বাড়ছে আত্মহত্যার ঝুঁকি, প্রতিরোধ করবেন যেভাবে

আনিসুর রহমান এরশাদ

একটি আত্মহত্যা শুধু একটি জীবনকেই নষ্ট করে না, এর বিরূপ প্রভাব বয়ে বেড়াতে হয় গোটা পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং পুরো রাষ্ট্রকেই। কারণ রাষ্টের মূল সম্পদ জনসমষ্টি। আর এক একটি জীবন অকালে ঝরে যাওয়া মানে, এক একটি অমূল্য সম্ভাবনা ঝরে যাওয়া। অথচ বাংলাদেশে প্রতিবছর ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষপান করে গড়ে ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছে। আর প্রতিদিন করছে প্রায় ২৮ জন। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যকার ৬০ শতাংশই নারী।

আত্মহত্যা বন্ধ করতে হলে- যৌতুককে না বলুন। পারিবারিক সহিংসতা বন্ধ করুন। শারীরিক নির্যাতন আর নয়। মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। ইভটিজিং প্রতিরোধ করুন। শ্লীলতাহানি করবেন না, সইবেন না। যৌন নির্যাতন কিংবা ধর্ষণ মানবেন না, করবেন না। প্রতারণার পথে চলা নয়, অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন নয়। পরের নিরাপত্তাহীনতার কারণ হবেন না। দাম্পত্য কলহ বাড়তে দিবেন না। পারিবারিক দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলুন। পরকিয়া নয়, বিশ্বস্ত থাকুন। অর্থনৈতিক সংকটে ধৈর‌্য ধারণ করুন। আত্মহত্যার উপকরণের সহজপ্রাপ্যতা দূর করুন। মানসিক অসুস্থতায় চিকিৎসা করান।

এছাড়া জটিল শারীরিক রোগ- যন্ত্রণায় চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রাখুন। নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ান। সামাজিক অস্থিরতা বন্ধে উদ্যোগী হোন। হতাশা নয়, আশা জাগিয়ে তুলুন। বেকারত্ব নয়, কর্মসংস্থান বাড়ান। প্রেম বিরহে ভেঙ্গে পরবেন না, মনোবল হারাবেন না। পরীক্ষায় ব্যর্থতায় আত্মবিশ্বাস হারাবেন না, নতুন করে স্বপ্ন দেখুন। সম্পর্কগুলোর প্রতি যত্নশীল হোন। পরিবারকে ভালোবাসুন, নিজেকেও মূল্যায়ন করুন গণমাধ্যমে আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনে সচেতন থাকুন। সামাজিক অস্থিরতা দূর করুন। আত্মহত্যার প্রবণতা দেখলে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং করান। আত্মহননকারীদের ৯৫ শতাংশই মানসিক রোগে আক্রান্ত, তাই মানসিক ট্রিটমেন্ট ও সচেতনতা বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দিন।

আত্মহত্যার ঝুঁকিতে কারা আছে? ১. যেসব তরুণ-তরুণীরা ইতোমধ্যেই এক বা একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। ২. কোন মানসিক সমস্যা বা রোগ বিশেষ করে ডিপ্রেশন, সিজোফ্রেনিয়া ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত কেউ। ৩. অ্যালকোহল বা অন্যান্য মাদকে আসক্ত ব্যক্তি। ৪. পারিবারিক বা অন্য কোন ভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হলে। ৫. পরিবারের অন্য কেউ বা কাছের কোন বন্ধু-বান্ধবী আত্মহত্যা করে থাকলে। ৬. বড় ধরণের কোন শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হলে। ৭. ভালোবাসার সম্পর্কে টানাপোড়ন ঘটলে। ৮. বিশাল কোন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয়: ১. কখনো (একবারের জন্য হলেও) আত্মহত্যা করার চিন্তা এলে দেরি না করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞর শরণাপন্ন হন। ডাক্তারের সাথে মন খুলে কথা বলুন, পরামর্শ নিন। ২. পরিবারের কেউ কিংবা কোন বন্ধু-বান্ধবী আত্মহত্যার কথা শেয়ার করলে বা হুমকি দিলে কখনোই তা হালকা ভাবে নিবেন না। যত দ্রুত সম্ভব তার মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করুন। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন।দ্রুত তার সাথে কথা বলুন এবং দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন। ৩. পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলো আরো শক্তিশালী করে তুলুন। ধর্মীয় অনুশাসনগুলো মেনে চলতে আগ্রহী হন।

কীভাবে বুঝবেন একজন মানুষ আত্মহত্যার কথা ভাবছে: অধিকাংশ সময় হতাশ বা দুঃখী থাকা। কারণ বা কারণ ছাড়াই সবসময় মন খারাপ থাকা। অকারণে মেজাজ খারাপ থাকা। অকারণে মানুষের সাথে রাগারাগি, বা দুর্ব্যবহার করা। কথাবার্তায় বা লেখায় অপ্রাসঙ্গিকভাবে মৃত্যু বা আত্মহত্যার প্রসঙ্গ টেনে আনা। সবসময় নিজেকে একাকী মনে করা। কিছু ক্ষেত্রে নেশায় আসক্ত হয়ে পড়া। আগে যে কাজ করতে ভাল লাগত, এখন সেগুলোকে বিরক্তিকর মনে হওয়া। অতিরিক্ত ঘুমানো কিংবা একেবারেই অল্প ঘুমানো। অতিরিক্ত খাওয়া দাওয়া শুরু করা কিংবা একেবারেই খাওয়ায় অনীহা। ব্যক্তিত্বে বড় ধরণের পরিবর্তন। বন্ধু এবং পরিবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া। অকারণে নিজেকে ছোট মনে করা.

একজনকে আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরিয়ে আনবেন যেভাবে: যখন আপনি বুঝতে পারবেন কেউ একজন আত্মহত্যা করতে চলেছে, আপনার দায়িত্ব তাকে জীবনের পথে ফিরিয়ে আনা। যদি সন্দেহ হয় কেউ আত্মহত্যা করতে পারে, তাহলে দেরী না করে তার সাথে কথা বলুন। প্রথমে জিজ্ঞেস করুন কেন তার মন খারাপ বা কিছুদিন যাবত তার আচরণের পরিবর্তনের কারণ কি। তাকে কথা বলার সুযোগ দিন। তার বলা কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শুনুন। এমন আচরণ করুন যেন তার কথা শোনাটা আপনার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কথা বলতে বলতে সে হয়তো কাদতে শুরু করতে পারে। তাকে কাদতে দিন। তাকে শুধু সহানুভূতি জানান। এসময় কখনোই তাকে দোষারোপ করবেন না, তার উপর রাগারাগি তো নয়ই। এমনকি তার কাজটা যৌক্তিক কিনা এসব ব্যাপারেও কথা বলবেন না। আপনি যে তার পাশে আছেন এটা বুঝিয়ে বলুন। এরপর যত দ্রুত সম্ভব মনোবিদের কাছে নিয়ে যান, তবে জোর করবেন না। ঠান্ডা মাথায় তাকে বুঝিয়ে বলুন। একজন আত্মহত্যার পথযাত্রীকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব শুধুমাত্র সহানুভূতি আর ভালোবাসার মাধ্যমেই।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.