আহসান মঞ্জিল | ছবি : সাইদ তৌফিকুল ইসলাম
আহসান মঞ্জিল | ছবি : সাইদ তৌফিকুল ইসলাম

ঢাকা : অবসরে বেড়াবেন কোথায়?

সুমনা শারমিন

স্বাধীনতা লাভের অনেক আগে থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজধানীর মতো এই ঢাকাতেও ছিল অনেক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান। ঢাকার বেশির ভাগ ঐতিহাসিক স্থানই পুরান ঢাকায়। অবসরে তাই আগামী প্রজন্মকে আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, লালকুঠি, কার্জন হল, হোসেনি দালান ঘুরে আসার সাথে ইতিহাসও ঝালিয়ে নিতে পারবেন। ঢাকার ঐতিহাসিক স্থান নিয়ে লিখেছেন সুমনা শারমিন

প্রতিটি মানুষই চান অবসর সময়ে প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে কিংবা পরিবার-পরিজনদের নিয়ে এই ব্যস্ততম শহরে প্রকৃতির সবুজ ছায়ায় নিজের মতো করে কিছুটা সময় কাটাতে। ঢাকায় এমন কিছু ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান রয়েছে যেসব জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন পরিবার ও প্রিয়জনকে। এতে বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে ঢাকা কতটুক জড়িত সেটা জানা যাবে সহজেই।

জাতীয় জাদুঘর
ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর থেকে ঈদের ছুটিতে চাইলেই ঘুরে আসতে পারেন। সঙ্গে নিতে পারেন শিশুদের, যাতে তারাও বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। চারতলা এই ভবনের স্থাপত্য নকশা অত্যন্ত নজরকাড়া। ২০ হাজার বর্গমিটারের এই ভবনটির ৪৬টি গ্যালারিতে রয়েছে প্রায় ৮৩ হাজারের বেশি নিদর্শন। কেবল বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ জাদুঘর। জাতীয় জাদুঘর শাহবাগ এলাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। আপনার এলাকা থেকে শাহবাগ রুটের যেকোনো বাসে করে যেতে পারবেন। জাদুঘরের গেটের সামনের কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। টিকিটের মূল্য ৩ থেকে ১২ বছর বয়সীদের জন্য পাঁচ টাকা, ১২ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ১০ টাকা এবং বিদেশী দর্শনার্থীদের জন্য ৭৫ টাকা। জাতীয় জাদুঘর ও তার অধীন জাদুঘরগুলোতে ঈদুল আজহায় শিক্ষার্থী, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ কিছু সুবিধা রয়েছে।

লালবাগ কেল্লা
লালবাগ কেল্লা মোগল আমলের বাংলাদেশের একমাত্র ঐতিহাসিক নিদর্শন, যাতে একই সাথে ব্যবহার করা হয়েছে কষ্টিপাথর, মার্বেল পাথর আর নানান রঙ-বেরঙের টালি। লালবাগ কেল্লা ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শনে এমন বৈচিত্র্যময় সংমিশ্রণ পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত। লালবাগ কেল্লা পুরান ঢাকার লালবাগে অবস্থিত। তিন শ’ বছরের পুরনো স্থাপনা ও সে সময়ের সম্রাটের ব্যবহৃত নানা জিনিস দেখতে পারাটা সৌভাগ্যের, সেই সাথে বিস্ময়েরও বটে। লালবাগ কেল্লায় সম্রাটের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখতে দেখতে আপনিও হারিয়ে যাবেন মোগল শাসকদের আমলে। গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কেল্লা খোলা থাকে। আর শীতকালে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। রোববার পূর্ণ দিবস, সোমবার অর্ধদিবস কেল্লা বন্ধ থাকে। এ ছাড়া সব সরকারি ছুটির দিন লালবাগ কেল্লা বন্ধ থাকে। কেল্লার মূল ফটকের বাইরে দুই পাশে দু’টি কাউন্টার আছে। তার মধ্যে বাম পাশের কাউন্টারটি বন্ধ এবং ডান পাশের কাউন্টারটি খোলা থাকে। দেশী পর্যটকদের জন্য টিকিটের মূল্য ১০ টাকা জনপ্রতি।

লালকুঠি
এটি নর্থব্রুক হল নামেও পরিচিত। বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে ফরাশগঞ্জ মহল্লায় অবস্থিত। গোটা ইমারতটি লাল রঙে রঙিন বলে এর নাম হয়েছে লালকুঠি। ১৮৭৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুকের ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে একটি টাউন হল নির্মিত হয়। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে ফরাশগঞ্জের এ টাউন হলটিকে নর্থব্রুকের নামে নামকরণ করা হয়। তবে দালানটি লাল রঙের হওয়ায় এটি লালকুঠি নামেই বেশি পরিচিত। তৎকালীন ঢাকা শহরের বিনোদন ও সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ফরাশগঞ্জের লালকুঠিকে ঘিরে। লালকুঠির সেই জৌলুশ আর নেই। লাল রঙও মলিন হয়ে গেছে। জানালার কোটরে পাখির বাসা। কিছু কিছু জায়গা ভাঙা। বড় একটি অডিটরিয়াম আছে, তবে কাঠের মঞ্চটি নড়বড়ে। কিছু জায়গা ভেঙেও পড়েছে। পেছন দিকে সাজসজ্জার ঘর। তারও করুণ দশা।

কার্জন হল
রাজধানী ঢাকার লাল রঙের দৃষ্টিনন্দন একটি স্থাপত্য যে কারো নজর কাড়বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত এই ভবন কার্জন হল নামেই পরিচিত। ভিক্টোরীয় স্থাপত্যরীতি, মোগল স্থাপত্যশৈলী ও বাংলার স্বতন্ত্র সংবেদনশীল বৈশিষ্ট্য নিয়ে ভবনটি তৈরি। ১১৩ বছর ধরে ঢাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য আর কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কার্জন হল। কার্জন হল বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও জীব বিজ্ঞান অনুষদের কিছু শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার হল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

হোসেনি দালান
প্রায় ৩৫০ বছরের পুরনো স্থাপনাটি মোগল ঐতিহ্যের নিদর্শন। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, হোসেনি দালান পুরান ঢাকায় অবস্থিত শিয়া সম্প্রদায়ের একটি ইমারত। এটি মোগল আমলে নির্মিত হয়েছিল। ইরাকের কারবালার যুদ্ধে হোসেনের শহীদত্বকে স্মরণ করার জন্য শিয়া সম্প্রদায় এটি নির্মাণ করেছিল। ইরান সরকারের উদ্যোগে ২০১১ সালে হোসেনি দালানের ব্যাপক সংস্কার হয়। মহররমের ১ থেকে ১০ তারিখে হোসেনি দালান ঢাকা শহরের মূল আকর্ষণে পরিণত হয়। শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা এখানে সমবেত হন। আশুরার দিনে এই স্থান থেকে বিশাল একটি তাজিয়া মিছিল বের করা হয়। চাইলে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের কাছাকাছি এই হোসেনি দালানে ঘুরে আসতে পারেন।

বাহাদুর শাহ পার্ক
পুরান ঢাকার সদরঘাটের সন্নিকটে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্ক। এর পশ্চিমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং উত্তর পশ্চিমে জেলা আদালত অবস্থিত। আগে এর নাম ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবে শহীদ বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের উদ্দেশে সিপাহি যুদ্ধের ঐক্যের প্রতীক বাহাদুর শাহ জাফরের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক।

বলধা গার্ডেন
ওয়ারীতে অবস্থিত এটি একটি উদ্ভিদ উদ্যান। বলধার জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ৩.৩৮ একর জমির ওপর ১৯০৯ সালে উদ্যানটি নির্মাণের কাজ আরম্ভ করেন। যা শেষ হতে সময় লেগেছিল প্রায় আট বছর। বিরল প্রজাতির ৮০০ গাছসহ বাগানটিতে প্রায় ১৮ হাজার গাছ রয়েছে। বর্তমানে এখানে ৬৭২ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। বাগানটিতে এমনও অনেক প্রজাতির গাছ রয়েছে, যা বাংলাদেশের অন্য কোথাও নেই। জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ওয়ারী, টিকাটুলি ও নারিন্দার ঠিক মাঝখানে দুটি ভাগে বলধা গার্ডেন তৈরি করেছেন। বলধা গার্ডেনের এক পাশের নাম সাইকি এবং অপর পাশের নাম সিবিলি। বলধা গার্ডেনের সাইকি অংশটিতে সবার যাওয়ার অনুমতি নেই। এটা বন্ধ করে রাখা হয়। কারণ এমন কিছু দুর্লভ প্রজাতির গাছ রয়েছে যা মানুষের আনাগোনায় নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাইকিতে রয়েছে নীল, লাল ও সাদা শাপলাসহ রঙিন পদ্মা, তলা জবা, অপরাজিতা, ক্যাকটাস, পামগাছ, জবা, প্রভৃতি। এখানে আরো রয়েছে ‘সেঞ্চুরি প্ল্যান্ট’ নামক শতবর্ষে একবার ফোটা ফুলের গাছ। সপ্তাহের প্রতিদিনই এটি সকাল ৮টা থেকে ১১টা এবং বেলা ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

জিনজিরা প্রাসাদ
পুরান ঢাকার বড় কাটরার দক্ষিণ দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর অপর তীরে জিনজিরা প্রাসাদ অবস্থিত। মুঘল সুবহাদার দ্বিতীয় ইব্রাহিম খান তার প্রমোদ কেন্দ্র হিসেবে জিনজিরা প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ঘসেটি বেগম, আমেনা বেগম, সিরাজউদ্দৌলার স্ত্রী লুৎফুন্নেছা বেগম এবং তার কন্যাকে জিনজিরা প্রাসাদে এনে বন্দী রাখা হয়। আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে শহর থেকে জিনজিরার মধ্যে চলাচলের জন্য একটি কাঠের পুল ছিল। প্রাসাদটির পূর্বাংশ তিনতলা সমান, মাঝ বরাবর প্রকাণ্ড প্রাসাদ তোরণ। তোরণ প্রাসাদকে দুই ভাগ করে অপর প্রান্তে খোলা চত্বরে মিশেছে। প্রাসাদ তোরণের পূর্বাংশেই ছিল সুড়ঙ্গপথ।

আহসান মঞ্জিল
বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় ঘেঁষে কুমারটুলি এলাকায় এই আহসান মঞ্জিলের অবস্থান। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে শেখ ইনায়েত উল্লাহ আহসান মঞ্জিলের বর্তমান স্থানে রঙমহল নামের একটি প্রমোদ ভবন নির্মাণ করেন। পরে বিভিন্ন হাতঘুরে তা নবাব আবদুল গনির হাতে আসে। নবাব আবদুল গনি ভবনটিকে পুনর্নির্মাণ করেন, ১৮৫৯ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ১৮৭২ সালে শেষ হয়। নিজের ছেলে খাজা আহসান উল্লাহের নামে আহসান মঞ্জিল নামটি তখনই রাখেন তিনি। পরে এ বাড়িতে নবাব আহসান উল্লাহ বাস করতেন। মঞ্জিলটি দুটি অংশে বিভক্ত- রঙমহল এবং অন্দরমহল। বর্তমানে এটি একটি জাদুঘর; প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী এ জাদুঘর দেখতে এসে থাকেন। শনি থেকে বুধ, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য এটি খোলা থাকে। বৃহস্পতিবার ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে আহসান মঞ্জিল বন্ধ থাকে।

রোজ গার্ডেন
রোজ গার্ডেন আজো দাঁড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার গোপীবাগ এলাকায়। তৎকালীন নব্য জমিদার ঋষিকেশ দাস বিশ শতকের তৃতীয় দশকে (সম্ভবত ১৯৩০ সালে) গড়ে তোলেন এ গার্ডেন। বলধার জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর বাগান-বাড়ির আদলে নির্মিত হয়েছিল রোজ গার্ডেন। তৎকালীন উচ্চবিত্ত হিন্দুসমাজের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল বলধা জমিদারের বাড়ি। একদিন বিনা আমন্ত্রণে ঋষিকেশ গিয়েছিলেন বলধার এক জলসায়। কিন্তু ঋষিকেশ দাস সনাতনি ধর্মে নিম্নবর্ণ হওয়ায় তাকে সেখানে অপমানিত হতে হয়। তারপরই নির্মাণ করেন রোজ গার্ডেন। রোজ গার্ডেনটি ছিল ২২ বিঘা জমির ওপর। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দুর্লভ সব গোলাপ গাছে সুশোভিত করেছিলেন এ উদ্যানটি। বাগানের প্রধান গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে একটি শান বাঁধানো পুকুর। গেট, পুকুর ও বাগানে ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত অনেকগুলো ভাস্কর্য ছিল। বাগানের পুরো সীমানাজুড়ে ছিল আমগাছের সারি ও মাঝখানে অবস্থিত কারুকার্যমণ্ডিত দ্বিতল ভবনটি।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.