সেলফোন ব্যবহারে অসতর্কতায় বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি
সেলফোন ব্যবহারে অসতর্কতায় বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি

সেলফোন ব্যবহারে অসতর্কতায় বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি

নয়া দিগন্ত অনলাইন

অতিরিক্ত সেলফোন ব্যবহারে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। অপরাধীরা অপরাধ সংঘটনে মোবাইল ফোনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা, গুম ইত্যাদি মারাত্মক অপরাধে সেলফোন ব্যবহৃত হচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে  জঙ্গি অর্থায়নে লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। স্পূফিং, সীম ক্লোনিং ও এসএমএস এডিটিং ছড়িয়ে পড়ছে।

সেলফোনে পর্ণোগ্রাফির ব্যবহার মহামারীর আকার ধারণ করেছে। অযাচিত প্রেম, ইভটিজিং, প্রেমিকের হাত ধরে পলায়ন ইত্যাদি বিষয় ত্বরান্বিত করার জন্যও সেলফোন অনেকাংশে দায়ী। স্কুল কলেজের ছেলে-মেয়েদের টয়লেটে গোপন ক্যামেরা ও প্রেমের মায়াজালে ফেলে বিভিন্ন আপত্তিকর ছবি এবং ভিডিও ধারণ করা হয়। মতের পার্থক্য দেখা দিলে, তা প্রকাশ পায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক, ইউটিউবে। এতে অনেক মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশে স্পুফিং সফওয়্যারটিকে ব্যবহার করে বিভিন্ন জায়গায় অপহরণ, জিম্মি করে টাকা আদায়ে বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি করা হচ্ছে। ‘স্পুফিং হচ্ছে একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির মোবাইল নম্বর হুবহু নকল করে অন্য কাউকে ফোন করা। কৌশলে বিভিন্ন সফটওয়ারের মাধ্যমে কলার নিজের নাম্বার হাইড করে তার স্থলে কলারের ইচ্ছে মতো নাম্বার প্রদর্শন করে রিসিভারের মোবাইলে।

এছাড়া ‘সীম কার্ড ক্লোনিং’ এর মাধ্যমে সিমের পুরো তথ্যই চুরি করা হচ্ছে। একটি সিম কার্ডের মাইক্রো কন্ট্রোলারের থাকা তথ্য অনুরূপ বা নকল করা হচ্ছে। ফলে সিম কার্ডে থাকা সকল তথ্য নকল সিম কার্ডে চলে যাচ্ছে, এমনকি সিম কার্ড ক্লোনিং এর ফলে সঠিক সিম কার্ডের রেকর্ড যেমন: কল লিস্ট, ডায়াল কল লিস্ট, মেসেজ লিস্ট, পিন কোড, আইসিসিআইডি নম্বর এবং সিম কার্ডের ব্যালেন্স স্থানান্তর হচ্ছে। সিম ক্লোনিং এর কারনে ক্রাইম না করেও চাদাবাজি, প্রতারণা, ডাকাতি এমনকি খুনের মামলায়ও ফেসে যেতে পারেন। আর্থিক বিপর্যয়, সামাজিক সম্মানহানি বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হতে পারেন।

 আতঙ্ক ছড়াচ্ছে এসএমএস এডিটিং, যা মোবাইল প্রতারকদের নতুন কৌশল হতে পারে। স্পুফিং ও সিম ক্লোনিং হচ্ছে বাংলাদেশে মোবাইলে প্রতারণায় ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর প্রথম ধাপ মাত্র। এসবে ব্যবহৃত সফটওয়্যারগুলোর আরো আপডেট ভার্সন আছে। এমনও শক্তিশালী প্রযুক্তি আছে যার মাধ্যমে একজনের পাঠানো এসএমএস আরেকজন এডিট করে পাঠাতে পারে, কথা শুনতে পারে এবং রেকর্ডও করা যায়। এসএমএস এডিটিং এর মাধ্যমেও হতে পারে প্রতারণা। এসএমএস পরিবর্তন করেও পাঠানো যায়।

অতিরিক্ত সেলফোন ব্যবহারে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

অতিরিক্ত সেলফোন ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। মাত্রাতিরিক্ত ফোনালাপ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, মস্তিষ্কে এর প্রভাব পড়ে, মস্তিষ্ক উত্তপ্ত হয়, বাড়ায় নিদ্রাহীনতা। স্মার্টফোন স্ক্রিন থেকে নির্গত কৃত্রিম নীল আলো ঘুমের চক্র নষ্ট করে দিচ্ছে এবং স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

যারা রাত জেগে একটানা দীর্ঘ সময় কম্পিউটার ব্যবহার করেন বা মোবাইল ফোনে কথা বলেন তাদের রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। নিদ্রাহীনতার জন্য রাতের বেলা স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার দায়ী। রাতের বেলা অতিরিক্ত সময় সেলফোন ব্যবহারে চোখের সমস্যা হতে পারে, রেটিনার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। শরীরে মেলাটোনিনের ঘাটতি দেখা দেয়। শরীরে সহজেই রোগ বাসা বাধতে পারে।

সেলফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারে দৃষ্টি বৈকল্য সৃষ্টি হতে পারে। এতে করে মায়োপিয়া বা ক্ষীণ দৃষ্টি দেখা দিতে পারে। চোখের খুব কাছে রেখে অতিরিক্ত সময় ধরে স্মার্টফোন ব্যবহার করলে জিনগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। দু’’কানে মাইক্রোফোন লাগিয়ে উচ্চশব্দে গান শুনায় এবং মোবাইল ফোনে দীর্ঘ সময় কথা বলার কারণে শ্রবণশক্তি হ্রাস করছে, কানের মধ্যে ব্যথা হচ্ছে, কানের অন্তঃপর্দা ও অন্তকর্ণের কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

 গর্ভবতীদের সেলফোন নিজের কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা উচিত। তা না হলে গর্ভস্থ শিশুর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে, মানসিক বিকলাঙ্গ হয়েও জন্ম নিতে পারে শিশু। সেলফোনে আসক্ত ব্যক্তিদের ব্রেইন ক্যান্সারও হতে পারে। প্যান্টের পকেটে সেলফোন রাখলে ছেলেদের প্রজনন ক্ষমতার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মোবাইল থেকে নির্গত রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন গুণগতমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং শুক্রাণুর ঘনত্ব কমিয়ে দিতে পারে।

অতিরিক্ত সময় ধরে মেসেজ বা বার্তা টাইপ করা হলে আঙুলের জয়েন্টগুলোতে ব্যথা হতে পারে এবং অবস্থা বেশি খারাপ হলে আর্থরাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেলফোন বুকের কাছে সেল ফোন রাখলে হৃদপিন্ড, যকৃত ও ফুসফুসের ক্ষতি হয়। টয়লেট সিটের তুলনায় ১০ গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে সেলফোনে। সেলফোন নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এটি জীবাণুর অভয়ারণ্য হয়ে ওঠে। ৩০ মিনিটের বেশি সেলফোনে কথা বললে মস্তিষ্কের কাজের ক্ষমতা কমে যায়, স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়।

 সেলফোন থেকে সৃষ্ট তেজস্ক্রিয়তা মানুষের হার্টের স্বাভাবিক কর্মকান্ডকে ব্যহত করে। এর ফলে রক্তের লোহিত রক্তকণিকাতে থাকা হিমোগ্লোবিন আলাদা হয়ে যেতে থাকে। এছাড়া হিমোগ্লোবিন রক্তের লোহিত কণিকার মাঝে তৈরি না হয়ে দেহের অন্যত্র তৈরি হতে থাকে। যারা হার্টে পেসমেকার বসিয়েছেন তাদের সেলফোন ব্যবহার ক্ষতি করে।

মোবাইল ফোনে নারী কন্ঠের ফাঁদ!

মোবাইল ফোনে নারী কন্ঠের মাধ্যমে প্রতারণা বাড়ছে। নাটোরের লালপুরে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ফোনে নারী কন্ঠের মাধ্যমে প্রতারণাকারি চক্রের ১১ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা  ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী, আইটি বিষয়ে দক্ষ এবং রয়েছে দুজন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারও।

শনিবার দুপুরে নাটোরের পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদার জানান, প্রতারক চক্রটি নাটোরের লালপুর এলাকায় গত দু’বছর ধরে সুন্দরীদের ছবি ব্যবহার করে বিডি কল গার্ল, হট ইমো কল গার্ল, বিডি কিউট গার্ল প্রভৃতি নামে ফেইক ফেইসবুক পেইজ ব্যবহার করে আসছে। ওই পেইজে সুন্দরী নারীদের ছবি দেখিয়ে এবং তাদের নামে বিভিন্ন কমেন্টের মাধ্যমে একে অপরের মোবাইল নম্বর আদান-প্রদান করে। নম্বর আদান-প্রদানের পর তারা মোবাইল ফোনে ম্যাজিক ভয়েস এর মাধ্যমে কন্ঠস্বর পরিবর্তন করে ফোন সেক্স, ভিডিও সেক্স করে থাকে। পরে তারা দেখা করার কথা বলে ইমোশনাল ব্লাক মেইল করে বিভিন্ন জনের কাছে থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল।

বিষয়টি জানতে পেরে লালপুর থানা ও ডিবি পুলিশ অনুসন্ধান চালিয়ে শুক্রবার রাতে লালপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এসময় তাদের ব্যবহৃত ৭টি ফোন জব্দ করা হয়েছে। তাদের ফোনে ম্যাজিক ভয়েজ অ্যাপ সফটওয়ার দেওয়া রয়েছে। লালপুর থানার ওসি আবু ওবায়েদ জানান, গ্রেফতারকৃতরা তাদের নিজ নিজ এলাকায় ইমো পার্টির সদস্য হিসেবে পরিচিত।

আটককৃতরা হচ্ছে- লালপুর উপজেলার নাগশোষা গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে মেহেদী হাসান ওরফে আশিক (২৪), একই গ্রামের মর্জেম হোসেনের ছেলে আসাদুল ইসলাম (২৫), মফিজ উদ্দিনের ছেলে নাজমুল হক (১৮), বাবর আলী বাবুর ছেলে সাগর আহম্মেদ (১৮), জালাল উদ্দিন সরদারের ছেলে  শিমুল হোসেন (২৫) আব্দুল হান্নান মোল্লার ছেলে জুয়েল রানা (২৪), সামসুল হকের ছেলে শাহাদৌলা ইসলাম ওরফে শাহাদুল্লাহ (২২), মহরকয়া পুর্বপাড়া গ্রামের আশরাফ আলীর ছেলে আসাদুজ্জামান ওরফে লিখন (২২), মহরকয়া থান্দারপাড়া গ্রামের আব্দুল মজিদ থান্দারের ছেলে হাবিবুর রহমান ওরফে জুয়েল (২৫) এবং মহরকয়া ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে মুহাইমিনুল ওরফে আবির (২৪) ও একই গ্রামের জমির উদ্দিনের ছেলে লালন উদ্দিন (২২)।

পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদার আরো জানান, এটি একটি নতুন ধারার অপরাধ। ধারণা করা হচ্ছে এ ধরনের প্রতারণার সাথে অনেকেই জড়িত রয়েছে। এই অপরাধ চক্র সম্পর্কে আরো তথ্য জানতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য  গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ড আবেদন জানানো হবে। একই সাথে আরো অনুসন্ধান চালানো হবে এবং এ বিষয়ে অভিযান চলমান থাকবে। তাদের বিরুদ্ধে লালপুর থানায় পর্ণোগ্রাফী নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ এর (৩) তৎসহ ৪০৬/৪২০/১০৯ পেনাল কোড আাইনে নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.