নীল বন্ধু

কাজী সুলতানুল আরেফিন

এভাবে লুকিয়ে আর কত সাহায্য করবে?
যত দিন আল্লাহ সামর্থ্য দিবেন!
কেন করছ? তুমি তো এখন আর আমার কেউ নয়!
মনে কর আমি তোমার বন্ধু।
কিন্তু আমি তো তোমাকে কষ্ট ছাড়া আর কিছু দিইনি!
তাহলে আমি তোমার ‘নীল বন্ধু’। শুনেছি কষ্টের রঙ নাকি নীল!
একটু বসে যাও।
নাহ! কাজ আছে।
একসময় সব কাজ ফেলে আমাকে দেখার জন্য পথের ধারে বসে থাকতে তুমি!
সাদা শাড়ি পরা মীমের কথায় মুচকি হেসে চলে যায় আরিফ। রাস্তার ধারের বাড়িটা থেকে বেরিয়ে একবার আকাশ পানে চায় আরিফ। একটি শঙ্খ চিল যেন দিগন্তের শেষ সীমানায় মিলিয়ে গেল। মনের দৃশ্যপটে ফেলে আসা দিনের ছবিগুলো ভেসে উঠে আরিফের। সে যখন কলেজে পড়ত আর মীম তখন নবম শ্রেণীতে। পাশের গ্রামের মেয়ে মীম যে রাস্তা দিয়ে স্কুলে যেত আরিফ সে রাস্তার ধারে বসে থাকত। একজনের দিকে একজনের তাকিয়ে দেখা থেকেই ভালো লাগার শুরু। কথা হতো শুধু গ্রামের কোনো বিয়েশাদির অনুষ্ঠানে। তাও বেশিক্ষণ নয়। গ্রামের মানুষের কিছু দৃষ্টিগোচর হলেই আর রক্ষা নেই। আরিফ খুব সজাগ ছিল। তবুও মীমের মা কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন। মীমের বিয়ের জন্য প্রস্তাব আসতেই মীমের মা রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। মীম ছিল মা-বাবার একমাত্র সন্তান। মীমের সহজ সরল বৃদ্ধ বাবা কোনো কিছুরই ধার ধারতেন না। আরিফ মীমের এক বান্ধবীর সাহায্য নিয়ে বারবার মীমের সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছিল। মীম অপারগতা জানায় আর খবর পাঠায় আরিফ যেন তাকে ক্ষমা করে দেয়। সে আরো জানায় তার মা তার সাথে খুব অচেনার মতো আচরণ করছে। এভাবে অবশেষে একদিন বিয়ে হয়ে যায় মীমের। ছাত্র আরিফ নীরবে চোখের পানি ফেলে মীমকে বিদায় জানায়। আরিফও ধীরে ধীরে পাথর হয়ে যেতে থাকে। আগের মতো আর কোনো কিছু নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখায় না। তবে বিধির খেলা বোঝা বড় দায়। বিয়ের দুই বছর পর মীমের স্বামী কোনো এক রোগে মারা যায়। রেখে যায় এক ছেলে। শ্বশুরের পরিবার মীমকে সহ্য করতে পারছিল না। নানা ঘটন আর অঘটনের পর অবশেষে মীম ছেলে নিয়ে নিজের বাড়ি ফিরে আসে। আরিফ এসব কেবল লোকমুখে শুনতে পায়। তবে ভুলেও মীমদের বাড়ির দিকে পা বাড়ায় না। এভাবে আরো দুই বছর যায়। এরই মধ্যে মীমের বাবা মারা যায়। মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে বিছানায়। তত দিনে আরিফের একটি চাকরি হয়। এ দিকে সব কিছু নিয়ে মীম খুব হিমশিম খেতে থাকে। সে গ্রামের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকরি নিয়ে তার ছেলেকেও সেখানে ভর্তি করে দেয়।
দেখতে দেখতে কেটে গেল আরো দুই বছর। এক রাতে মীমের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আরিফ শিশুদের চেঁচামেচি শুনতে পায়। সে বুঝতে পারল মীমের ছোট ছেলে মীমের কাছে কিছু কিনে দেয়ার জন্য বায়না ধরেছে। মীম বারবার তার ছেলেকে বোঝাচ্ছে মায়ের কাছে এখন টাকা নেই, যা আছে তা দিয়ে নানুর জন্য ওষুধ কিনতে হবে। পরদিন সন্ধ্যায় মীমের ছেলের বায়না ধরা জিনিস নিয়ে হাজির হয় আরিফ। মীম আরিফকে দেখে চমকে ওঠে! সে বোধহয় আরিফকে ভুলতেই বসেছিল!
সে থেকে এভাবে চলছে। আরিফ গোপনে খোঁজখবর রাখে তাদের। মীমের ছেলে যা বায়না ধরে তা কিনে দেয়। মাঝে মধ্যে মীমের মায়ের ওষুধপত্রও কিনে দেয়। মীম বারণ করলে আরিফ বলে, ‘শিশু ছেলের কী দোষ! তার তো তোমার অবস্থা বোঝার এখনো বয়স হয়নি।’ তবে আরিফ যতবারই আসে তাড়াতাড়ি চলে যায় মীমের বাড়ি থেকে। মীমের অনুরোধেও সে বসে না।
একদিন মীম খুব অস্বস্তিতে পড়ল ছেলের বায়না নিয়ে। পাশের বাড়ির এক ছেলের কাছে খেলার ফুটবল দেখে সে ফুটবল কিনে দেয়ার জন্য বায়না ধরল। জিদ করে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিলো। মীমের হাতে টাকা-পয়সাও নেই যে, ছেলের শখ পূরণ করবে। মীম রাতে ছেলেকে নীল বন্ধুর গল্প শোনায়। সে ছেলেকে আশ্বস্ত করে নীল বন্ধু তার জন্য ফুটবল নিয়ে আসবে। মীমের ছেলেও আশায় আশায় থাকে একদিন নীল বন্ধু তার জন্য ফুটবল নিয়ে আসবে। কিন্তু এদিকে অনেক দিন পেরিয়ে গেল নীল বন্ধু আর মীমের বাড়ি আসে না। অবশেষে দুই সপ্তাহ পরে নীল বন্ধু এক সন্ধ্যায় মীমের বাড়ি এলো। হাতে মীমের ছেলের জন্য ফুটবল আর মীমের জন্য একটা রঙিন শাড়ি। মীমের ছেলেকে হাত বাড়িয়ে সে বলটা দিলো। ছেলে খুশিতে নাচতে নাচতে বল খেলতে লাগল। নীরবতা ভেঙে মীম বলে উঠল, অনেক দিন আসনি। কোথায় ছিলে?
আরিফ আমতা আমতা করতে থাকে।
আমার জন্য রঙিন শাড়ি কেন আনলে? তুমি জান না আমি বিধবা?
মীমের কথা শুনে আরিফ বলে উঠল, ‘তোমাকে বলা হয়নি! পরিবারের চাপে আমি হঠাৎ করে বিয়ে করেছি। বউয়ের মামা শহরে ভালো চাকরির সংস্থান করে দিয়েছেন। আমি কাল সকালে চলে যাব। এখন থেকে শহরেই থাকব। আর কখন আসা হবে ঠিক নেই। আমি চাই তুমিও রঙিন করে আবার জীবন শুরু করো’। আরিফের কথা শুনে মীম চুপচাপ থাকে। আরিফ চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। কিন্তু আজ আর মীম আর তাকে বসতে বলে না। আবারো বলে। ‘আজ বসতে বলবে না?’
‘না’। মীম উত্তর দেয়। আরিফ ঘর থেকে বের হয়ে চলে যায়। সে চলে যাওয়ার সাথে সাথে মীম অঝোরে কাঁদতে থাকে। মীমের ছেলে ছুটে এসে মায়ের কাছে জানতে চায়Ñ
মা কাঁদছ কেন?
আমাদের নীল বন্ধু আর কখনো আসবে না। সে হারিয়ে গেছে! ছেলের প্রশ্নে মীম উত্তর দেয়।
মীমের কথা শুনে তার ছেলে আনমনে অন্ধকার রাস্তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
পূর্ব শিলুয়া,
ফেনী

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.