মসজিদে নববীর জুমার খুতবা

মহররম মর্যাদাসম্পন্ন ও সম্মানিত চার মাসের একটি

শাইখ ড. আবদুল্লাহ আল-বুআইজান


সব প্রশংসা আল্লাহর, যাঁর জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর কর্তৃত্ব। তাঁর কাছেই সব বিষয় ফিরে যাবে। প্রশংসা ও গুণকীর্তন শুধু তাঁর। তিনিই টিকে থাকবেন। তিনিই চন্দ্র, সূর্য, রাত ও দিন নিয়ন্ত্রণ করেন।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তিনি দায়িত্বশীলতার সাথে তাঁর রিসালাত ও তাঁর ওপর ন্যস্ত আমানত মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
প্রতিটি সচেতন লোকের দায়িত্ব হলো অনুতপ্ত হওয়ার মতো সময় আসার আগেই জীবনকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। এমন এক সময় আসবে যখন হৃদয় অনুতপ্ত হবে, চোখ অশ্রুসিক্ত হবে। এ বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন,
‘(আল্লাহর পক্ষ থেকে আকস্মিক শাস্তি এলে) কেউ কেউ বলবে, হায়! আল্লাহর প্রতি আমরা কর্তব্যে যে শৈথিল্য করেছি, তার জন্য আফসোস! আমি তো ঠাট্টা-বিদ্রƒপকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। অথবা বলবে, আল্লাহ আমাকে পথপ্রদর্শন করলে আমি তো অবশ্যই মুত্তাকিদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। অথবা আজাব ও শাস্তি দেখে বলবে, আহা, যদি একবার পৃথিবীতে আমার প্রত্যাবর্তন ঘটত, তবে আমি সৎকর্মপরায়ণ হতাম।’
হে আল্লাহর বান্দারা! সময় অতিক্রান্ত হবে, জীবনের সময় নির্ধারিতÑ তা-ও নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু দায়িত্ব ও কর্তব্য তো অনেক। দায়িত্ব-কর্তব্যও তো পালন করতে হবে।
মানুষকে তার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, কিভাবে তাকে কাজে লাগিয়েছে। যৌবন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, তাকে কিভাবে ব্যবহার করেছে। তাকে জীবন সম্পর্কে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। মনে রাখতে হবে, বয়স যত দীর্ঘই হোক না কেন, সময়ের বিবেচনায় তা খুবই সংক্ষিপ্ত।
‘আল্লাহ বলবেন, তোমরা পৃথিবীতে কত বছর অবস্থান করেছিলে? তারা বলবে, আমরা অবস্থান করেছিলাম একদিন অথবা দিনের কিছু অংশ। আপনি না হয় গণনাকারীদের জিজ্ঞেস করুন।’
তিনি বলবেন, ‘তোমরা অল্পকালই অবস্থান করেছিলে, যদি তোমরা জানতে। তোমরা কি মনে করেছিলে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে না?’
হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহ আপনাদের উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি করেননি, বরং তিনি জীবন-মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন এটা যাচাই করার জন্য যে, আপনাদের মধ্যে কর্মের দিক থেকে উত্তম কে?
আমাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন ও অনাকাক্সিক্ষত বিষয় হলো, সময় চলে যাওয়ার পর আফসোস করা। সময় অতিক্রান্ত হলে মৃত্যুর সময় আমাদের দুঃখ ও আফসোস করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন সে বলে, হে আমার রব, আমাকে পুনরায় প্রেরণ করো, যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি। না এটি হওয়ার নয়, এটি তো তার একটি কথার কথা। পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বারজাখ (নামে এক ভিন্ন জগৎ)।
তিনি আরো বলেন, ‘হে যারা ঈমান এনেছো, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন তরে না রাখে। যাদের এমন অবস্থা হবে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তোমাদেরকে যে জীবিকা দিয়েছি তা থেকে খরচ করো, মৃত্যু আসার আগে। অন্যথায় মৃত্যু এলে সে বলবে, হে আমার রব, আমাকে আরো কিছুকালের জন্য অবকাশ দিলে আমি দান-সাদকাহ করতাম এবং সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। কিন্তু যখন কারো নির্ধারিত সময় তথা মৃত্যু এসে যাবে, তখন আল্লাহ তাকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা করো সে বিষয়ে আল্লাহ অবহিত।’
হে আল্লাহর বান্দারা! জীবনের সময়গুলো কাজের জন্য সুযোগ! এটি আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামত। আমাদের দায়িত্ব হলো এ নেয়ামতের শোকর আদায় করা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে সে-ই ভালো যার বয়স দীর্ঘ হয়েছে, আর কর্মও উত্তম হয়েছে। বিপরীত দিকে সবচেয়ে মন্দ মানুষ হলো, যে দীর্ঘ জীবন পেয়েছে কিন্তু তার কর্ম হয়েছে মন্দ।’
আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম হলো, সময়ের নেয়ামতকে কাজে লাগানো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত পন্থায় আল্লাহর আনুগত্যের মধ্য দিয়ে জীবন কাটানো।
পক্ষান্তরে আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা হলো সময় ও জীবনকে আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতায় কাটানো। আর এর পরিণতি হবে আফসোস, অনুতপ্ততা ও আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি।
‘যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে।’
হে মুসলিম সমাজ! হিজরি সনের প্রথম মাস হলো মহররম। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা বারোটি, তন্মধ্যে চারটি অতি মর্যাদাসম্পন্ন। এটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এসব মাসে তোমরা নিজেদের ওপর জুল্মু করবে না।’
আবুবকর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই সময় একই নিয়মে আবর্তিত হচ্ছে। বছর বারো মাসে। তন্মধ্যে চার মাস সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন। তিনটি হলো, পরপর আর সেগুলো হচ্ছেÑ জুলকা’দাহ, জুলহিজ্জাহ ও মহররম। আরেকটি হলো রজব। (বুখারি ও মুসলিম)
হে আল্লাহর বান্দারা! আমাদের রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা অনুযায়ী এ মাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যম হলো আশুরার সিয়াম পালন। আশুরা হলো মহররমের দশম তারিখ।
আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় এসে দেখলেন, ইহুদিরা আশুরা দিবসের সিয়াম পালন করছে। তাদেরকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তারা বলল, এ দিনে আল্লাহ ফেরাউনের বিরুদ্ধে মূসা আলাইহিস সালাম ও বনি ইসরাঈলকে বিজয় দিয়েছিলেন। এর সম্মানে আমরা সিয়াম পালন করি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমাদের তুলনায় মূসার সাথে তো আমার অধিকার বেশি।’ এরপর তিনি এ দিন রোজা রাখার জন্য আদেশ করলেন। (বুখারি ও মুসলিম)
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আশুরা দিবসের সিয়াম তথা রোজা সম্পর্কে আল্লাহর কাছে আমি এমনটি আশা করি যে তিনি বিগত এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরা তথা মহররমের দশম তারিখে রোজা রেখেছেন এবং রোজা রাখার জন্য আদেশ করেছেন। শেষ জীবনে তিনি একবার বলেছিলেন যে, আগামী বছর ইনশাআল্লাহ নবম তারিখও রোজা রাখব। আগামী বছর আসার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। (সহিহ মুসলিম)
ইহুদিদের আমলের বিপরীতে দশম ও নবম তারিখে রোজা রাখা সর্বোত্তম।
হে মুসলিম সমাজ! বিদআতÑ একটি ফিতনাহ তথা দ্বীনের মধ্যে বিশৃঙ্খলা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিকৃষ্ট বিষয় হলো দ্বীনের মধ্যে উদ্ভাবিত নতুন বিষয় তথা বিদআত। সব বিদআতই ভ্রান্ত, আর সব ভ্রান্তির পরিণাম হলো জাহান্নাম।’
মজবুত অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরুন। আর তা হলো সিরাতে মুস্তাকিমÑ সরল ও দৃঢ় পথ। ‘তোমরা বহু পথের অনুসরণ করো না। বহু পথের অনুসরণ তোমাদের আল্লাহর (মূল) পথ থেকে সরিয়ে দেবে।’
হে আল্লাহর বান্দারা! সতর্কতা অবলম্বন করুন। আল্লাহর কিতাব ও আপনাদের নবীর হেদায়াতকে আঁকড়ে ধরুন। এটিই আপনাদের জন্য যথেষ্ট।
‘তোমার প্রতি যে ওহিই প্রেরণ করা হয়েছে, তা আঁকড়ে ধরো। নিশ্চয়ই তোমার অবস্থান হচ্ছে সিরাতে মুস্তাকিমÑ সরল ও দৃঢ় পথের ওপর। এটি তোমার ও তোমার জাতির জন্য উপদেশ। শিগগিরই তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
হে আল্লাহ! হারামাইনের দেশ ও মুসলিমদের সব দেশকে হিফাজত করো। হে আল্লাহ! খাদিমুল হারামাইন ও তার উত্তরাধিকারকে নিজ দেশ ও তোমার বান্দাদের স্বার্থে কাজ করার তাওফিক দাও। ইসলাম ও মুসলিমদের কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দাও। হে আল্লাহ! তুমি মিয়ানমারের মুসলিমদের হয়ে যাও। তাদের রক্তপ্রবাহ বন্ধ করো। শিগগিরই তাদের সঙ্কট থেকে মুক্ত করে দাও।
অনুবাদ : অধ্যাপক আ ন ম রশীদ আহমাদ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.