রাসূল সা:-এর জিকিরের বিধান

রওশন আখতার

 

জিকির অর্থ আল্লাহর স্মরণ। সর্বশ্রেষ্ঠ জিকির হচ্ছে কুরআন তিলাওয়াত। যিনি কুরআন পড়ে বুঝে সে মতো জীবনযাপন করার চেষ্টা করেন তিনিই সহিহ জিকির করনেওয়ালা বলে বিবেচিত। জিকির সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘(হে নবী), তোমার মালিককে স্মরণ করো মনে মনে, সকাল-সন্ধ্যায়, সবিনয়ে ও সশঙ্কচিত্তে, অনুচ্চ স্বরের কথাবার্তা দিয়েও (তাঁকে তুমি স্মরণ করো), কখনো গাফেলদের দলে শামিল হয়ো না। নিঃসন্দেহে যারা তোমার মালিকের একান্ত সান্নিধ্যে আছে, তারা কখনো অহঙ্কার করে তাঁর ইবাদত থেকে বিরত থাকে না, তারা তাঁর তাসবিহ করে এবং তাঁর জন্য সিজদা করে।’ (সূরা আল আ‘রাফ : ২০৫-২০৬)

এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সবিনয়ে ও সশঙ্কচিত্তে অনুচ্চ স্বরের জিকিরের কথা বলছেন। সরবে সুউচ্চকণ্ঠের জিকির বৈধ নয়। এ কারণে যখন একদল সাহাবি রাসূল সা:কে প্রশ্ন করলেনÑ আমাদের রব কি আমাদের খুব কাছে যে আমরা ফিসফিসিয়ে তাকে যা বলার বলব, না তিনি অনেক দূরে, তাই ডেকে কিছু বলতে হবে? (ইবনে কাছীর,৩য় খণ্ড, পৃ: নং : ৫৬১)

এর পর আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাজিল করলেন, ‘(হে নবী), আমার কোনো বান্দা যখন তোমাকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে (তুমি তাকে বলে দিয়ো) আমি (তার একান্ত) কাছেই আছি; আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিই যখন সে আমাকে ডাকে। (সূরা আল বাকারা : ১৮৬)

সহিহ বোখারি ও মুসলিম শরীফে আবু মূসা আশয়ারি রা: থেকে বর্ণিত, লোকেরা কোনো এক সফরে সুউচ্চ কণ্ঠে দোয়া করলে নবী সা: তাদেরকে বললেনÑ হে লোকেরা! তোমরা স্বাভাবিক মৃদুকণ্ঠে তা করো! কেননা তোমরা কোনো বধির বা অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছো না। তোমরা যাঁকে ডাকো তিনি নিকটতম শ্রোতা।

আল্লাহ বলেছেন, ‘(হে নবী), চিৎকার করে নামাজ পড়ো না, আবার তা অতিশয় ক্ষণভাবেও নয়, বরং (নামাজ পড়ার সময়) ও দুয়ের মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করো।’ (সূরা বনি ইসরাঈল : ১১০)

যেখানে কুরআনে আল্লাহ পাক অনুচ্চ স্বরের জিকিরের কথা বলেছেন, সেখানে উচ্চ স্বরে, নর্তন, কুর্দন, সার্কাসের সাথে জিকির করার সুযোগ কোথায় থাকে সে প্রশ্ন রাখলাম বর্তমান যুগের সচেতন মানুষের কাছে।

সবচেয়ে মানবীয় বিপর্যয় এবং হৃদয়বিদারক দিন হলো আপনজনের মৃত্যু। এ মৃত্যুতে এমন কোনো কঠিন হৃদয় পৃথিবীতে নেই যার চোখ দিয়ে বেদনাশ্রু নির্গত না হয়। এ অবস্থায়ও আহাজারি করার নিষেধ আছে ইসলামে।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শোক প্রকাশে মুখের ওপর, কপালের ওপর থাপ্পড় মারবে (খামচি কাটবে) বা খেদোক্তি, বিলাপেÑঅন্ধকার যুগের রীতিনীতিতে নিজের মৃত্যু ধ্বংস ইত্যাদির অশুভ আহ্বান করবে, সে আমাদের তথা ইসলামের তরিকাবহির্ভূত। (বোখারি শরীফ, ৬৭৮ নং হাদিস, অনুবাদক, মাওলানা আজিজুল হক, হামিদিয়া লাইব্রেরি লি:১৯৯৬ ঈসায়ী সন)

শোকে মুহ্যমান ব্যক্তিকে যেখানে থাপ্পড় এবং বিলাপ করা নিষেধ করা হয়েছে সেখানে নর্তন কুর্দন এবং সার্কাসসহ জিকির ইসলামি তরিকার কতখানি অন্তর্ভুক্ত তা সচেতন পাঠকের কাছে প্রশ্ন রাখলাম। 

ইসলামে চলা, বলায়, চিন্তায় শালীনতার স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। ভদ্র সভ্য সত্যের সংস্কৃতি বহন করে ইসলাম। অপসংস্কৃতি যা ছিল প্রাক-ইসলামি যুগে তা সব হারাম হয়ে যায় কুরআন নাজিল হওয়ার পর। সেই বাতিল সংস্কৃতি যদি ইসলামের নামে নতুন করে প্রচার-প্রসার ঘটায় কোনো মতলবি আলেম বা পীর তবে তার জবাব দিতে হবে বিচারপতি আল্লাহর দরবারে। পীর সাহেব একার কৈফিয়ত তো দেবেন কিন্তু লাখ লাখ মানুষের মধ্যে অনৈসলামিক ঈমান আকিদার যে বীজ রোপণ করলেনÑ এত মানুষের হিসাব দেবেন কিভাবে?

জিকির করতে চান? আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর বাতলানো পথ ধরুন। মনে মনে জিকির করুন। সকাল-সন্ধ্যায় বিনয়ের সাথে ভয়ের সাথে জিকির করুন। অনুচ্চ স্বরে কথাবার্তায় তাঁর জিকির করা যায়। রাতদিন জিকির করুন। কী জিকির করবেন? কুরআন ও সহিহ হাদিসগুলোতে অনেক জিকিরের উল্লেখ রয়েছে। তা থেকে জিকির করুন। সওয়াব অর্জন করুন। তবে জিকিরের সাথে কোনো অঙ্গভঙ্গি অথবা চিৎকারের হইহুল্লোড় কিংবা নারী-পুরুষের একত্রিত ডিসকো ড্যান্স অবশ্যই নয়।

যে যেমন খুশি ইসলামের নামে চেক ভাঙিয়ে খাচ্ছে। এমন চলতে পারে না। কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের জন্য মানবতার ধর্ম, আল্লাহর একত্ববাদের ধর্মে এমন শিরক বিদআতি কাজ চলতে পারে না। আসুন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা:-এর প্রকৃত আশেক তারা তওবা করি এবং কুরআন-সুন্নাহয় ফিরে আসি এবং অন্যদেরকেও এ পথে আনি। সবাই সত্যিকার আশেকের প্রমাণ দিই আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূল সা:-এর পথ অনুসরণ করে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.