৩ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত
৩ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত

৩ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত

প্রফেসর ড. এ কে এম আব্দুল্লাহ

বিশ্বের অনেক দেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে। এটি ২৩তম বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষক সমাজের মর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশেষ আন্তঃরাষ্ট্রীয় সরকার সম্মেলনে প্রণীত হয় শিক্ষকদের মর্যাদা অধিকার ও কর্তব্যবিষয়ক ঐতিহাসিক ইউনেস্কো আইএলও সুপারিশ-১৯৬৬। সময়ের প্রয়োজনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৬৭টি রাষ্ট্র শিক্ষক সম্প্রদায় তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় দিনটিকে প্রতিবছর অন্তত ২৪ ঘণ্টার জন্য হলেও স্মরণীয় করে রাখার জন্য ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘাষণা দেয়ার জন্য ইউনেস্কোকে অনুরোধ জানানো হয়। ১৯৯৪ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক সংগঠনের তৎকালীন মহাপরিচালক ড. ফ্রেডারিক অ্যান্ড মেয়র কর্তৃক ঘোষিত হয় ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এরপর ১৯৯৫ সালের ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার এবং শিক্ষক সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে পালন করে বাংলাদেশ প্রথম বিশ্ব শিক্ষক দিবস।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজ যে মুহূর্তে শিক্ষাকে কেন্দ্র করে আমরা বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করছি ঠিক সে মুহূর্তে মিয়ানমারের তিন লক্ষাধিক শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। শুধু কি তাই? পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের নারকীয় তাণ্ডব ও অমানবিক নির্যাতন, যা আইয়ামে জাহেলিয়াকে হার মানিয়েছে। মানব ইতিহাসে মানুষের ওপর মানুষের এমন নিষ্ঠুর নির্যাতন ও পাশবিক অত্যাচার কেউ চালিয়েছে কি না জানা নেই। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার মধ্যে তিন লক্ষাধিক শিশু রয়েছে। সেনাবাহিনী তাদের পিতা-মাতাকে হত্যা করেছে। এতিম এই শিশুরা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে ইউনেস্কো আইএলওসহ বিশ্বের সব মানুষ ও সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের আহ্বান এই তিন লক্ষাধিক শিশুকে তাদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। তাদের বাঁচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি শিক্ষার মৌলিক চাহিদার প্রয়োজনীয়তা মেটাতে আজ বিশ্ববাসীকে এগিয়ে আসতে হবে। না হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের যথার্থতা ব্যর্থ হবে। কারণ আমরা শিক্ষক, আমাদের মূল চালিকাশক্তি এই শিশুরা। যারা আগামী বিশ্ব পরিচালনার ভার হাতে নেবে। আমরা যদি তাদের শিক্ষার ন্যূনতম অধিকার না দিতে পারি আমাদের এই বিশ্ব শিক্ষক দিবসের সফলতা ম্লান হয়ে যাবে।

এ দিবসের আলোচনা করতে গেলে প্রশ্ন জাগে এত সংগ্রাম এত ত্যাগের বিনিময় অর্জনটা কী? বিশ্ব শিক্ষক সমাজের অবস্থান আর বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষক সমাজের অবস্থান কোন পর্যায়ে রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বের সব সমাজেই শিক্ষকদের মর্যাদা দিয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষকরা অবহেলার পাত্র। তারা অর্থনৈতিক, সামাজিকভাবে অবহেলিত। নির্বাহী বা প্রশাসনিক ক্ষমতা না থাকায় তাদের মর্যাদাও প্রতিষ্ঠা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রটোকলের দিক দিয়ে তারা সব সময় উপেক্ষিত। বাংলাদেশের প্রায় ৯০ ভাগ শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করে আসছেন বেসরকারি শিক্ষকরা। অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি বা সদস্য রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের বেশির ভাগই অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত অথচ তারাই খবরদারি করেন জাতিগঠনের কারিগর শিক্ষকদের ওপর। দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে ১৯৮০ সালে সর্ব প্রথম জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করে বেতনের ৫০ ভাগ সরকারি কোষাগার থেকে দেয়া শুরু করে, ১০০ ভাগ পর্যন্ত মূল বেতন পেতে সিকি শতাব্দীর চেয়ে বেশি সময় লেগেছে। এ যাবৎ শিক্ষকরা বাড়িভাড়া ভাতা হিসেবে পেয়ে আসছেন ১০০ টাকা। বর্তমান সরকার ১০০ টাকার স্থলে ৫০০ টাকা ও মেডিক্যাল ভাতা ১৫০ টাকার স্থলে ৩০০ টাকা করেছে। কোনো বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট আগেও দেয়া হয়নি, বর্তমানে নতুন জাতীয় স্কেলেও নেই। এ ছাড়া সবচেয়ে অমর্যাদার বিষয় হচ্ছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দেয় অর্থ অনুদানসহায়তা বলে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। অথচ ২৪/০৮/২০০০ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষাসচিব এবং সব শিক্ষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের যৌথ সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে জুলাই ২০০০ সাল থেকে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের প্রারম্ভিক স্কেলের শতকরা ৯০ ভাগ সরকারি অংশ হিসেবে প্রদান করা হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আজ পর্যন্ত তা কার্যকর করা হয়নি। অবিলম্বে সরকার কর্তৃক দেয় অর্থকে অনুদানসহায়তা না বলে বেতনের সরকারি অংশ হিসেবে পরিপত্র জারি করতে হবে।

মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষার প্রয়োজন। শিক্ষা ছাড়া শ্রমদক্ষতা উন্নয়ন সম্ভব নয়। শ্রম দক্ষতার পূর্বশর্ত শিক্ষা সে জন্য পৃথিবীর সব দেশে শ্রমদক্ষতা উন্নয়নের জন্য সাধ্যমতো শিক্ষায় বিনিয়োগ করছে। যেমন সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, কিউবা তাদের বাজেটের একটা বড় অংশ ব্যয় করে শিক্ষায়, বাংলাদেশের চেয়ে দরিদ্র অনেক দেশও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে অনেক এগিয়ে আছে।

তবে এ কথাও স্বীকার করতে হবে শিক্ষাক্ষেত্রে একেবারেই যে উন্নতি হয়নি তা নয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে যেমন শিক্ষানীতি প্রণয়ন, সময়মতো বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক তৈরি, ডিজিটাল ক্লাসরুম স্থাপন, ই-বুক প্রণয়ন, নারী শিক্ষার প্রসার, মাদরাসা শিক্ষা আধুনিকীকরণ, কারিকুলামের আধুনিকায়ন, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি প্রবর্তন সর্বোপরি প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ইত্যাদি। শিক্ষাক্ষেত্রে উপরিউক্ত অগ্রগতি অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সবচেয়ে প্রয়োজন যে বিষয়টি তা হলো শিক্ষাবিষয়ক সব কিছুর মূল নিয়ামক যারা অর্থাৎ শিক্ষক সমাজ। সেই শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে মাথা না ঘামালে উপর্যুক্ত সব অর্জনই নিষ্ফল ও অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবি মেনে নিয়ে বেতন-মান-মর্যাদা বাড়াতেই হবে।

আমরা চাই শিক্ষাঙ্গনে যেন শিক্ষার পরিবেশ বজায় থাকে। শিক্ষকরা তাদের মর্যাদা অধিকারের জন্য আন্দোলন করতে না হয়। আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বিশ্বের অন্যান্য শিক্ষকের মতো বাংলাদেশের শিক্ষকরাও যেন তাদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে এটাই প্রত্যাশা। 

লেখক : মহাসম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত)
বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি- বাকশিস

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.