার মেয়ের গর্বিত জামাতা।’ ধুমধামের সাথে বিয়ে হয়ে গেল। রহমত ভীষণ খুশি। খুশিতে সে একটি রুমের দরজা-জানালা বন্ধ করে নাচতে লাগল, তখন তার পরনে ছিল জন্মদিনের পোশাক। কিছু দিন পর রাজা বললেন, ‘রহমত, আমার বয়স হয়েছে। তাই এ রাজ্যের দায়িত্ব আমি তোমাকে দিতে চাই।’ রহমত রাজ সিংহাসনে বসেই জ্যোতিষীকে রাজ সভায় তলব করল। রাজার নির্দেশে বনের জ্যোতিষীকে ধরে আনা হলো। তাকে খাবার পরিবেশন করা হলো। রহমত বলল, ‘জ্যোতিষী বাবা, আপনার গণনা সত্যি হয়েছে। আজ আমি রাজা।’ জ্যোতিষী ভয়ে ভয়ে একবার খাবারের দিকে, একবার রহমতের দিকে তাকাচ্ছে। আর মনে মনে বলছে, ‘কত মানুষের ভবিষ্যদ্বাণী করলাম, শালার একটাও সত্যি হলো না। অথচ রাগের মাথায় একটা ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে দিলাম, সেটাই আজ ফলে গেল!’
রহমত রাজা হয়েছে এই সংবাদ শুনে রহমতের এলাকার সেই রানী দৌড়ে এলো। বলল, ‘রহমত তুমি রাজা হলে কিন্তু আমার কাছে তো গেলে না।’ রহমত ‘খামোশ’ বলে দাঁড়িয়ে গেল। রাজ পোশাকের জ্যোতি গ্রাম্য-রানীর চোখ ঝলসে দিলো যেন। বলল, ‘কোনো পুচকা রানীর রাজা আমি নয়। আমি সারা রাজ্যের রাজা। আমি মহারানীর মহারাজা, রহমত রাজা।’ সে রাজকুমারীর রুমে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিলো। ঘরে ঢুকেই সে বলল, ‘রাজকুমারী, আমি এসে গেছি; তোমার সনে দ্বিতীয়বারের মতো সাক্ষাতের জন্য।’ এমন আবেগঘন মুহূর্তে তার ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ কচলাতে কচলাতে ফিসফিস করে বলল, ‘ইস! কিছু কিছু স্বপ্ন যদি সত্যি হতো।’

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.