গাজায় হামাস ও ফাতাহ নেতৃবৃন্দ
গাজায় হামাস ও ফাতাহ নেতৃবৃন্দ

হামাস-ফাতাহ ঐক্য ফিলিস্তিনে আশার আলো

আনিসুর রহমান এরশাদ

ঐক্যের পথে হাঁটছে ফিলিস্তিনের সবচেয়ে সক্রিয় দু’ইটি দল হামাস-ফাতাহ। ২০০৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর চলা দ্বন্দ্ব-বৈরিতার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বিলুপ্ত হচ্ছে হামাস সরকার। শুরু হতে যাচ্ছে ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধির নতুন অধ্যায়। রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিয়ে দুই দলের সঙ্ঘাত মীমাংসার অনেক উদ্যোগ ব্যর্থ হলেও এবারের সমঝোতার ঘোষণা ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগ্রামে আশার আলো জ্বালছে। দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক বিরোধের অবসান ঘটিয়ে ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা জাগ্রত হয়েছে।
ইতোমধ্যে ফাতাহর সাথে দীর্ঘ দিনের বিরোধ মেটাতে গাজায় সরকার বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছে হামাস। গাজায় নতুন নির্বাচনের আয়োজন, একসাথে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ এবং ফাতাহর সাথে আলোচনা শুরু করার সদিচ্ছাও জানিয়েছেন হামাস নেতারা। ফাতাহর নেতারাও গাজার প্রশাসনিক কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন দেয়ার ঘোষণাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদপে হিসেবে দেখছে।
ইসরাইল কর্তৃক ভূমি ও সমুদ্র অবরোধ আরোপ, গাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ধ্বংস করা, মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সুসম্পর্ক থাকায় আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকারের বৈরিতায় রাফা সীমান্ত বন্ধ হওয়া, ইসরাইলের সাথে তিনটি যুদ্ধ, গাজার ওপর ইসরাইলের আরোপিত অবরোধের কারণে মানবিক পরিস্থিতির অবনতি চাপে ফেলে দিয়েছে ইসলামপন্থী হামাসকে। এতদিন সিরিয়া, ইরান ও কাতারের সমর্থন পেলেও বর্তমানে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হামাসকে সমর্থন দেয়া বন্ধ করতে কাতারের ওপর ব্যাপক চাপ দিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাসের গাজায় অর্থনৈতিক নাজুক অবস্থা ও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বেকারত্বের হার, বিদ্যুতের জন্য অর্থ বরাদ্দ কমানো ও পানীয় জলের ভয়াবহ সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ায় মানবিক সঙ্কট এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বেতন দেয়া হবে না বলে মাহমুদ আব্বাসের ঘোষণায় হামাস কঠিন অবস্থায় পড়ে যায়।
জটিল পরিস্থিতির কারণেই ফিলিস্তিনে একটি অভিন্ন সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে একমত হয়েছে দুই দল। জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে দ্রুত পদপে গ্রহণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলছে। ফাতাহ নেতা ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপরে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের প্রস্তাবিত শর্ত মেনে নিয়েছে এবং শর্তানুযায়ী গাজায় হামাসের প্রশাসনিক কমিটি ভেঙে দিয়ে ছায়া সরকারের অবসান ঘটিয়েছে। নিজেদের শাসন শুধুই বিলুপ্তই করেনি, গাজায় ঐকমত্যের সরকারের প্রশাসনকে অনুমোদন করবে বলেও জানিয়েছে। সমঝোতার এ ঘোষণা কণ্টকহীনভাবে কার্যকর হবে, তার শতভাগ নিশ্চয়তা নেই। কেননা হামাস তাদের নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের হাতে ছেড়ে দিতে রাজি কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তারপরও গাজায় হামাসের প্রশাসন গুটিয়ে নেয়ার এই ঘোষণা ফাতাহ আন্দোলনের সাথে দীর্ঘ দিনের বিবাদ মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। পশ্চিম তীর ও গাজার মধ্যে সম্ভাব্য পুনর্মিলন ফিলিস্তিনের জাতীয় স্বার্থ সুরার পথকেই প্রশস্ত করবে। তবে হামাসের হাত থেকে গাজার নিয়ন্ত্রণ নিতে ফাতাহর আগ্রহের কারণ হচ্ছে- হামাস এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গাজা শাসন করলেও রামাল্লাভিত্তিক ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ গাজার সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন পরিশোধ করে যাচ্ছে, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যয়ও নির্বাহ করছে। ফিলিস্তিনি শহীদ ও কারাবন্দীদের পরিবারদের মাসোহারাও দিয়ে যাচ্ছে। আইনগতভাবে রামাল্লার ফিলিস্তিন সরকার গাজার অধিবাসীদের কর মওকুফ করেছে।
ফাতাহ আন্দোলনের সিনিয়র নেতা নাবিল শাথ বলেছেন, ইসরাইলের সাথে পাকাপোক্ত কোনো শান্তি আলোচনার জন্য ফিলিস্তিনি বিভিন্ন পরে মধ্যে ঐক্য সবচেয়ে বেশি জরুরি। আমাদের এখন পরস্পর পরস্পরকে দরকার। গাজা এবং পশ্চিম তীর ঐক্যবদ্ধ না হতে পারলে মূল সমস্যা মোকাবেলা খুবই কঠিন হবে। আর সেই সমস্যা হলো ‘ইসরাইলি দখলদারিত্ব’ এবং ‘হামাস সেটা জানে’। হামাসের এ অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে ফাতাহের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মাহামুদ আলাউল জানান, ‘এটি একটি ভালো লণ। পুনর্মিলন কার্যকর করার জন্য ফাতাহ আন্দোলনের আমরা প্রস্তুত আছি।’
হামাস-ফাতাহর প্রধান দ্বন্দ্ব হলো ইসরাইলকে নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা। শুরুর দিকে হামাস ইসরায়েলের অস্তিত্বই স্বীকার করেনি। ইসরাইলকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করাটাই সংগঠনের মূল ল্য ছিল। পরে ’৬৭-এর সীমানা মেনে রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেয়। ২০০৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং হামাসের অন্যতম প্রধান নেতা ইসমাইল হানিয়াহ বলেন, ‘হামাস ১৯৬৭ সালের সীমানাসহ ইসরাইলের সাথে দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্রবিরতি চুক্তিতে রাজি আছে।’ খালিদ মিশাল হামাসের প্রধান রাজনৈতিক নেতা হওয়ার পর ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রশ্নেও নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করতে শুরু করে হামাস। তিনি ২০১৩ সালে বলেন, ‘আমরা উগ্র হত্যাকারী নই, ইসরাইল-বিরোধীও নই। ইসরাইলের দখলদারিত্বের বিরোধী। এর অবসান ঘটাতে পারলে আমরা আমাদের নীতি-মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করব। সেই নীতি ও মূল্যবোধ গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং বহির্বিশ্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে অঙ্গীকারাবদ্ধ।’ ২০১৪ সালে বলেন, ‘ইসরাইলের সাথে আলোচনায় বসতে চাই। তবে সে েেত্র ইসরাইলের ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করতে হবে। আলোচনার কথা বলে আগ্রাসন চালালে সেটি তো মেনে নেয়া যায় না। হামাসের নতুন রাজনৈতিক দলিলে স্পষ্ট করে বলা হয়, হামাসের লড়াই জায়নবাদের বিরুদ্ধে। তা ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে নয়। সেখানে বলা হয়, ‘যে জায়নবাদী ইসরাইলি নাগরিকেরা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধেই লড়াই করছি আমরা।’
অন্য দিকে, ফাতাহ ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি করে পাশাপাশি থাকতে আগ্রহী যার কারণে তারা বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের সমর্থন পেয়ে আসছে। ২০০৬ সালে নির্বাচনে হামাস জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আরব রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনে সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছিল। ২০০৪ সালে আরাফাতের মৃত্যুর পর হামাস ও ফাতাহর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয় এবং সেটা চরম আকার ধারণ করে ২০০৬ এর নির্বাচনের পর ঐকমত্যের সরকার গঠন না হওয়ায়। নির্বাচনে জনতার নিরঙ্কুশ সমর্থন নিয়ে ১৩২টি আসনের মধ্যে ৭০টি আসনে বিজয়ী হয়ে ফিলিস্তিনের সরকার গঠন করেছিল হামাস; কিন্তু আব্বাসের স্বশাসন কর্তৃপরে অস্বীকৃতিতে ফাতাহর সাথে বিভেদ জোরদার হয় এবং সঙ্ঘাত তুঙ্গে ওঠে। ফাতাহ হামাসের সরকারে যোগদান থেকে বিরত থাকে। ইসরাইলও হামাস সরকারকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি হামাস-ফাতাহ জাতীয় ঐক্যের সরকার হলে সেই সরকারের সাথে শান্তি আলোচনায় যাবে না বলে জানিয়ে দেয় ইসরাইল।
২০০৭ সালে রক্তয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে ফাতাহ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীকে পরাজিত করে গাজার দখল নেয় হামাস। এই গৃহযুদ্ধের পর থেকে গাজা শাসন করেছে হামাস। অন্য দিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের প্রশাসন চালাচ্ছে ফাতাহ। মতার ভাগাভাগি নিয়ে হামাস ও ফাতাহর দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে গাজাকে অবরুদ্ধ করে রাখে দখলদার বাহিনী। ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক সঙ্কট দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হতে থাকে এবং আন্তর্জাতিক মহলে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার সপে জনমত গঠনে নানামুখী সমস্যা সৃষ্টি হতে থাকে। শুধু ফিলিস্তিনি নয় মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা গাজায় অবরুদ্ধ থাকবে না মানুষ। এখন হামাস-ফাতাহ আপসের মাধ্যমে যদি অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের দীর্ঘ মেয়াদি সমাধান হয়, নির্বাচনের নিশ্চয়তা বিধান হয়, একক বিজয়ী দলের মাধ্যমে গাজা ও পশ্চিম তীর শাসনের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে সেটা ফিলিস্তিনের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটাবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.