মুসলমান হওয়ায় বঞ্চিত হচ্ছি ; নেয় স্যান লুইন

ডয়েচে ভেলে

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়নের ছবি দেখলে চোখের পানি আটকে রাখতে পারেন না নেয় স্যান লুইন। জার্মানিতে নির্বাসিত এই ব্লগার স্বজাতির দুর্ভোগের কথা গোটা বিশ্বকে জানানোর চেষ্টা করেন। তবে প্রবাসে থাকলেও জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত তিনি।
স্নিকার, জিনস, শার্ট এবং জ্যাকেটের সাথে ফ্যাশনেবল চশমাও পরেন তিনি। ফ্রাঙ্কফুট্রের ট্রেন স্টেশনে আরো হাজারো মানুষ থেকে তাকে আলাদা করা মুশকিল। জার্মানির অন্যতম ব্যস্ত এই শহরে বসবাসরত অসংখ্য চাকরিজীবীর ভিড়ে তিনিও হারিয়ে যেতে পারেন অনায়াসে। রোহিঙ্গা ব্লগার নেয় স্যান লুইনকে সাদা চোখে দেখলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাথে তার কোনো মিল খুঁজে পাবেন না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তিনি তাদেরই একজন।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ১৯৭৮ সালে জন্ম নেয়া লুইনের ছোটবেলা কেটেছে ইয়াঙ্গুনে। যে সময় তার জন্ম, তখন মিয়ানমার সরকার অনেক রোহিঙ্গাকে নিজের দেশের মানুষ মনে করত। নেয় সেই দলের একজন। মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে সে দেশের পাসপোর্ট ছিল তার। সুযোগ পেয়েছেন উচ্চশিা গ্রহণের। তবে ১৯৮২ সালের পর থেকে তার স্বজাতির প্রতি যে বৈষম্য করা হচ্ছে সেটাও উপলব্ধি করেছেন তিনি।
মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বসবাস কয়েক শতক ধরে, যদিও সে দেশের সরকার সেটা মানতে রাজি নয়। বৌদ্ধপ্রধান দেশটিতে তাই রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রহীন, বাঙালি অভিবাসী হিসেবে বিবেচিত। অথচ ১৯৮২ সালের আগ পর্যন্ত পরিস্থিতি এখনকার মতো ছিল না। লুইন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘১৯৮২ সালে মিয়ানমার যে নাগরিকত্ব আইন অনুমোদন করে সেখানে নয়টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়। সেই সম্প্রদায়গুলোর একটি রোহিঙ্গা।’
ষোল বছর ধরে নির্বাসনে
ইয়াঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি পড়ার সময় থেকেই রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হন লুইন। লেখাপড়া শেষে ২০০১ সালে সে দেশের পাসপোর্ট নিয়েই চাকরি করতে চলে যান সৌদি আরবে। সেখানে একটি নির্মাণ সংস্থায় ম্যানেজার হিসেবে চাকরি নেন। পাশাপাশি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের দাবিতে ইন্টারনেটে লেখালেখিও চালিয়ে যান। এ েেত্র তাকে সহায়তা করেছেন তার বাবা। ২০০৫ সালে তিনি চালু করেন রোহিঙ্গাব্লগার ডটকম নামের একটি ব্লগসাইট। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকারের দমনপীড়ন এবং সিস্টেমেটিক নির্যাতনের কথা প্রকাশ করা হয় এ ব্লগসাইটে। এটি এখন বছরে এক কোটিবারের মতো পড়া হয়।
নেয় স্যান লুইনের ব্লগার জীবন মিয়ানমারের সরকারের চোখে পড়তে বেশি সময় লাগেনি। ২০০৯ সালে নিজের পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে টের পান, সে দেশের সরকার তার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করেছে। ফলে অন্যান্য রোহিঙ্গার মতো লুইনও পরিণত হন রাষ্ট্রহীন মানুষে। এ অবস্থায় সৌদি আরবে বসবাস দুরূহ হয়ে পড়ে তার জন্য। ফলে ২০১১ সালে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন জার্মানিতে।
একটি ব্লগ, একটি দায়িত্ব
‘এক শ’র বেশি ব্লগারের একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করি আমি। তারা মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার খবর পেলে তা সাথে সাথে যাচাই করেন এবং ছবি, ভিডিও সংগ্রহ করে আমার কাছে পাঠান। এরপর আমি তা ইন্টারনেটে প্রকাশ করি, ‘ডয়চে ভেলেকে বলেন লুইন। তার এ নেটওয়ার্কের অনেক সদস্যই বাস করেন মিয়ানমারে, বিশেষ করে রাখাইনে। যেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর সে দেশের সেনাবাহিনীর সর্বশেষ অভিযান চলছে। এই অভিযান থেকে বাঁচতে প্রায় পাঁচ লাখের মতো রোহিঙ্গা গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
বাংলাদেশগামী শরণার্থীদের ছবি দেখলে চোখের জল আটকে রাখতে পারেন না লুইন। তিনি বলেন, ‘রাখাইনে ছোট ছোট শিশুদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে বা জবাই করা হয়েছে, এমন রিপোর্টও প্রকাশ হয়েছে। এমন পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে এক কাপড়েই বাংলাদেশের দিকে ছুটছেন আমার স্বজাতিরা। তারা আশা করেন, সে দেশে বেঁচে থাকতে পারবেন। কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ কেউ জানে না।’
রোহিঙ্গাদের এ করুণদশা সত্ত্বেও মিয়ানমারের শান্তির প্রতীক অং সান সু চির নীরবতা লুইনকে কষ্ট দেয়। সু চির মতার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও তিনি সচেতন। তা সত্ত্বেও একটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে যেটুকু মতা সু চির প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে তাও তিনি রোহিঙ্গাদের বাঁচাতে করছেন না বলে মনে করেন লুইন।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযান আন্তর্জাতিক সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জার্মানিসহ নানা দেশে এ ঘটনার প্রতিবাদ হচ্ছে দেখে সন্তুষ্ট লুইন। তিনি মনে করেন, শুধু আন্তর্জাতিক স্তর থেকে চাপ দেয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে পুনর্বাসন সম্ভব হতে পারে। তাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব না দেয়া পর্যন্ত এই সঙ্কটের সমাধান হবে না বলে মনে করেন নির্বাসিত এই ব্লগার। প্রশ্ন হচ্ছে, মিয়ানমার সরকার আদৌ কি তা করবে? হ

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.