যাপিত জীবন জীবনের বাঁকে বাঁকে

রায়হান রাশেদ

‘এই মামা, হাউজ বিল্ডিং যাইবা।’
‘ওঠেন স্যার’।
কসাই বাড়ি রেলগেট থেকে প্রতিদিন রিকশায় চড়ে হাউজ বিল্ডিং যাতায়াত করেন রাজিব। তিনি একটা বহুজাতিক প্রাইভেট কোম্পানির সহকারী ম্যানেজার। ভালো মাইনে পান। দুই সন্তানকেই পড়াচ্ছেন উত্তরার হাইস্কুুলে। বড় মেয়ে ক্লাস নাইনে আর ছেলেটা ক্লাস সিক্সে। দামি ফ্ল্যাটে থাকেন। দামিদামী রেস্তোরাঁয় খেতে যান সপ্তাহ পরপর। ভালোই চলছে সাংসারিক জীবনযাপন। অথচ রাজিব অন্তরের চোখ দিয়ে দেখে এসেছে একটা সংগ্রামী মানুষের জীবন। টানাপড়েনের এক সংসার। বাবার সামান্য ক’টা টাকা রোজগারে চলত ছয়জন মানুষের জীবন। ভাইবোনদের চাহিদাগুলো পূরণ হতে সময় লাগত বেশ। দুই মাস, তিন মাস, কখনো ছয় মাস। আর আজ তার সন্তানদের চাহিদা এক-দুই দিনের ভেতরেই পূরণ হয়ে যায়। আহ্, মানুষ এক জীবনে কত জীবনের সাক্ষী হয়! কত কিছুর পালাবদল দেখে!
টুং টাং শব্দ করে রিকশা এগিয়ে চলছে। রাস্তায় গাছের ছায়াগুলো আলপনা আঁকছে। কয়েকজন মানুষ হাঁটছে। কোথাও কোথাও ছাত্ররা বসে আছে রাস্তার পাশের উঁচু জায়গাতে। সারি বাধা বিল্ডিংয়ের ভেতরের রাস্তায় ধীরে ধীরে রিকশা চলছে। প্যাডেলে পরছে মন্থরগতিতে এক বয়স্ক পা। পায়ের চামড়াতে ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে। মুখে সাদা কাশফুলের মতো লম্বা দাঁড়ি। রাজিব নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করে মামার অবস্থা। মামার নাম মহব্বত আলী। নোয়াখালীর বাসিন্দা। এক বছর ধরে ঢাকায় আছে। কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছে রিকশা চালানো। এতদভিন্ন কাজ ঢাকা শহরে মিলানো বেশ কঠিন। রিকশা চালানোটা সহজে মিলানো যায় ঢাকার এ টাকার শহরে। থাকেন এক সিএনজি গ্যারেজে। গ্যারেজের পাশের খালার সস্তা হোটেলটায় ৪০ টাকা রোজ তিন বেলা ডাল-ভাত খান। মাস দুয়েক পর বাড়িতে যান। বাড়িতে প্রিয় গিন্নি আর দুই সন্তানওয়ালা এক বিধবা মেয়ে আছে। গত বছরের এক বৈশাখ মাসে ট্রেন কাটায় মারা গেছে মেয়ের জামাতা। সেই থেকে মেয়েটা তার কাঁধে। ছেলে একটা যা ছিল; সে এখন বউয়ের করতলগত। ভিটেবাড়ি করেছে নতুন বাবার বাড়ি। মানে শ্বশুর মশাইয়ের বাড়ি। আর এ দিকে আমাদের মহব্বত মিয়া বেছে নিলেন রিকশায় প্যাডেল মারা। এভাবে দিন দিন বৃদ্ধ মানুষটাকে মৃত্যুর দিকে এক ধাপ ঠেলে দিচ্ছে সাধের রিকশা। শেষ বয়সে মানুষের শরীরে শক্তিইবা কতদূর থাকে। কেমন যেন শিশুদের মতো হয়ে যায়। সময়ের সাথে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে জীবনে বেঁচে থাকার ভাবনাগুলো।
মহব্বত মিয়ারা সংগ্রাম করে চলছে দেশের বিভিন্ন পথে পথে। যে জীবনে তাদের অবসরে সময় কাটান অপরিহার্য সে সময়ে তারা যুদ্ধ করছে জীবনের সাথে জীবন দিয়ে। অথচ এই সহজ-সরল লোকগুলোর সাথে আমাদের দেশের সন্তানরা খারাপ আচরণ করছে। উপহাস করছে তাদের নিয়ে। কখনো হাত তুলতেও দ্বিধা করে না।
রাজিব ১৫ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা দিয়ে অফিসের পথে নামে। ফুটওভার পার হতেই অফিসের বিল্ডিং। মহব্বত মিয়া তাকিয়ে থাকেন টাকার প্রতি। দীর্ঘশ্বাসে হৃদয়ের খুব গভীর থেকে উচ্চারণ করেন ‘হায়রে টাকা’।
রাজিবের মনটা ‘মনে’ নেই। উদাস উদাস লাগছে। পায়চারি করছে ছোট কক্ষের ভেতর। এই হাঁটছে, এই বসছে। আর মনে পড়ছে বাবার কথা। সেই রোদে পোড়া কৃষক বাবার কথা। আচ্ছা, রাজিবের বাবা যদি বেঁচে থাকতেন মাটির পৃথিবীতে, তাহলে তিনি কী করতেন? অবসরে জীবন কাটাতেন নাকি এখনো ক্ষেতখামারে কাজ করতেন? রাজিব কি চাকরির অজুহাতে বউয়ের হাত ধরে ঢাকা চলে আসতেন? না, সে এমনটা করত না! তাহলে মহব্বত আলীকে দেখে, বাবার কথা মনে পড়ছে কেন?

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.