ভিজে কাপড় গায়েই শুকাচ্ছে রোহিঙ্গা নারীর
ভিজে কাপড় গায়েই শুকাচ্ছে রোহিঙ্গা নারীর

ভিজে কাপড় গায়েই শুকাচ্ছে রোহিঙ্গা নারীর

কক্সবাজার হয়ে টেকনাফের দিকে যাওয়ার রাস্তায় কুতুপালংয়ে প্রবেশ করতেই উৎকট গন্ধ। রাস্তার পাশে মলমূত্র ত্যাগ করে রেখেছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। রাস্তার পাশের জঙ্গল থেকে তারা অনেকটা প্রধান সড়কেও এসে পড়েছেন। কী করবেন তারা? পর্যাপ্ত টয়লেট এবং পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয়ে তারা যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করছেন। রোহিঙ্গারাই বলছেন, যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করায় তারা এখন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে আছেন। কিন্তু কোনো উপায় নেই। এই কতুপালং থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে এখন কেবল রোহিঙ্গা শরণার্থী। আশপাশের পাহাড় আর রাস্তার পাশের ঝুপড়ি ঘরে যত না আছেন, তার চেয়ে বেশি আছেন রাস্তার ওপর খোলা আকাশের নিচে। কাউকে ওই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখলেই শত শত শিশু আর নর-নারী ছুটে এসে ঘিরে ধরেন ত্রাণের আশায়। যে পরিমাণ ত্রাণ পাচ্ছেন তা মোটেই পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে তাও সমবণ্টনের অভাবে কেউ পাচ্ছেন আর কেউ মোটেই পাচ্ছেন না। বিশেষ করে যারা দুর্বল, অসুস্থ এবং বয়স্ক ও শিশু তাদের জন্য কেউ ত্রাণ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে না। শক্ত সামর্থ্যবানরাই কেবল দৌড়ঝাঁপ করে ত্রাণ সংগ্রহ করতে পারছেন। এ দিকে দীর্ঘ এই পথে গতকালও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য চোখে পড়েনি। ফলে যারা ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছেন তারা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই তা কোনোমতে বিতরণ করে অনেকটা পালিয়ে যেতে পারলেই যেন বাঁচেন।


দুর্গন্ধ পুরো এলাকায় : গতকাল সকালে কুতুুপালং এলাকায় ঢোকার পরেই শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে দুর্গন্ধে। এখানে-সেখানে পড়ে আছে মলমূত্র। মাত্র দুই দিন আগেও এই এলাকার এ রূপ খারাপ পরিস্থিতি ছিল না। আশপাশের পাহাড়, উঁচু টিলা, খোলা জায়গা এবং রাস্তার দুই পাশে কেবল ঝুপড়ি ঘর। ওপরে পলিথিন দিয়ে তৈরী করা দুই তিনজন মোটামুটি বসে থাকতে পারে এমন সব ঘরে আট-দশজন বসে আছেন গাদাগাদি করে। ছোট ছোট শিশুরা ওর মধ্যেই বসে আছে নির্বাক। অনেক অসুস্থ শিশুর দেখা মিলল এই এলাকায়। মো: হোসেন, আবদুল করিম, সাহেবসহ আরো কয়েকজন রোহিঙ্গার সাথে কথা হয় রাস্তার পাশে। তারা বলেন, গন্ধে তাদেরও কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কোনো উপায় নেই। এখনো পায়খানা আর পয়ঃনিষ্কাশনের তেমন কোনো বন্দোবস্ত হয়নি। ফলে তাদের বাধ্য হয়ে এখানে-সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করতে হচ্ছে। ওই রোহিঙ্গারা বলেন, এভাবে আর দুই চার দিন গেলে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বেন বলে তাদের আশঙ্কা। 


৫০ কিলোমিটারজুড়ে কেবল রোহিঙ্গা আর রোহিঙ্গা : কুতুপালং থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটারের রাস্তা। এই রাস্তার দুই পাশে এখন শুধুই চোখে পড়ে হাজার হাজার মানুষ। যেন মানুষের মিছিল। এই মানুষগুলোই হলো রোহিঙ্গা শরণার্থী। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী-পুলিশ আর উগ্রবাদী বৌদ্ধদের নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে জীবন বাঁচাতে ছুটে এসেছেন বাংলাদেশে। সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ঢুকে তাদের আশ্রয় হয়েছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এবং কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায়। সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা জড়ো হয়েছেন উখিয়ার কুতুপালং থেকে টেকনাফের রাস্তায়। গতকাল ওই রাস্তায় গিয়ে দেখা যায় রাস্তার দুই পাশের বিভিন্ন পাহাড়, টিলা, উঁচু স্থান এবং রাস্তার দুই ধারে পলিথিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ছোট ছোট ঘর। এসব ঘরেই অবস্থান নিয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। তবে যে পরিমাণ রোহিঙ্গা ওই সব ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি রয়েছেন রাস্তার দুই ধারে খোলা আকাশের নিচে। রোদবৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা বসে আছেন। কেউ কেউ রোদবৃষ্টি থেকে বাঁচতে হয়তো একটি ছাতা ব্যবহার করছেন। আবার অনেককে দেখা গেছে ত্রাণের পাওয়া পলিথিন পেঁচিয়ে পরিবারের সবাই গুটিসুটি হয়ে বসে আছেন। কিন্তু বেশির ভাগেরই রোদবৃষ্টি যাচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে। এমনকি কোলের শিশুকে নিয়ে ওই অবস্থায়ই বসে থাকতে দেখা গেছে অনেক নর-নারীকে। দিনে শুকনো কিছু পেলে ওই রাস্তার ধারে বসেই যে যার মতো খেয়ে নিচ্ছেন। রাতে ওই রাস্তার ধারেই খোলা আকাশের নিচে শুয়ে পড়ছেন।


নেই চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা : গতকাল সকালে কুতুপালং পার হয়ে কিছু দূর এগিয়ে দেখা মেলে বিবিজান নামে এক রোহিঙ্গা নারীর সাথে। তার কোলে বছরখানেকের কন্যাসন্তান। শিশুটি ভীষণ অসুস্থ। অনেকটা বেহুঁশের মতো। বিবিজান জানালেন, পাঁচটি সন্তানের মধ্যে মাত্র দু’টি নিয়ে তিনি ঘর থেকে বের হতে পেরেছেন। বাকিগুলো কোথায় কী অবস্থায় আছে জানেন না তিনি। স্বামীরও কোনো খোঁজ নেই। তারা আদৌ বেঁচে আছে কি না সে খবর নেই বিবিজানের কাছে। মানুষের স্র্রোতের সাথে তিনি ওই দুই সন্তান আর নিজের জীবন নিয়ে চলে এসেছেন বাংলাদেশে। বিবিজান বলেন, বাংলাদেশে পৌঁছতে তাদের ১০ দিনের মতো লেগেছে। এই সময়ে তার দু’টি সন্তানই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কিন্তু কোথায় গিয়ে সন্তানের চিকিৎসা করাবেন তা জানেন না। সন্তানের জন্য কোত্থেকে ওষুধ আসবে তারও নিশ্চয়তা নেই। কোলের সন্তানকে বাঁচাতে তিনি হাত বাড়াচ্ছেন মানুষের কাছে। ওই সময় দেখা যায় শিশুটির চিকিৎসার জন্য একজনে ২০০ টাকা দিলেন। কিন্তু কোথায় গিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে তা জানেন না বিবিজান। শেষ পর্যন্ত তাকে বলে দেয়া হলো একটি হাসপাতালের ঠিকানা। এদিকে যারা ত্রাণ দিচ্ছেন তাদের অনেকেই ওষুধ নিয়ে আসছেন। কিন্তু কিভাবে ওষুধ দেবেন তা শনাক্ত করতে পারছে না। ফলে ওই ওষুধ আর কাউকেই দেয়া হচ্ছে না।


কাউকে দেখলেই হাত বাড়িয়ে দেন শরণার্থীরা : কুতুখালী থেকে যাওয়ার পথে দেখা গেল শরণার্থীরা যাকে দেখছেন তার সামনেই হাত পাতছেন। তার কাছেই সাহায্য চাচ্ছেন। তারা রাস্তার দুই ধারে বসে আছেন আর দেখছেন কে যাচ্ছে। কোনো গাড়ি রাস্তার পাশে থামলে হাজার হাজার শরণার্থী ছুটে গিয়ে গাড়ি ঘিরে ধরছেন। তারা খাবার চাচ্ছেন, নগদ অর্থ চাচ্ছেন। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকার নয় এমন অনেকেই রোহিঙ্গাদের কোনো কথাই বুঝতে পারে না। আর রোহিঙ্গারাও শুদ্ধ বাংলার কোনো কথাই বোঝে না। মুরব্বি গোছের হাতে গোনা কিছু রোহিঙ্গা বাংলা বুঝলেও শিশু-কিশোররা একেবারেই বাংলার সাথে পরিচিত নয়। ফলে কারো কথা না বোঝার কারণে তাদের নিয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হয় মানুষকে। কারো কাছে তারা একবার হাত পাতলে সাহায্য না পাওয়া পর্যন্ত তারা কিছুই বুঝতে চায় না। ফলে অনেক মানুষ বিপাকে পড়ছেন।


ত্রাণ দেয়ার কোনো সমন্বয় নেই : দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছেন রোহিঙ্গাদের জন্য। কিন্তু এই ত্রাণ দেয়ার ক্ষেত্রে তারা পড়ছেন বিপাকে। ফেনীর ছাগলনাইয়ার মানবকল্যাণ সংস্থার পক্ষ থেকে গতকাল ত্রাণ নিয়ে যান কুতুপালং এলাকায়। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে সেখানে ত্রাণ দিতে পারেননি তারা। শেষ পর্যন্ত তারা যান বালুখালী এলাকায়। সেখানের অবস্থাও ভয়াবহ। গাড়ি দেখে উপস্থিত হয় কয়েক হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু। তাদের তারা লাইনেও দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে তারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন ট্রাকের ওপরে। পরে বাধ্য হয়ে তারা সেখান থেকেও চলে যান। পরে তাদের দেখা যায় গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে ছুড়ে মারছে ত্রাণ। যে যা পাচ্ছেন তাই নিচ্ছেন। তাতে অনেক সামগ্রী রাস্তায় পদপিষ্ট হয়ে নষ্ট হচ্ছে। মানবকল্যাণ সংস্থার সদস্য আবু তাহের বলেন, কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাদের নিরাপত্তা দেয়ার মতো কেউ নেই। কারো কথা কেউ শোনে না। তিনি বলেন, লাইন করা হয়েছিল। কিন্তু একটুু পরেই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে গাড়ির ওপর। ওই সংগঠনের সভাপতি মকসুদ মাহমুদ মুন্না বলেন, ত্রাণের তুলনায় লোকসংখ্যা অনেক বেশি। যে কারণে তাদের বিপাকে পড়তে হয়। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কিংবা প্রশাসনের কেউ নেই। যারা দুই-চারজন আছে সাহায্য করার কথা বলে তাদের দালাল মনে হচ্ছে। 


গতকাল বেশ কয়েকটি স্পটে দেখা যায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এবং গাড়ি থেকে ছুড়ে দিয়ে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। সকাল ৯টার দিকে বালুখালী কাস্টমস এলাকায় দেখা যায় একটি ট্রাক থেকে ত্রাণসামগ্রী আকাশের দিকে ছোড়া হচ্ছে। যে ধরতে পারছে ত্রাণের ওই প্যাকেট তার। এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি এবং মারামারি করতে দেখা গেছে শরণার্থীদের মধ্যে। এতে যার গায়ে জোর আছে, যে শক্ত সামর্থ্যবান সে-ই কেবল ত্রাণ নিতে পারছেন। আর অসুস্থ, দুর্বল মানুষগুলো একেবারেই কিছু পাচ্ছেন না এবং তাদের না খেয়ে মরার উপক্রম হয়েছে। গতকাল সকালে কুতুপালং এলাকায় দেখা হয় রঞ্জিতা নামে ছয় বছরের একটি শিশুর সাথে। রঞ্জিতার বাবা শাসমুল ইসলাম ও মা শানজিদা। বাবা-মা কোথায় তা জানে না রঞ্জিতা। মংডুর মেরুল্লাবাহার ছড়ায় তাদের বাড়ি। প্রতিবেশীদের সাথে সে বাংলাদেশে এসেছে। এই শিশুটিকে খাবার জোগাড় করে দেয়ার কেউ নেই। প্রতিবেশীদের সাথে থাকলেও যে যার চিন্তা করছে। রঞ্জিতার চিন্তা কেউ করছে না। শেষ পর্যন্ত এই শিশুটিও রাস্তায় এসে হাত পেতেছে খাবারের জন্য।


কষ্ট হচ্ছে বৃদ্ধ আর শিশুদের : গতকাল বেশ কয়েকটি ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে শরণার্থীদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি। বেশির ভাগ পরিবারেই দুই-চারটি সন্তান রয়েছে। এমনকি সাত-আটটি সন্তান রয়েছে এমন পরিবারও রয়েছে অসংখ্য। এই শিশু এবং যেসব পরিবারে বৃদ্ধ রয়েছে তাদের নিয়েই এখন বিপাকে পরিবার। এরা রাস্তার ধুলা, কাদা, আর বৃষ্টি কোনো কিছুই সহ্য করতে না পারায় আস্তে আস্তে অনেক শিশু ও বৃদ্ধ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
আবার যারা স্বজন হারিয়েছেন, বিশেষ করে সন্তান হারিয়েছেন তাদেরও অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। মংডুর নুর হাবা (২৪) ৯ দিন হেঁটে নাফ নদী হয়ে এপাড়ে আসছিলেন। নদীতে নৌকাডুবিতে মারা যায় তার এক বছরের শিশু। নুর হাবা এখন বেশ অসুস্থ। বিশেষ করে বুকের দুধ জমে তার অবস্থা খুবই খারাপ। কোনোই চিকিৎসা মিলছে না তার।


কোনো কিছুই এখন তাদের কাছে ফেলনা নয় : শরণার্থীদের কাছে এখন কোনো কিছুই ফেলনা নয়। এমনকি পানির ছোট্ট একটি বোতলও। এই বোতলটির জন্যও তারা এখন দিশেহারা। গতকাল অনেক শরণার্থী শিশুকে দেখা যায় পানির বোতল কুড়িয়ে নিচ্ছে। জিজ্ঞেস করতে একাধিক শিশু জানায়, এই বোতলে ভরে তারা পানি নিয়ে যাবে। যেকোনো সময় তাদের পানি লাগতে পারে।


বৃষ্টি হলেই একাকার : বৃষ্টি হলেই ভিজে একাকার হয়ে যায় রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। গতকাল দুপুরের দিকে এই দৃশ্য চোখে পড়ে। রোহিঙ্গারা বলেন, সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন নারীরা। নারীদের পোশাক বদল করার মতো অনেক স্থানেই কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ওই ভেজা কাপড় তাদের গায়েই শুকাতে হয়। 


এখনো স্রোতের মতো আসছেন রোহিঙ্গা : গতকালও সীমান্ত পার হয়ে শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। সকালে উখিয়ার পালংখালী আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, শরণার্থীদের দীর্ঘ লাইন। তারা নাফ নদী পার হয়ে বাহারপ্যারা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন। ওপাড়ে মিয়ানমারের কোয়াইচিবং। স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, দুপুর পর্যন্ত চার হাজারের মতো রোহিঙ্গা ওই পথ দিয়ে প্রবেশ করে বাবুল মিয়ার মাছের ঘেরে আশ্রয় নেয়। আরো প্রায় ছয়-সাত হাজার রোহিঙ্গা ওপাড়ের জঙ্গলে রয়েছেন। তারা সুযোগ বুঝে এপাড়ে চলে আসবেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ৫০ জনের মতো যুবক ওই শরণার্থীদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে সহায়তা করছে। প্রায় ২০টি নৌকায় রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসা হচ্ছে। বিনিময়ে প্রত্যেক রোহিঙ্গার কাছ থেকে দুই থেকে তিন শ’ টাকা নেয়া হচ্ছে। 


অসুস্থ হয়ে পড়ছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা : সীমান্ত অঞ্চলের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিশেষ প্রতিনিধি : নিজ দেশ ছেড়েছেন জীবন হারানোর ভয়ে। বর্মি বাহিনী আর মগরা একের পর এক কেড়ে নিচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের জীবন। সেই জীবন বাঁচাতে তারা এখন বাংলাদেশের কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে। অস্থায়ী ক্যাম্প করে তাদের ঠাঁই দেয়া হচ্ছে সেখানে। আশ্রয় নিতে আসা এসব মানুষ জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু না পেলেও বর্মি বাহিনীর হাতে তাদের এখন জীবন হারানোর ভয় নেই। তবে তারা যে খুব স্বাস্থ্যকর পরিবেশে আছেন তা নয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থেকে গত কয়েক দিনে তাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি কষ্টের মধ্যে আছেন।


শাহপরী দ্বীপ হয়ে অনেকে ঢুকছেন টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায়। এই এলাকা দিয়েই সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা ঢুকছে। টেকনাফের রাস্তায়, পাহাড়ে, জঙ্গলে এখন শুধু রোহিঙ্গা আর রোহিঙ্গা। অনেকে আছেন যারা ১২-১৩ দিন হেঁটে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। এ সময়ে তারা খুব অল্প সময় ঘুমিয়েছেন। বন-জঙ্গল আর পাহাড়েই তারা প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রবেশের পর যারা নির্দিষ্ট ক্যাম্পে পৌঁছতে পেরেছেন তাদের কষ্ট কিছুটা কমেছে। কিন্তু এখনো যারা রাস্তাঘাট বা ঝোপ-জঙ্গলে আছেন তাদের কষ্টের সীমা নেই। নিরাপদ পানি পাচ্ছেন না ঠিকমতো। পানির জন্য অনেকেই এখন চরম কষ্টের মধ্যে আছেন। রাস্তা আর বনে-জঙ্গলে অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ পরিবেশে থেকে তাদের অনেকেই এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গতকাল নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা বরশন অস্থায়ী ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায় অনেক রোহিঙ্গা এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এই ক্যাম্পের রোহিঙ্গা যুবক আবু তাহের বলেন, অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। সকাল থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত এই ক্যাম্পে প্রায় ৪০০ জনকে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। ওই সময় ক্যাম্পে মাইকিং চলছিল অসুস্থ শরণার্থীরা যাতে হেলথ ক্যাম্পে গিয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে। 


ক্যাম্প সূত্র জানায়, এখানে এখনো খাবার পানির ব্যবস্থা হয়নি। পাহাড়ি ছড়ার পানি দিয়ে চলে ধোয়া মোছার কাজ। যে ক’টি টিউবওয়েল বসানো হয়েছে তা পর্যাপ্ত নয় বলে ক্যাম্প সূত্র জানায়। তবে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি উদ্যোগে খাবার ও পানির ব্যবস্থা করায় তেমন কষ্ট না হলেও তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। ক্যাম্পের একাধিক রোহিঙ্গা বলেন, এভাবে ত্রাণ দেয়া অব্যাহত থাকবে না। তখন তাদের কি হবে,তাই নিয়ে এখন তারা শঙ্কিত।


হাটহাজারীতে আশ্রয়ের চেষ্টা ১৯ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী শিবিরে ফেরত
হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, দুর্গম ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আশ্রয়ের জন্য হাটহাজারীতে আসা ১৯ রোহিঙ্গাকে টেকনাফ শরণার্থী শিবিরে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ১৯ জনের সবাই একই পরিবারের সদস্য বলে জানা গেছে। এক আত্মীয়ের হাটহাজারীতে থাকার সুবাদে এ পরিবারটি এখানে আসে বলে জানা গেছে।


জানা গেছে, স্থানীয়রা ফটিকা কামালপাড়া নুর আলম কলোনিটিতে রোহিঙ্গা উপস্থিতির কথা থানায় জানানোর পর পুলিশ কলোনিতে আসে। এ সময় রোহিঙ্গারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। পুলিশ রোহিঙ্গা পরিবারটিকে বুঝিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি থেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। পরে তাদের ক্যাম্পের সুযোগ-সুবিধার কথা জানানো হলে স্বস্তি নিয়েই তারা টেকনাফের উদ্দেশে যেতে রাজি হয়। মানবিক তাগিদে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাদের এক বেলা খাবার ও অসুস্থদের চিকিৎসা, ওষুধপত্র দিয়েই ক্যাম্পে পাঠাবেন বলে থানা সূত্রে জানা যায়।


পরিবারটি রাখাইনের মন্ডু থানাধীন কাদি বিল এলাকার বড্ডা কাদিরপাড়ার বাসিন্দা। তারা হলেনÑ পরিবারের কর্তা মো: মিয়া হোসেন (৬০), লায়লা খাতুন (৪২), আমির হোসেন (২৫), রহিমা খাতুন (২৭), নুরফা বানু (১৮), শাবনুর (৩), নুরকেছ ফাতেমা (১৭), সূর্য রহমান (৪), জিয়াবুর রহমান (১৪), মাহমুদা খাতুন (২২), শবেনম (৫), মো: শহীদ (১০), নুর কায়দা (৫), মাহমুদ হোসেন (৩০), নুর হাবা (১৯), কামাল সাদেক (৭), আবদুর রহমান (২০), ওমর সাদেক (১) ও হেজ্জু রহমান (১৫)। 


মো: মিয়া হোসেনের ছেলে আমির হোসেন জানান, আমার বোনের কাছেই আশ্রয়ের জন্য হাটহাজারীতে আসা। আরকান আর্মিদের হাতে তাদের কেউ হতাহত না হলেও তাদের ঘরবাড়ি সব কিছু জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। হাটহাজারী থেকে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন স্যারেরা (পুলিশ) যেভাবে সুবিধার কথা জানিয়েছেন সেভাবে ক্যাম্পে যাওয়াটাই মনে হয় ভালো হবে। আমার বোনের জামাইও দিনমজুর। তিনি কিভাবে আমাদের এত বড় পরিবার চালাবেন।


কলোনির দায়িত্বে থাকা মো: আতাউর রহমান বলেন, রাতে রোহিঙ্গারা আসায় কেউ টের পায়নি; কিন্তু সকালে এলাকাবাসী দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন, তবে কেউ তাদের কোনো তি বা গালমন্দ করেননি।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.