নির্মম চারাগল্প

জোবায়ের রাজু

দুই দিন ধরে কামরুলের কোনো হদিস নেই দেখে বেশ টেনশনে ভুগছে রুবি। এমন তো হওয়ার কথা নয়। যে কামরুল দিন-রাত ছব্বিশ ঘণ্টা মুঠোফোনে রুবির খোঁজ রাখতে মরিয়া, সে কামরুলের এমন নীরব ভূমিকা সত্যিই ভাবার বিষয়। অবশ্য কামরুলের ফোনটা বন্ধ দেখলে চিন্তার অন্ত থাকত না রুবির। ফোনটা খোলাই আছে। কিন্তু কোনোভাবেই রিসিভ করছে না কামরুল। ফোন সাইলেন্ট রাখার ছেলেও না সে। বেচারি রুবি অনবরত কল দিয়ে দিয়ে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে, অথচ কামরুলের সে দিকে কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই।
আচ্ছা কামরুলের সাথে মোবাইলটা আছে তো! ভাবে রুবি। থাকবে না কেন! অবশ্যই থাকবে। ফেসবুক ছাড়া যে কামরুল অচল। অতএব মোবাইলটা তার সাথেই থাকার কথা। রুবিও অবশ্য ফেসবুক ছাড়া বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। সামাজিক এই যোগাযোগের মাধ্যমে দূরের আপন মানুষগুলোকে সে প্রতিনিয়ত কাছে পাচ্ছে। ফেসবুক ভরে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের লোমহর্ষক নির্মম চিত্রে। গা শিউরে ওঠা ওই ছবিগুলো দেখে রুবির বোধ নাড়া দিয়ে ওঠে। আহারে এভাবে গণহত্যা করে কী লাভ অং সান সু চির! কেউ কেউ আবার ফেসবুকে রোহিঙ্গাদের হত্যাযজ্ঞের মর্মান্তিক ভিডিও আপলোড করছে। সেসব দেখে রুবির হৃদয়টা দুমড়ে মুছড়ে যায়। মানুষ মানুষকে এভাবে হত্যা করতে পারে! ওই শিশুগুলোকে এভাবে শেষ করে দেয়া হচ্ছে, বিবস্ত্র তরুণীর সম্ভ্রম নষ্ট করে, শরীর কেটে খণ্ড খণ্ড করে মানবতা মিশিয়ে দিচ্ছে মিয়ানমারের ধূলিতে, নাফ নদীর স্রোতে দুলছে শিশুগুলোর মৃতদেহ। না, আর ভাবতেই পারছে না রুবি।
শুধু এসব ছবি বা ভিডিও দেখার ভয়ে ক’দিন ধরে ফেসবুক লগ আউট করে রেখেছে রুবি। অবসর কাটানোর জন্য মুঠোফোনে বেছে নিয়েছে মনের মানুষ কামরুলকে। কিন্তু দুই দিন ধরে কামরুল যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। এমনটি হবে কেন, না, কামরুল কল রিসিভ না করলেও রুবি তাকে বিরামহীন ফোন দিয়ে যাবে।
অনেকক্ষণ কল হওয়ার পর একসময় রিসিভ করে কামরুল। সংক্ষেপে কথা বলে লাইন কেটে দেয় সে। কামরুল উদ্বিগ্ন গলায় বলে ‘কক্সবাজারে খুব ঝামেলার মধ্যে আছি। এখন রাখো। পরে কথা হবে।’
রুবিকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে কামরুল লাইন কেটে দেয়ার পর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে রুবি। কামরুল কখন কক্সবাজার গেছে! তাকে বলে যাওয়াটা একবারও দরকার মনে করল না! তার পর ওখানে নাকি সে ঝামেলার মধ্যে আছে! কিন্তু কী সেই ঝামেলা! কেমন ঝামেলা! কোনো বিপদ না তো! কেন বা সে তাকে না বলে কক্সবাজার গেল! নীরব এক অভিমান মনে ভর করে রুবির। সমুদ্রের প্রতি রাগ আছে তার। পাঁচ বছর আগে রুবির এক মাত্র ভাই মিলন এই সমুদ্রে হারিয়ে গেছে। সেই শোক এখনো তার পরিবারে লেগে আছে। পারিবারিকভাবে কামরুল রুবির বিয়ে ঠিক হওয়ার পর এমন কোনো দিন নেই যে দু’জন ফোন কলে দীর্ঘ কথা বলে না। এক দিন মাঝ রাতে রুবি বলল, ‘বিয়ের পর হানিমুনে আমরা কোথায় যাবো’। ওপার থেকে চঞ্চল গলায় কামরুলের জবাব ‘কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে’। আপত্তির সুরে রুবি বলে ‘ওই সর্বনাশা সাগরে কখনো যাবো না। ওই সাগর আমার ভাইকে কেড়ে নিয়েছে।’
সেই রাতে কামরুল প্রথম জানল রুবির ভাইয়ের এই অপমৃত্যুর গল্প। কাঁপা গলায় রুবি বলল, ‘তুমি কিন্তু কখনো সাগর দেখতে যাবে না। এ কথা দাও আমাকে। আমার ভাইয়ের মতো তোমাকেও হারাতে পারব না।’ কথা না বাড়িয়ে কামরুল বলে ‘কথা দিলাম’।
কিন্তু সেই কথা রাখেনি কামরুল। ওয়াদা ভঙ্গ করে সমুদ্রে গেছে সে। ভার মন নিয়ে ফেসবুক লগ ইন করল রুবি। প্রথমেই হোমপেজে দেখা গেল কামরুলের অনেকগুলো আপলোড করা ছবি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে কামরুল তার বন্ধুদের সাথে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণ করছে। ছবির ক্যাপশনে লেখা ‘রোহিঙ্গাদের সহায়তায় আমরা একদল তরুণ’।
মন ভরে গেল রুবির। কামরুলও তাহলে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় অংশ নিয়েছে! কিন্তু এ ভালো কাজটি করার সময় রুবিকে একবারও জানাল না! রাগ ভুলে কল দেয় কামরুলকে। প্রথম কলেই রিসিভ হয়Ñ
Ñতোমাকে কিছুক্ষণ পর কল দিতাম। তুমি কল করেছ। ঝামেলা থেকে মুক্তি মেলল আমাদের।
Ñতুমি রোহিঙ্গাদের সাহায্য করতে দলবল নিয়ে কক্সবাজার গেয়েছ?
Ñহ্যাঁ।
Ñআমাকে একবারও জানানো প্রয়োজন মনে করোনি?
Ñনা জানো। জানালে তুমি বাধা দিতে। তোমাকে না কথা দিয়েছি কক্সবাজারে কখনো আসব না।
Ñরাখো তোমার কথা দেয়া। এমন মানবতার কাজে তোমাকে বাধা দিতাম ভাবলে কী করে! আমি হৃদয়হীনা নই।
Ñমারহাবা।
Ñধুর মারহাবা। আগে জানলে আমিও তোমাদের সাথে যেতাম। সর্বহারা ওই অসহায়দের জন্য প্রতিনিয়ত মন কাঁদে আমার।
Ñসত্যি আসতে! না ফান করছ?
Ñকিসের ফান! ওদের এই খারাপ সময় নিয়ে ফান চলে না। আমি অবশ্যই আসতাম। তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনি এরদোগান পর্যন্ত আসতে পেরেছেন, আর আমি নিজের দেশে থেকেও যেতে পারলাম না। এ যে লজ্জার কথা।
Ñসত্যিই তাই। যা হোক রুবি। পরে কথা হবে। আমরা কাল টেকনাফ যাচ্ছি। নাফ নদী পেরিয়ে যারা ওখানে আসছে, কাল তাদের জন্য ত্রাণ নিয়ে যাবো।
দু’জনের কথা বলা শেষ হলেও অস্থিরতা কমে না রুবির। কামরুলের সাথে সেও যদি রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে পারত, তবে নিজেকে বড় ধন্য মনে করত সে।
আমিশাপাড়া, রাজু ফার্মেসি, নোয়াখালী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.