প্রবীণ জীবন

শওকত আলী রতন

বার্র্ধক্য মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায়। বয়সের বিভিন্ন স্তর পার করে বার্ধক্যে উপনীত হলে মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। এ সময়ে তাদের প্রয়োজন নিঃসঙ্গতা কাটতে পরিবারের সদস্যের সহযোগিতা। বয়োবৃদ্ধ হলে মানুষ শিশুর মতো হয়ে যায়। তখন প্রতিটি মানুষ নিজেকে সুখী দেখতে চান। স্ত্রী-সন্তান আর আদরের নাতি-নাতনীদের সাথে নিয়ে আনন্দময় জীবন কাটানোর প্রত্যাশা থাকে সবার। কিন্তু এ জায়গাটিতে পারিবারিক স্বার্থ আর দ্বন্দ্বের কারণে বর্তমানে প্রবীণ মানুষেরা এক রকম কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। কারো জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। আবার অনেকে পরিবার থেকে ছিটকে আশ্রয় নিচ্ছে অভিশপ্ত কোনো বৃদ্ধাশ্রমে কিংবা প্রবীণ নিবাসে। মাঝে মধ্যেই পত্রিকার পাতায় দেখা যায় ছেলেরা তার বাবাকে রাস্তার পাশে রেখে ফেলে চলে গেছে। এমন করুণ পরিণতির খবর আমাদের অনেকের বিবেককে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। সারাটি জীবন যে মানুষটি তার মেধা আর প্রজ্ঞা দিয়ে একটি সংসারের হাল ধরে ছেলেমেয়েদের লালন-পালন করে বড় করে তোলেন সে-ই হয়ে যায় অবহেলার পাত্র। সময়ের পালাবদলে চোখের সামনে স্মৃতি হয়ে যায় জীবনের নানা রঙের দিনগুলো। সংসারের টানাপড়েন আর স্বার্থের দ্বন্দ্বে আপনজন থেকে দূরে সরে যেতে হয়। তার পরও এই প্রবীণ মানুষেরা সব কিছুই নীরবে সহ্য করেন সন্তানের সন্তান কিংবা পরবর্তী বংশধরদের জন্য। সবশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবীণ মানুষ রয়েছে। সংখ্যার দিক দিয়ে এ সংখ্যা প্রায় দেড় কোটিরও বেশি।
বর্তমানে আমাদের দেশে দ্রুততম সময়ে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপান্তর হওয়ায় প্রবীণরা বিভিন্নভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সন্তান মা-বাবাকে সাথে নিয়ে বাস করার ইচ্ছা পোষণ করলেও অনেক সময় স্ত্রীর অনিচ্ছায় ঝামেলা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সন্তানের অজান্তে ধীরে ধীরে বাবা-মা দূরের মানুষে পরিণত হয় তা ঝুঝে উঠতে পারে না। সম্প্রতি হিন্দি সিরিয়ালের কুপ্রভাবে মা-বাবাকে সন্তানের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হচ্ছে। অনেক প্রবীণ ব্যক্তি এ ধরনের ষড়যন্ত্র বিষয়টি আঁচ করতে পেরে অভিমানে দূরে সরে যান। অনেক ক্ষেত্রে নিজেকে পরিবারের সদস্যদের কাছে বৃদ্ধ মা-বাবাকে বোঝা মনে হলে বাধ্য হয়ে তাদের চোখের আড়ালে চলে যান। যার জ্বলন্ত প্রমাণ আমাদের দেশে গড়ে ওঠা বৃদ্ধাশ্রমগুলো। বৃদ্ধাশ্রমে অনেক অভিজাত শ্রেণীর মানুষের ঠাঁই হয়েছে। যাদের ছেলেমেয়েরা সুপ্রতিষ্ঠিত। আশ্রিত এমন মানুষ কখনোই নিজের বংশমর্যাদাকে ক্ষুণœ না করে সব কিছু গোপন করে যান। তার পরও বেরিয়ে আসে কষ্ট গাথা কিছু স্মৃতির কথা। তখন দুই চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে।
আমাদের দেশে অনেক পরিবারে দেখা যায় সন্তানের বিয়ে করার পর যার যার মতো আলাদা সংসার শুরু করেন। তখন বাবা-মা হয়ে যান পরিবারের বোঝা। মা-বাবাকে কে খাওয়াবে, কে পরাবে এ নিয়ে চলতে থাকে টানাপড়েন। এ নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয় বৃদ্ধ বয়সে। চলে দ্বন্দ্ব। আবার এমনও দেখা যায়, সন্তান অগাধ সম্পত্তির মালিক। দামি গাড়িতে দাপিয়ে বেড়ান আর থাকেন বিলাসবহুল বাড়িতে অথচ জন্মদাতা কিংবা জন্মধাত্রী মা-বাবাকে অযতœ অবহেলায় গ্রামের ফেলে রাখেন। তাদের খোঁজখবর নেয়ার সময়টুকুও থাকে না।
আবার এর বিপরীত চিত্র রয়েছে আমাদের দেশে। বাবা-মা যত অশিক্ষিত হোক বা যত অসচেতন হোক না কেন তাতে কিছু আসে-যায়না। মা-বাবাকে অমূল্য সম্পদ মনে করে নিজেদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রাখেন।
ঢাকার দোহার উপজেলার খালপাড় এলাকার আনছার আলীর বয়স প্রায় ৯৫ বছর। বয়সের ভারে অনেকটা ন্যূব্জ হয়ে পড়েছেন। শরীরে নানা অসুখ-বিসুখ জড়িয়ে ধরেছে। বয়োবৃদ্ধ বয়সে এসে তাকে জীবনের বাকিগুলো কিভাবে কাটবেন এ নিয়ে সীমাহীন ভাবনার মধ্যে পড়তে হয়েছে। একরকম জীবনের দুঃসময় পার করছেন তিনি। একসময় তাঁতে বোনা লুঙ্গির ব্যবসায় করতেন আনছার আলী। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দোহারের তৈরি বিখ্যাত তাঁতের লুঙ্গি বিক্রি করে স্ত্রী, ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখের জীবনযাপন করতেন। বৃদ্ধ বয়সে এসে কোনো রকম দিন পার করলেও এই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। জীবনের কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। দুই বেলা দুই মুঠো ভাতের জন্য অগ্নিপরীক্ষায় পড়েছেন। আনছার আলীর ছয় সন্তানের মধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে আরো অনেক আগেই। ছেলেরা বিয়ে করে যার যার মতো আলাদা সংসার শুরু করায় আনছার আলী ও তার স্ত্রী ছমিরননেছা যেন এই বয়সে পরিবারের বোঝা হয়ে আছেন। সংসারের টানাপড়েন আনছার আলীর ঠাঁই হয়েছে বড় ছেলের কাছে আর ছমিরননেছার অন্য এক ছেলের কাছে। আনছার আলী জানান, দৃষ্টিশক্তি কমে গেছে। শরীর দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। চলাফেরা করতে পারি না। বৃদ্ধ বয়সে এসে জীবনের মূল্য দিতে হচ্ছে। বেঁচে থাকার রসদ নেই তবু বেঁচে আছি। একসময় এই হাত দিয়ে অনেক আয় রোজগার করেছি। কিন্তু এখন সামান্য টাকার জন্য অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। অসুখ হলে চিকিৎসা করাতে পারি না। অযতœ কাটছে তাদের বর্তমান দিনকাল। এমন দিনের কথা জীবনে কখনো কল্পনা না করলে কঠিন বাস্তবতার মধ্যে চলছে তাদের জীবন।
অন্য দিকে মা বৃদ্ধ হওয়ার পরিবারের মধ্যমণি হিসেবে সবার আদরে থাকেন এমন পরিবারে সংখ্যা কম হলেও এখনো টিকে আছে কিছু পরিবার। নিজের জীবনের মতোই মাকে ভালোবাসেন বাবা-মাকে। পরম মমতা আর যতেœ রাখেন তাদের। দোহার উপজেলার রাইপাড়া ইউনিয়নের লক্ষ্মীপ্রসাদ গ্রামের মো: আলমের পরিবারে তার মা আয়েশা আক্তারের বয়স ১০৫ বছরের ওপরে হলেও এখনো তিনি পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। বড় ছেলে আলমের বয়স ৭০ বছর। বাবা মারা গেছেন আরো অনেক আগেই। তাই মা যাতে কোনো কষ্ট না পান সে জন্য সবই তিনি করেন। ছেলের বউ নাতি-নাতনী সবার চোখে তিনি সমান। ১৯৯৮ সালে মায়ের চিকিৎসার জন্য হালের গরু বিক্রি করে মায়ের চিকিৎসা করেন।
১৯৯১ সাল থেকে বিশ্ব প্রবীণ দিবস পালন হয়ে আসছে। প্রবীণদের উন্নয়নের জন্য যুগোপযোগী কোনো উদ্যোগে চোখে পড়েনি। প্রবীণদের জন্য দরকার নিরাপদ বাসস্থান ও মৌলিক চাহিদা পূরণ। প্রত্যেক প্রবীণ যেন পরিবারের অন্য সদস্যদের মতোই বাস করতে পারেন এ ধরনের নিশ্চয়তা। প্রবীণ বা বয়স্ক ব্যক্তিরা সম্মানিত। তারা দ্বিতীয় শিশু। আমাদের মনে রাখা উচিত, আজ যারা প্রবীণ তারাও অতীতে তার পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির কল্যাণে অনেকেই অনেক কিছু করে গেছেন। তাদের যেন কোনো রকম অবহেলা করা না হয়। আমরা যারা নবীন তারা যেন ভুলে না যাই যে, আমাদেরও এক দিন এ অবস্থায় উপনীত হতে হবে। আজ যদি আমরা তাদের প্রতি অবহেলা করি, তাহলে আমাদেরও এ রকম অবহেলার শিকার হতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রবীণরা অবহেলিত, উপেক্ষিত, সমাজে ও পরিবারে অনেকের কাছে বোঝাস্বরূপ। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের সবার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া অবশ্য কর্তব্য। বিশ্ব প্রবীণ দিবসে সবার প্রত্যাশা বাবা-মা ও কিংবা প্রবীণেরা পরিবারের বোঝা নয় এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই। সারা বিশে^র প্রবীণেরা করুণা নয় মর্যাদার সাথে পরিবারের একই প্লাটফর্মে থেকে জীবন অতিবাহিত করুনÑ এটিই হোক বিশ্ব প্রবীণ দিবসের জয়গান।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.