নির্বাক দৃষ্টি

দিল আফরোজ রিমা

গোসল সেরে বাড়ি ফেরে রফিক। মায়ের হাতে মাছের ঝুড়িটা এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘দেখ্ মা ভালো ভালো মাছ ধরছি। বউরে কইয়া দিস য্যান, ভালা কইরা পাক করে।’
রান্নাঘরের দাওয়া থেকে ঘোমটার ফাকে লাজুক চোখে স্বামীর দিকে একবার তাকায় শখিনা। দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হয় একটি ছ্ট্টো মুহূর্তে। শখিনা সলজ্জে চোখ নামিয়ে নেয়। নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়। শাশুড়ি ভানুমতি মাছের ঝুড়িটা শখিনার হাতে এগিয়ে দেয়। বলে, ‘ও বউ তরা কর। মাছ গুলান কাইটা ভালা কইরা বেশি বেশি ঝাল তেল দিয়া পাক কর। আমার পোলায় নিজের মুখে কইছে... রান্দাডা য্যান ভালা অয়। সক্কাল সক্কাল কত্ত সুন্দর মাছ লইয়া আইছে আমার পোলায়। তরা কইরা রান্দা শ্যষ কর। ওরে খাইতে দে।’
ঘরের ভেতরে একা একা পায়চারী করছে রফিক। মনে মনে ভাবছে, শখিনাডা কেমন জানি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু আধটু তো স্বামীর কাছে আইতে পারে। একবার আইলে কী অয়?
পদ্মার পাড়ের একটি ছোট্ট গরিব পরিবারের নতুন বউ শখিনা। স্বামী আর শাশুড়ি ছাড়া এ সংসারে আর কোনো সদস্য নেই। পনের দিন হয় শখিনা এ বাড়িতে এসেছে। পদ্মার পাড়ের অন্য গ্রামের মেয়ে সে। বাবা রহমত আলীও একজন গরিব কৃষক। জন্মের সময়ই শখিনার মা মারা যায়। বাবা দায়ে পড়েই আবার বিয়ে করে। রহমত আলীর মা-ই শখিনাকে ছোট থেকে লালনপালন করে বড় করে। দাদীর ভালোবাসা আদর পেয়ে আর সৎ মায়ের অকথ্য অত্যাচার সহ্য করে বড় হয় শখিনা। পড়াশোনা করা ভাগ্যে জোটেনি।
কিন্তু তার অদম্য উৎসাহ তাকে অক্ষর জ্ঞানটুকু দিয়েছে। রাতের বেলায় লুকিয়ে সে তার চাচাতো বোনের কাছে অ,আ,ক,খ চিনেছে। লিখতে শিখেছে। এমন করে সে যতটুকু শিখেছে তা থেকে সে এখন বই পড়তে পারে লিখতে পারে। রাতের বেলা লুকিয়ে সে তার সৎ বোন টিয়াকেও এতটুকু লেখাপড়া শিখিয়েছিল।
রান্না শেষ করে ঘরের দাওয়ায় খেজুর পাতার মাদুরটা বিছিয়ে দেয় শখিনা। এক এক করে খাবারগুলো সাজিয়ে দিতে দিতে সে স্বামীকে ডাকে, ‘এই যে শুনছো? ভাত বাড়তাছি। ক্ষুদা পাইছে তো কয়ডা ভাত খাইয়া লও।’
রফিক মুচকি হেসে খেতে বসে। খাবারগুলোর দিকে চোখ বোলায়। গরম ভাতের ভাপ উড়ছে। ভাতের মিষ্টি গন্ধে রফিকের মন ভরে যায়। পেয়ালায় সুন্দর করে রাখা কলমিশাক, মুলা দিয়ে পুঁটি মাছের তরকারি, লাল টকটকে বাইম মাছ ভোনা, ধইনা পাতার ভর্তা, চিংড়ির ভর্তা। খাবার দেখে রফিক অবাক হয়। এত সুন্দর করে রান্না আর এত পদ দিয়ে খাবার তাদের ভাগ্যে কখনো জোটেনি। রফিক অবাক হয়ে বলে, ‘বউরে এত খাবার তো সারা জনমেও দেখি নাই রে। তয় আইজকা পেট ভইরা খামুরে বউ। দে শিখগির থালাডা দে।’
স্বামীর তৃপ্তি ভরে খাওয়া দেখে শখিনা খুশি হয়। সে বলে, ‘একটু ভালা খাওনেরও দরকার আছে। তোমার শরীলডা বেশি ভালা নাই তাই একটু আধটু যতেœর দরকার।’
আইচ্ছা, তুই অত চিন্তা করতাছস কেন্ তোর মতো বউ থাকলে স্বামীর শরীল ভালা না থাইকা পারে? তয় মার দিকেও খেয়াল রাখিস। আর তুই? তোর ক্ষুদা লাগে না? তুই তো সারাক্ষণ কাম কাইজ নিয়াই ব্যস্ত। কোনো সময়তো খাইতে দেখি না। অহন আমার লগে খা।’
‘তুমি এইসব কী কও? মাইরে থুইয়া আমি খাইয়া লমু?’
‘মারেতো দেখতাছি না। কই গেছে?’
‘মা চারে পানি দেয়।’
‘তাইলে তুই আমার লগে ভাত খাবি না?’
‘না খামু না’।
রফিক দুষ্টু হেসে শখিনার মুখে ভাত পুরে দেয়। সে নিরুপায় হয়ে ভাতটুকু খেয়ে নেয়। সে মনে মনে খুশি হলেও বিরক্তির ভাষায় বলে, অসভ্য মানুষ কোথাকার। ‘মায় দেখলে কি অইতো’?
ভানুমতি কাজ সেরে এসে পিড়াটা এগিয়ে নিয়ে খেতে বসে। শখিনাকে বলে, বউ বেলা অইছে ভাত খা।’
ভানুমতি এত খাবার দেখে ভীষণ রেগে যায়। সে বলে, ‘বউ কার কাছে জিজ্ঞাস কইরা তুই এতগুলান পদ বানাইছস? বড় দুঃখের সংসার আমার। কত দিন শুধা মরিচ বাটা দিয়া ভাত খাইয়া থাকছি। তুই যদি এমন ধরনের অলক্ষিতা করছ আমার সংসার শ্যাষ অইয়া যাইব।’
শখিনা নিজের চোখের জল মুছে বলে, ‘মাগো আমার ভুল অইয়া গেছে। আমারে মাফ কইরা দেও মা। তয় বাইম মাছ আর পুঁটি মাছ আমি কাইলের জন্য জাল দিয়া রাখছি। মাছের লগে চার-পাঁচটা চিংড়ি আছিল তাই ভাইজা পেঁয়াজ-মরিচ দিয়া ভর্তা বানাইলাম। ডাটা খেতে কয়খান মুলাও আছিল। তাই আইনা পুঁটি মাছ পাক করছি মা। ঘরের পেছন দিকে বিলাতি ধইনার ম্যলা গাছ অইছে। ম্যলা ঘন অইছে। মধ্যে মধ্যে থিকা তুইলা খাইলে ধইনা গাছ আরো ভালা অইবো। গাছের গুঁড়ায় আলো বাতাস পাইবো।’
শখিনার কথা শুনে ভানুমতি খুশি হলো। বলল, ‘মা তুই আমার ঘরের লক্ষ্মী। এই গরিবের ছোট্ট সংসার তোর হাতেই তুইলা দিলাম। তুই যা ভালা বুজবি তাই করবি রে মা। তয় দরকার অইলে আমি তোরে সাহায্য করমু। তুই পারবি তো মা।’
শখিনা মনে মনে ভাবে, বাপের ঘরে বড় অভাব দেইখা আইছি। স্বামীর ঘরেও তাই। এই অভাব যে কইরা হোক দূর করতেই অইবো। তয় কি কইরাযে দূর করমু কিছুই তো জানি না। চেষ্টা তো করতেই অইবো।
ভানুমতির বাড়ির চারিদিকে কিছু ফলের গাছ রয়েছে। বাড়িতে কোনো খাবার পানির ব্যবস্থা নেই। দূরের এক বাড়ির টিউবওয়েল থেকে ওরা খাবার পানির ব্যবস্থা করে।
শখিনা সারাক্ষণ ভাবে কিভাবে এ সংসারের উন্নতি করা যায়। একদিন দুপুর বেলা শাশুড়ির সাথে সে খেতে বসেছে। ভানুমতি লক্ষ করেছে শখিনা অন্যমনস্ক। খাওয়ার দিকে কোনো খেয়াল নেই। গুরুত্বও নেই। ব্যাপারটা কিছুক্ষণ লক্ষ করে ভানুমতি বলেই ফেলল, ও বউ কী অইছে? খাইতে ভালা লাগে না মা? শরীলডা কী খারাপ অইল?’
শখিনা হেসে বলে, না মা কিছু অয় নাই।’
‘তাইলে কী ভাবতাছ বউ?’
‘ভাবি কেমনে এ সংসারের উন্নতি করা যায়। তয় কোনো কূলকিনারা পাই না মা।’
‘আইচ্ছা মা আমি একখান কথা ভাবতাছি। বাড়ি তো কয়খান নারকেল আর খেজুর গাছ আছে। নারকেল আর খেজুর গাছের পাতা দিয়া পাটি বানাইয়া বাজারে যদি বিক্রি করা যায় তাইলে সংসারে কয়ডা পয়সার ব্যবস্থা অয়।’
‘ভালা কথা তো মা খুব ভালা অয়।’
‘রান্দাঘরের পিছন দিকে স্যাঁতসেঁতে জায়গাটা খালি পইরা আছে’।
‘ঐ জায়গায় তো রইদ নাই মা’।
‘মা রইদ ছাড়াও ম্যলা কিছু অয়। কিছু আলো বাতাস তো আছেই মাটির রসও আছে। ওতেই অইব। ঐ জায়গাডা সাফ কইরা আদা আর কচু লাগামু। সারা বছর আদা কিনতে অয়ব না। আর যদি বেশি থাকে বাজারে বিক্রি করমু। কত সময় রান্দার কোনো তরকারি থাকে না কচু থাকলে সুবিধা অয়ব।’
‘আমি তো কোনোদিন এতকিছু ভাইবা দেখি নাই। মা তোর যা মন চায় কর।’
কেটে গেল কয়েকটি মাস। শখিনার চেষ্টায় রফিক ও ভানুমতির সহযোগিতায় সংসারের অবস্থার বেশ পরিবর্তন ঘটেছে। বউ শাশুড়ি দু’জন মিলে নারকেল আর খেজুর পাতার পাটি বানায়। প্রতি মাসে দশ-বারোটা পাটি রফিক বাজারে নিয়ে বিক্রি করে। ভালো দাম পায়। বাড়ির ছোট একটু জায়গাও শখিনা বাদ রাখেনি। বাড়ির দক্ষিণ দিকে ঢালো জায়গাটায় লাউ শিম বরবটি ইত্যাদি সবজির গাছ লাগিয়েছে। ভাগ ভাগ করে মাচা বানিয়েছে।
শখিনার হাতের সোনার কাঠির ছোঁয়ায় ভরে উঠেছে লাউয়ের মাচা। ছোট বড় মাঝারি সাইজের কচি লাউগুলো সারিবেঁধে ঝুলে আছে। লাল-সবুজ পুঁয়ের মাচা কানায় কানায় ভরে গেছে। বরবটি আর শিমের থোকাগুলো বাতাসে দুলছে।
বাড়ির পাশে এক চিলতে ছোট্ট জমিতে ভাগ ভাগ করে আলু, বেগুন আর ফুলকপির চারা লাগিয়েছে সে। ঘরের পাশে একটা ছোট্ট কোনে বেশ রোদ লাগে সেখানে মাটি কুপিয়ে নরম করে ডাটার বীজ ছড়ানো হয়েছে। ক’দিনেই ঘন সবুজ রঙ ধারণ করেছে ছোট কোনটি। রান্নাঘরের পাশ ঘেঁষে চার পাঁচটি মরিচের চারা লাগাতেও ভোলেনি শখিনা। এসবের পেছনে দিন-রাত তিনটি মানুষ নিরলস পরিশ্রম করে যায়। এক সময় সবুজ শাকসবজিতে ভরে উঠে ছোট্ট বাড়িটা। প্রতিদিনের প্রয়োজন মিটিয়েও রফিক ঝাকা ভরে শাকসবজি বাজারে নিয়ে বিক্রি করে। হাতে নগদ টাকা পেয়ে মনের আনন্দে বাড়ি ফিরে। চলতে থাকে পাটি বুননের কাজও। প্রতিদিন সকাল বেলা রফিক নদীতে মাছ ধরতে যায়। কমবেশি কিছু মাছ নিয়েই বাড়ি ফেরে। দিনের খাবারের মাছ বাদ দিয়ে বাকি মাছগুলো বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে এখন সে আর আলসেমি করে না। বাড়িতে টিউবওয়েলের ব্যবস্থা হয়। সেনেটারি ল্যাট্রিনের ব্যবস্থা হয়। তিনজন মানুষের খাবারের অভাব হয় না। সারা দিনের পরিশ্রম রাতের পর্যাপ্ত ঘুম সব মিলে শরীর স্বাস্থ্য আগের চেয়ে অনেক ভালো। মনে আনন্দ আর সুখেই কাটছে ওদের দিনগুলো।
ইতোমধ্যে শখিনার গর্ভে সন্তান এসেছে। সন্তানের কথা ভেবে আরো কিছু করতে চায়। স্বামী এবং শাশুড়ির সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি বাছুর আর দুটো মুরগ-মুরগি কিনে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আয় বাড়াতে হবে তাই সবাই মিলে মনের আনন্দে বাছুর আর মুরগির যতেœ ব্যস্ত হয়।
কেটে গেল কয়েকটি মাস। শখিনার কোলে এলো এক ফুটফুটে ছেলে। রফিক ও ভানুমতির খুশি আর ধরে না। ভানুমতি খুশি হয়ে শখিনাকে বলে, মা গো তুই মোরে এত সুখ দিলি। এতদিন তুই কোথায় আছিলি রে মা? তোরে পাইয়া আমি সবই পাইলাম রে মা। আইজ আমার কোনো অভাব নাই। আল্লাহ এতদিনে আমার দিকে মুখ তুইলা চাইল।
বাড়ির চাহিদা মিটিয়ে ডিমও বাজারে বিক্রি হয়। সব টাকা-পয়সা রফিক ভানুমতির হাতে দেয়। ভানুমতি বউয়ের কাছে টাকা রাখতে পছন্দ করে। সে বলে, ‘ঘরের লক্ষ্মীর কাছেই টাকা রাখতে অয়। সংসারে উন্নতি অয়।’
শখিনা এক টুকরো জমি কেনার আশায় তিল তিল করে টাকা জমাতে থাকে।
বর্ষাকাল। পদ্মার পানি ফুলে ফেপে উপচে পড়ছে। ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি গাছপালা। চিন্তায় ভানুমতির রাতে ঘুম আসে না। একমাত্র আশ্রয় এ ভিটে বাড়ি। ছোট্ট বাড়িটা শাকসবজি ফল গাছে পরিপূর্ণ। বাড়িটা গরু, বাছুর, হাঁস, মুরগির কলকাকলীতে মুখর। এই সুখটুকু কি তার কপালে সইবে। ভাবে ভানুমতি। দুশ্চিন্তায় দিন কাটে তার।
এক দুপুরে পদ্মার করাল গ্রাসে বাড়িটা তলিয়ে যেতে থাকে। ভানুমতি গরুগুলো ছেড়ে দেয়। অন্য কোথাও পাঠানোর কোনো নিরাপদ জায়গা ছিল না তাদের। তাই আল্লাহ ভরসা করে বসেছিল। একটি নৌকা আসে ওদের উদ্ধার করতে। শখিনার বুকের ধন খোকাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। ইতোমধ্যে বাড়ির তিন-চতুর্থাংশ ডুবে গেছে। রফিক বুঝতে পারল তাদের ছেলেকে আর কোনো দিন ফিরে পাওয়া যাবে না। তাই বাকি অংশটুকু তলিয়ে যাওয়ার আগেই মা আর স্ত্রীকে জোর করে নৌকায় তোলে। ঢেউয়ের তালে তালে নৌকা চলতে থাকে। ভানুমতি আর শখিনার প্রাণফাটা আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। রফিকের নির্বাক দৃষ্টি শুধু পদ্মাকেই দেখে যায়।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.