লাস ভেগাসে হামলার দায় কার?

আলমগীর কবির

সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের শক্তি কতটুকু? কারা এর অর্থ জোগানদাতা? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়ে অনেক মতবিরোধ থাকলেও বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বড় কোনো ঘটনা ঘটলে, এর দায় যখন আইএস স্বীকার করে নেয় তদন্ত কর্মকর্তরা চোখ বুঝেই তা বিশ্বাস করেন এবং ঢালাওভাবে মুসলমানদের দিকে অভিযোগের তীর ছোড়েন। পরবর্তী সময় ওই তীরের আঘাত নীরবে সহ্য করতে হয় বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলমানদের। যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা অঙ্গরাজ্যের বিলাসবহুল শহর লাস ভেগাসে একটি কনসার্টে বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলিতে কমপক্ষে ৫৯ জন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি আহত হওয়ার পর হিসাব নিকাশটা অন্যভাবে করা হচ্ছে। অন্তত ঘটনার দায় আইএস তাদের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম ‘আমাক’-এ বিবৃতি দিয়ে স্বীকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই) এটাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয়ার পর সেটাই মনে হচ্ছে।
এফবিআই বলেছে, হামলাকারী হিসেবে ৬৪ বছর বয়সী স্টিফেন ক্রেইগ প্যাডক নামে যে ব্যক্তিকে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হয়েছে তার সাথে আইএসের কোনো যোগসূত্রের তথ্য তাদের কাছে নেই। প্যাডকের ভাই এরিক প্যাডকও বলেছেন, তার ভাইয়ের কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না। সেই সাথে তার কোনো মানসিক সমস্যাও ছিল না বলে জানিয়েছেন এরিক।
তবে এরিক প্যাডক সাংবাদিকদের বলেছেন, তাদের বাবা ছিলেন একজন ব্যাংক-ডাকাত। এফবিআইয়ের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় তার নাম ছিল। একবার জেল পালানোর ইতিহাসও তার ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ ১৯৬৯ সালে একটি পোস্টার বের করে, যাতে প্যাট্রিক বেঞ্জামিন প্যাডককে ধরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছিল, সে মনোবিকারগ্রস্ত একজন অপরাধী। অরল্যান্ডোতে নিজের বাড়িতে এরিক প্যাডক বলেন, তার ভাইকে যে ঘটনার জন্য দায়ী করা হচ্ছে, তাতে তাদের পরিবার স্তম্বিত। স্টিভেন এ ধরনের কাজ কেন করতে যাবেন, তার কোনো যুক্তি তারা খুঁজে পাচ্ছেন না। এরিকের ভাষায়, ‘সে এমন একজন মানুষ যে ভিডিও পোকার খেলতে ভালোবাসত, সাগরে ঘুরে বেড়াত, টাকো বেলের বারিটো খেতো।’ ভাইয়ের দাবি, স্টিভেন অস্ত্রবাজ কোনো লোক ছিল না, তার কোনো মিলিটারি ব্যাকগ্রাউন্ডও ছিল না। তাদের দাবি, আসল হামলাকারী হয়তো পালিয়ে গেছে। সম্প্রতি কয়েক লাখ ডলার দানের বড় কয়েকটি জুয়ায় অংশ নেন স্টিভেন প্যাডক। তবে খেলায় তিনি হেরেছেন না জিতেছেন সে তথ্য জানা যায়নি।
তার আরেক ভাই ব্রুস প্যাডক এনবিসি নিউজকে বলেছেন, আবাসন খাতের বিনিয়োগকারী স্টিভেন ছিলেন একজন কোটিপতি।
সামরিক সরঞ্জাম তৈরির ব্যবসায় থাকা কোম্পানি লকহিড মার্টিন জানিয়েছেন, তিন দশক আগে তাদের আগের মালিকের এক কোম্পানিতে কাজ করেছিলেন স্টিভেন প্যাডক। মামুলি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন ছাড়া তার আর কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার রেকর্ড নেই বলে লাস ভেগাস পুলিশ জানিয়েছে। প্রশ্নবোধকটা এখানেই, তাহলে এই হামলার ঘটনা কেন ঘটল। আগেকার ঘটনাগুলো নিয়ে কর্তৃপক্ষের দায়সারা তদন্ত অর্থাৎ মুখস্তভাবে কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে ঘটনার মূল বিষয় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার যে চর্চা সেটারই কি প্রতিফলন এবারের হামলা? উত্তরটা হ্যাঁ, হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
তা ছাড়া প্রতিবারই যখন কোথাও বড় কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, তার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের চারদিকে আওয়াজ ওঠে, অগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্র করতে হবে। পাঁচ বছর আগে কানেকটিকাটের এক প্রাথমিক স্কুলে এক যুবকের এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে ২৬ জন শিশুর মৃত্যুর পর জোর আওয়াজ উঠেছিল এখনই একটা কিছু করতে হবে। গত বছর এক আফগান যুবক অরল্যান্ডোর এক নাইট কাবে গুলি চালিয়ে ৪৯ জন নারী-পুরুষকে হত্যার পর ফের সেই একই আওয়াজ উঠেছিল। এমনকি এই দাবি নিয়ে কংগ্রেস ডেমোক্র্যাটরা রাতভর আইনসভা কক্ষ ঘেরাও পর্যন্ত করে রেখেছিল। কিচ্ছু হয়নি। আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সারা দেশের বেশির ভাগ মানুষ একমত হলেও এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয় না, তার প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ‘গান লবি’। ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন বা এনআরএ আমেরিকার মানুষের অস্ত্র বহনের অধিকারের পক্ষে প্রধান গ্রুপ। কংগ্রেসের বিভিন্ন সদস্যকে প্রভাবিত করার জন্য এরা বছরে প্রায় ২৫ কোটি ডলার খরচ করে থাকে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে আগ্নেয়াস্ত্রের পক্ষে এমন প্রার্থীর পক্ষে তারা সরাসরি খরচ করেছে ৫ কোটি ২০ লাখ ডলার।
অস্ত্রের সাথে মার্কিন রাজনীতির সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের। ১৭৯১ সালে গৃহীত মার্কিন শাসনতন্ত্রের দ্বিতীয় সংশোধনীতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অস্ত্র বহনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশী বা বিদেশী যেকোনো সরকারের স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে নিজের আত্মরক্ষার জন্য ‘সুনিয়ন্ত্রিত’ মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্য হিসেবে প্রত্যেক নাগরিককে অস্ত্র বহনের অধিকার দেয়া হলো। সে প্রায় সোয়া ২০০ বছর আগের কথা। এখনো আমেরিকার আইনে একই অবস্থা বিরাজ করাটা বেমানান। কেননা এই ধরনের হামলা দেশটিতে নিয়মিত বিরতিতে ঘটছে। যদিও এবারের হামলায় মৃত্যের সংখ্যা অন্যবারের চেয়ে বেশি। এবারের ঘটনার পরও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলাকারীকে উন্মাদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কারণ তিনি মুসলিম নন, যা শুধু আমেরিকা নয় পুরো বিশ্বের জন্যই হতাশাজনক। হ

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.