কবিতা প্রতিবাদী শিল্পকর্ম

বকুল আশরাফ

কবিতা কী লিখি? কেন লিখি? নাকি; কবিতা লিখা হয়ে যায়। কোনটি? কারণ দুটো লাইন মাথায় এলো; তো লিখে ফেলো। কষ্টবোধ, যত্রণাবোধ থেকে কিছু নতুন কষ্ট সৃষ্টি হলো; তো লিখে ফেলো। এভাবেই কবিতা গড়ে ওঠে মননের পৃষ্ঠায়। ডুবোচরের মতো প্রতিনিয়ত কবিতা গড়ে উঠতে থাকে। ছোট ছোট গঠিত চর থেকে পরবর্তিতে একটি বসতি, একটি জনপদের মতো কবিতার নিজস্ব পরিমণ্ডল গড়ে উঠতে থাকে। কবিতায় অফিসপাড়ার মতো জেগে ওঠার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। আয়োজন করে কবিতার সৃষ্টি হয় না। ভেতরকার অন্তর্নিহিত ভাবধারা সুনির্দিষ্ট ভাবনা জগৎ তৈরি করে বলেই কবিতা হয়ে ওঠে। কবিতা মানব অন্তরে কর্ষণের কাজ করে। অন্তর নিঙড়ানো উপলব্ধিই তো কবিতা। কবিতার মধ্যে একটি মানবিক হৃদয় বেঁচে থাকে, জাগ্রত থাকে। সে কারণে কবিতা মানুষের জন্য। কবিতা জীবনের জন্য। জীবন্ত মানবিক জীবনগাঁথা কবিতাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে বলেই কবিতা মানবমনের আকুতিকে আরো প্রাণবন্ত করে উপস্থাপন করে। কবিতা হয়ে যায় মানুষের। হয়ে যায় নির্যাতিত জনতার।
কবিতা কি মানবিকতা, মানব জীবনবোধের কতটুকু সৌন্দর্য কবিতায় লুকায়িত। কবিতা কি সমাজের চরিত্রকে পাল্টায়। সমাজকে নাড়া দেয়। ইতিহাসের কলমে ঐতিহ্যের পাশাপাশি কবিতাও তো সমান্তরালভাবে বয়ে চলে এসেছে, বয়ে চলবে ভবিষ্যতের পথে। কবিতা অমানবিকতার বিরুদ্ধে বলে, অরাজকতার প্রতিবাদ করে। যখন সামাজিক জীবনের চারদিক শূন্যতায় ঘেরা তখন কবিতা ফুঁসে ওঠে। কবিতাই প্রথম ছোবল বসায় স্বৈরাচারিক চরিত্রে। সমাজের অবয় কবিতার শরীর বেয়ে জনসমুদ্রের কাছে পৌঁছায়। শোষণের টুঁটিতেই প্রথম টান কবিতাই দেয়। কবিতা তাই দেয়ালে গেঁথে থাকে, সেøাগান হয়ে ঘুরে বেড়ায় জনতার কাতারে। কবিতার ডাকে জনগণ একত্র হয়, উত্তাল হয়, উদ্বুদ্ধ হয়। উজান থেকে ভাটিতে আসে। কবিতার আবেশে বিপ্লব অনুপ্রাণিত হয়। নিপীড়িত, নির্যাতিত, অবহেলিতদের ক্রন্দন নিয়ে কবিতা নয়, কবিতা গর্জন। গর্জে ওঠে কবিতা আকাশ-বাতাসে ধ্বনিত হয়। নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুতীক্ষè হাতিয়ার কবিতা। কবিতা দ্রোহে, ক্রোধে অগণিত দুর্বলের কণ্ঠস্বর। কবিতা সাহসের সোপান বেয়ে সঞ্চারিত হয়, অনুরণন তোলে ক্ষোভে, বিক্ষোভে। তাই কবিতা শোষিতের প্রাণচাঞ্চল্য, বঞ্চিতের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। কবিতা মহাজীবনের ডাক। সভ্যতায় অনুপ্রবেশকারীর ছাড়পত্র। সমাজের শ্রেণী-বৈষম্যকে সুনির্দিষ্ট করে সাম্যের ডাক দেয় কবিতা। সমমনস্ক যুগের প্রতিধ্বনি তুলে জাতিকে একত্র করে। কবিতার তিলকে তাই সাম্যের রঙ। রঙিন তাই কবিতার ভুবন। রঙেরছটায় আলোকিত মাত্রায় বর্ণময় ক্ষেত্র তৈরি করে কবিতা। কবিতারও সুনির্দিষ্ট সমাজ আছে। সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে কবিতার। সমাজ গঠনে কবিতা একা নয়, একত্রিত এক বিচ্ছুরণ। কবিতা তাই কর্মীর হাতিয়ার। বিনির্মাণের জোগান। শুদ্ধতার চরম পরিশীলিত শিল্প। কবিতা তাই মানবসমাজকে বাঁচিয়ে রাখে, জাগিয়ে রাখে। কবিতা স্পর্ধিত যৌবনের বোহেমিয়ান জাজ্বল্যমান উত্তেজনার স্বর। পৃথিবীর নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর।
অতীত থেকে বর্তমানে কবিতাই সর্বপ্রথম দাঁড়িয়েছে সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে। কবিতা সত্যের পথে কখনোই মাথা নত করেনি। সত্য সন্ধানে কবিতা চিরভাস্বর। বলিষ্ঠ উচ্চারণে শাসকের মুখোশ উন্মোচনকারী হচ্ছে কবিতা। কবিতার আঙুল দেখিয়ে দিয়েছে নির্যাতনের চিত্র। জীবন বাস্তবতার আরেক জীবনের নাম তাই ‘কবিতা’। অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে কবিতা।
কবিতা সন্ধানী সমন্বয়কারী। কবিতা যুগান্তরের দ্বীপশিখা, ভবিষ্যতের গন্তব্য। নির্ধারিত পথের বাঁক-বদল। কবিতা প্রবহমান, স্রোতোস্বিনী, খরস্রোতা দিক বদলের নির্দেশনা। কবিতা ইঙ্গিতময়তার তীর্যক তীরের ফলা। টানটান ধনুকের প্রাচুর্যে শান দেয়া শব্দের শরীর। প্রাণরসে কবিতা অনির্বচনীয়। নতুনত্বের আকুতি কবিতায় সর্বদা বিরাজমান, প্রথা ভেঙে বেরিয়ে যাওয়া স্বভাবে কবিতা অমলিন, চির উদ্ভাসিত। আধুনিকতাকে আরো আধুনিক রূপ দিয়ে কবিতা নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। উদ্বোধন করে সত্য ও সুন্দরের।
কবিতার কারণে বেঁচে থাকে প্রাণশক্তি, টিকেও থাকে। দুর্বিনীত চিৎকারে কবিতা মৌনতা ভাঙায়। জাগরণের বিভাবরী হয়ে রাতজাগা পাখির মতো সময় ধরে পথচলে। যুক্তিসিদ্ধ, বুদ্ধিদীপ্ত আচরণে কবিতাস্নায়বিক ধ্যানে মস্তিষ্কের জানালা খুলে দেয়। দশক থেকে শতকে, সমকাল থেকে মহাকালের পথেই কবিতার যাত্রা। কবিতা চিরকাল মানবাধিকারের পক্ষে লড়েছে।
জীবনের মৌলিক অনুভূতি, সংঘর্ষ, অন্তর্গত ভাবনা, অন্তর্নিহিত আবেগ, প্রবল প্রতীক্ষা, আকাক্সক্ষার চিত্রকল্প কবিতার মধ্যে জাগ্রত থাকে। কবিতা তাই হয়ে ওঠে সাহিত্যের সব শাখার ঊর্ধ্বে একমাত্র জীবনমুখী পাঠ। কবিতা পাঠকের উদ্বেলতার স্বরূপ, উপলব্ধির ব্যাখ্যা দিতে পারে তাই পাঠকের মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। পূর্ণতা অর্জন করার আকাক্সক্ষাই কবিকে কবিতায় সবল-সচল-নির্মল রাখে। মানুষের অস্তিত্বের স্বরূপকে বিকশিত, প্রতিষ্ঠিত ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে কবিতা। কবি কবিতা লিখে একজন কর্মীর ভূমিকা পালন করেন। তাই কবিতা আশা ও বিশ্বাসের শিল্প। কবিতা সৌন্দর্যের ভৌগোলিক বলয়। শব্দরাজির বিমুগ্ধ জাদুখেলা। কবিতা আবার সময়ের পরিশীলিত সহচর। কবিতা হৃদয়ের অপরিহার্য বিস্তৃত আকাশ। কবিতা গৌরবময় সৃষ্টির সচেতন রূপরেখা, সমাজের অভাবনীয় স্পষ্ট উচ্চারণ। এভাবে কবিতা ক্রমাগত জাতীয় চেতনায় রূপ নেয়। তাই কবিতা লেখার এত তাড়না। এত প্রাণ না।
মানুষের সভ্যতার ও ইতিহাসের নিগূঢ় বন্ধনের জায়গায় কবিতা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠুক সে প্রচেষ্টায় কবিতা লিখি। কবিতা ইতিহাসের সাথে বর্তমানের আধুনিকতার সংযোগ ঘটায়। কবিতা অতীতকে সর্বদা বর্তমান করে রাখে। ভবিষ্যৎকে নিয়ে আসে আজকের পাশে। সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক জঞ্জাল থেকে শান্তিতে থাকতে কবিতা সাহায্য করে। অপসংস্কৃতির হস্তক্ষেপ যখন বাড়াবাড়ি রকমভাবে চারদিক থেকে আগ্রাসন করে তখন কবিতাই হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ ও প্রতিবাদী ভাষা, তাই কবিতা লিখি। চিন্তা-চেতনার পর্যায়ক্রমিক যে সততার পথ তা নির্ধারণ করে কবিতা, তাই কবিতা লিখি। মানুষের জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধানের পটভূমিতে সততার পথটি নির্মাণ করে কবিতা তাই কবিতা লিখি।
কবিতা তো মননের চাষ, মানুষকে মানব ও প্রকৃতিপরায়ণ হতে সাহায্য করে। প্রকৃতির চারণক্ষেত্রে কবিতার একচ্ছত্র বিচরণ, তাই কবিতা লিখি। বলা যায় নিজেকে নির্মাণ করার জন্য কবিতা লিখি। নিজেকে অন্য কেউ করে তুলি। কবিতায় কখনো ভেঙে ফেলি নিজেকে, আবার ভেঙে জোড়া দেই। কবিতা যে জীবনের প্রস্ফুটিত বিজ্ঞান, রাসায়নিক রসবোধ, আবার জীবন ব্যাকরণ। কবিতার বীজ কি বপন করা হয়েছিল কোন এক কালে! দেহে না মননে। কে জানে। বিচারিক মানদণ্ড কই। তাই সরল জটিল সমীকরণের সবটুকুই কবিতার উপজীব্য বিষয়। হয়তো মানবজীবনের ব্যাকরণ রচনার জন্যই কবিতা লিখি। আসলে কবিতায় ব্যর্থতার কথা বলা যায়, তাই কবিতা লিখি। কবিতা যন্ত্রণার ভাষা হয়ে ওঠে, এই অন্তরজ্বালাকে প্রকাশ করার জন্যই কবিতা লিখি। লিখি মানে- বিশ্বব্যাপী মানুষ নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করার স্বপ্নে কবিতা লেখা হয়। দেশে দেশে কালে কালে অত্যাচারী শাসকদের রোষাণলে পুড়েছে মানুষ। এসব শাসকদের বিরুদ্ধে কবিতা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের বারূদ, তাই কবিতা লিখি। লিখা হয়ে যায়। এসে যায় কবিতার সুন্দর।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.