প্রতিকূলতাকে জয় করা বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তা উর্মি

শামছুল ইসলাম

২০০৮ সালের কথা। মার্কেটে গিয়েছিলাম ব্যাগ কিনতে। এক দোকানের সাথে অন্য দোকানের দামের মিল নেই। মিল নেই এক মার্কেটের সাথে অন্য মার্কেটের। বিস্তর ব্যবধান পাইকারি আর খুচরা দামে। মাথায় এলো, নিজেই একটা ফ্যাক্টরি দিয়ে ফেলি না কেন? কিন্তু হাতে কোনো টাকা নেই। স্বামীকে কিছু না বলেই চলে গেলাম নিউ মার্কেট। বিয়ের কিছু গয়না বিক্রি করে পাই ৭০ হাজার টাকা। নিজেই দৌড়ঝাঁপ করে ব্যবসায়িক কাগজপত্র তৈরি করলাম। একটা রুম ভাড়া নিলাম। নিলাম একটি মেশিনও। দুইজন কারিগরও রাখা হলো। পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এপেক্স থেকে অল্প অল্প ফিনিশড লেদার কিনে ব্যাগ বানাতে শুরু করলাম। শুরু হয়ে যায় বিভিন্ন শোরুমের ডিজাইন ও অর্ডার অনুযায়ী মালামাল সরবরাহ করা। এভাবেই যাত্রা শুরু হলো স্মার্ট লেদার প্রোডাক্টসের।
কথাগুলো বলছিলেন এসএমই ফাউন্ডেশন আয়োজিত বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তা (নারী) ক্যাটাগরিতে জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার ২০১৬-এর বিজয়ী মাসুদা ইয়াসমিন উর্মি।
সম্প্রতি নয়া দিগন্তকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। জানান তার এই চলার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। এই পর্যায়ে আসতে নানা প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে তাকে। একজন নারী হয়ে সংসার সামলানোর পাশাপাশি ব্যবসায় সমৃদ্ধি আনতে প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছেন তিনি।
সফল এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, এইচএসসি পড়াকালে ১৯৯৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে আমাকে বিয়ে দিয়ে বাবা তার একটা বোঝা কমালো। স্বামীর সংসারে নানা প্রতিকূলতার মাঝেও লেখাপড়া চালিয়ে যাই। দুই মেয়ের মা হলাম। অনার্সসহ মাস্টার্স শেষ করে চাকরি খুঁজছিলাম। স্বপ্ন ছিল স্বাবলম্বী হবো। একদিন বাসায় দূর সম্পর্কের এক চাচা বেড়াতে আসেন। তিনি এপেক্স-এ ‘র-হাইড অ্যান্ড স্কিন’ সরবরাহ করতেন। তার ব্যবসার সফলতার কথা শুনে আমার মনেও কিছু একটা করার আগ্রহ জন্মাল। ২০০৩ সালে স্বামীর মাধ্যমে তিন লাখ টাকা জোগাড় করে ব্যবসা শুরু করলাম। যশোর রাজারহাট থেকে ‘র-হাইড অ্যান্ড স্কিন’ কিনে চাচার সহায়তায় এপেক্স-এ বিক্রি করতে লাগলাম। ধারদেনা বাদ দিয়ে মাসে ৫০-৬০ হাজার টাকা আয় হতো।
দুই বছর সফলভাবে ব্যবসায় করার পর নিজের ব্যবসায় এক আত্মীয়কে সম্পৃক্ত করেন উর্মি। তার অব্যবসায়ীসুলভ আচরণে তিনি বেশ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। আয়সহ পুঁজি হতে থাকে বেহাত। শেষ পর্যন্ত স্বামীর হস্তক্ষেপে ব্যবসাটি বন্ধই হয়ে যায়। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্বামীর ঢাকার বাইরে পোস্টিং থাকায় মাসুদা ইয়াসমিন উর্মিকে চিকিৎসাও নিতে হয়েছিল একা একা। একজন স্বল্প বেতনের সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে সব ধরনের খরচ মিটিয়ে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। একনাগাড়ে দুই বছর চিকিৎসা করার পর তিনি আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে ওঠেন। যশোরের অভয়নগর উপজেলার একতারপুর গ্রামে ১৯৭৬ সালে জন্ম নেয়া মাসুদা ইয়াসমিন উর্মি জীবন সংগ্রামের কষাঘাতে জর্জরিত হলেও তার মনে ছিল স্বাবলম্বী মানুষ হওয়ার অদম্য স্পৃহা। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি নতুন করে জেগে ওঠার স্বপ্ন দেখেন।
মাসুদা ইয়াসমিন উর্মি জানান, প্রথম দিকে বায়তুল মোকাররম, বনানী, রাইফেল স্কোয়ারের কয়েকটি দোকানেই ব্যাগ সাপ্লাই দিতেন। পরবর্তীতে ডিজাইন সংযোজন পরিবর্তন ও মানোন্নয়নের কারণে অন্যান্য মার্কেটে ব্যবসায় সম্প্রসারণ করেন। লাভের টাকা দিয়ে নতুন মেশিন কিনেন ও আরো কারিগর নিয়োগ দেন। বিক্রির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকলে বাড়তি অর্ডার সরবরাহ করতে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের শ্যামলীস্থ রিংরোড শাখা থেকে তিন লাখ টাকা লোন নেন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে তিনি ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত শোরুমে ব্যাগ সরবরাহ করছেন। মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কোয়ার মার্কেটে নিজস্ব শোরুম চালু করেছেন। পরে ইউনিয়ন ব্যাংক দিলকুশা শাখা থেকেও ৮ লাখ টাকার সিসি লোনের অনুমোদন নেন। তার উৎপাদিত পণ্য আজ বে-এম্পোরিয়াম লি:, মুনসুন লেদার লি:, সিএসডি ক্যান্টনমেন্ট, উইলয় ফুটওয়ার লি:, গুলশান পারিকা, উত্তরা প্রেসিডেন্ট পয়েন্ট, টপটেন মার্ট, খুলনার সেফ অ্যান্ড সেভ, রাজশাহীর রঙ রোজিনী, কুমিল্লার উইলয় ফুটওয়ারসহ স্বনামধন্য শোরুমগুলোতে সরবরাহ করছেন। মাসুদা ইয়াসমিন উর্মি জানান, ভবিষ্যতে নিজের তৈরি ব্যাগ বিদেশী রফতানি করার স্বপ্ন দেখেন তিনি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.