শিল্প সম্প্রসারণে ১০ বাধা

মো: শাহাদৎ হোসেনের

সরকারের অনেক ভালো উদ্যোগ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না থাকায় এসবে পুরোপুরি আস্থাশীল হতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়লেও সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নতি না হওয়ায় প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। গ্যাসের নতুন সংযোগ তো মিলছেই না, প্রেসারের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে সংযোগ থাকা কারখানাগুলোতেও। ব্যাংকঋণের সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে কাগজে-কলমে। বর্জ্য শোধনাগারসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণে বিদেশ থেকে স্বল্প সুদে টাকা এনে কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ওই টাকার ওপর ব্যবসা করছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম দফায় দফায় কমে অর্ধেকে নেমে এলেও বাংলাদেশে কমানো হয়েছে লিটারপ্রতি মাত্র তিন টাকা। গভীর সমুদ্রবন্দরের অভাবে প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা হারাচ্ছেন রফতানিকারকেরা। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার উদ্যোগ নেয়া হলেও উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাবে সেগুলোয় স্থান হচ্ছে না প্রকৃত বিশেষায়িত শিল্পখাতের উদ্যোক্তাদের। রাজনৈতিক পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হলে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার অভাবে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। এমন অন্তত এক ডজন মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার কারণে দেশের শিল্প সম্প্রসারণ স্তিমিত হয়ে আছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কাগজে-কলমে একটি শিল্পনীতি থাকলেও সরকারের দীর্ঘমেয়াদি এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে শিল্প সম্প্রসারণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপনের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষার জন্য সরকার উন্নত বিশ্ব থেকে নামমাত্র এক শতাংশেরও কমসুদ হারে ঋণ পাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এবং কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক ঘুরে সে অর্থ ব্যবসায়ীদের কাছে যাচ্ছে সাত থেকে আট শতাংশ সুদে। ফলে ইটিপি স্থাপনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। আবার ইটিপি স্থাপন না করার অজুহাতে শিল্প সম্প্রসারণে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পক্ষ। সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের হয়রানির শিকার দিশেহারা অনেক উদ্যোক্তাই শিল্প সম্প্রসারণে যাচ্ছেন না। নারী এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যেক্তাদের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন খুব কমই দেখা যাচ্ছে। পদে পদে হয়রানি আর হাত ঘুরতেই সার্ভিস চার্জের প্রবৃদ্ধি হতাশ করে তুলছে নতুন উদ্যোক্তাদের।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) দেশের বৃহৎ শিল্প সম্প্রসারণে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশেও এসএমইর বিকাশে বিভিন্ন সময়ে নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু জমির স্বল্পতা ও অতিমূল্য, ট্রেড লাইসেন্সসহ ব্যবসায় শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরিতে জটিলতা ও অধিক অর্থ ব্যয় এবং বিভিন্ন সংস্থার হয়রানি আমাদের দেশে উদ্যোক্তা তৈরির পথে প্রধান প্রতিবন্ধক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ওয়ান-স্টপ সার্ভিস-সেন্টারের অনুপস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর অনীহার বিষয়টিও উদ্যোক্তাদের উদ্বেগের বিষয়। নিয়মানুযায়ী কোনো ঋণগ্রহীতা টানা তিন বছর ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করলে ১০ শতাংশ সুদ প্রত্যর্পণ পাওয়ার কথা থাকলেও কোনো ব্যাংকই তা মানছে না।
রফতানি বাণিজ্যের সাথে যুক্ত ব্যবসায়ীদের সেক্টরভিত্তিক ৪২টি সংগঠনের সমন্বয়ে গড়া ফেডারেশন এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদীর বাংলাদেশে শিল্পায়নের প্রতিবন্ধকতা প্রসঙ্গে বলেন, শিল্পায়নের জন্য জ্বালানির কোনো বিকল্প নেই। বিকল্প জ্বালানি দিয়ে কোনো শিল্পই দীর্ঘ দিন টিকে থাকতে পারে না। অথচ আমাদের বছরের পর বছর শিল্পকারখানা চালাতে হচ্ছে বিকল্প জ্বালানি দিয়ে। এতে আমরা প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছি। অথচ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ এখন রফতানিকারক ব্র্যান্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু এর সুফল আমরা ঘরে তুলতে পারছি না প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। কিন্তু সঞ্চালন লাইনের দুর্বলতার কারণে এমন সাফল্য আমাদের কাজে আসছে না। এখনো প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং হজম করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। গ্যাসের প্রেসার যেখানে ৯ পিএসআইর কম হলে কারখানা চলে না সেখানে দিনের একটা বড় অংশ আমরা প্রেসার পাই মাত্র ৩ থেকে ৪ পিএসআই। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভিশন ২০২১, মধ্য আয়ের দেশ, প্রতি বছর বাজারে আসা ২০ লাখ নতুন কর্মীর কর্মসংস্থান সবই অধরা থেকে যাবে। আর গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নতুন করে বাড়ানোর যে পরিকল্পনা সরকার করতে যাচ্ছে তা যদি বাস্তবায়ন হয় তবে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো।
সালাম মুর্শেদী বলেন, গত দুই বছরে শ্রমিক মজুরি বেড়েছে ৩২ শতাংশ। বিদ্যুৎ খরচ বেড়েছে ১৫ শতাংশ। গ্যাসের খরচ বেড়েছে ১০ শতাংশ। এ সময়ের মধ্যে ৩০ শতাংশ বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। সব মিলিয়ে আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো তাদের উদ্যোক্তাদের নানামুখী প্রণোদনা দিচ্ছে। ডলার-ইউরোর সাথে তাদের মুদ্রার মান সমন্বয় করেছে। ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দায় অনেক দেশ ব্যবসায়ীদের পলিসি সাপোর্ট দিয়েছে। অনেক দেশ সহজ করেছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.