তাদের অপরাধ আল্লাহ তাদের রব

মুফতি আবুল খায়ের মো: ছাইফুল্লাহ


এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তরে নিঃসন্দেহে রোহিঙ্গা মুসলিমদের কথাই চলে আসবে। আরাকানের অধিবাসী এসব রোহিঙ্গারা হাজার বছর ধরেই মুসলিম হিসেবে জীবনযাপন করে আসছে। ১৭৮৪ সালে স্বাধীন মুসলিম আরাকান তাদের স্বাধীনতা হারায়। ১৯৩৬ সালে অং সান সু চির বাবার কেবিনেটের শিক্ষা ও গবেষণামন্ত্রী ছিলেন মো: আব্দুর রাজ্জাক। রোহিঙ্গা নেতা আব্দুর রশিদ ছিলেন তার বাবার সহকর্মী ও সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা। ১৯৪৮ সালে বার্মা ব্রিটিশদের কাছ থেকে স¦াধীনতা লাভ করে। রাখাইন নামটি চাপিয়ে দেয়া হয়েছে ১৯৮৯ সালে। যারা স্বাধীনতা আনল, আজ তাদের নিজ দেশেই নাগরিকত্ব নেই।
আরাকানের মুসলমানদের ওপর বর্মি বা মগদের নির্যাতন অনেক প্রাচীন। অনেক দিন ধরেই তারা নির্যাতিত। তবে বর্তমান সময়ের নির্যাতন যেকোনো বর্বরতার ইতিহাসকেও অতিক্রম করে ফেলেছে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের অধিকার ক্ষুণœ করা হয়। ২০১২ সালের পরে তাদের মাদরাসাগুলোকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ২৫ আগস্ট ২০১৭ ইং থেকে মংডু এলাকার মসজিদে আজান কিংবা নামাজের দৃশ্য কল্পনা করা যায় না। আরাকানিদের শিক্ষার অধিকার নেই। তারা তাদের দেশের রাজধানীর রেঙ্গুনে যেতে পারে না। সরকারি চাকরির তো প্রশ্নই আসে না। ব্যক্তিগত শ্রম, ব্যবসা এবং কৃষির মাধ্যমে তারা যা রোজগার করত তার একটি বড় অংশ নিয়ে যেত মগ বৌদ্ধ এবং সেনাবাহিনী। দৈহিক নির্যাতন তো রয়েছেই।
কিন্তু কেন এই নিপীড়ন? এটা কি কেবল কোনো জাতিগত বা সংখ্যালঘু নিধন। এই প্রশ্নের আগে সহজ এবং মূল উত্তরটি দিয়েছেন খ্রিষ্টানদের নেতা পোপ ফ্রান্সিস। তিনি সঙ্কটের শুরুতেই স্পষ্টত বলেছেন, মুসলিম পরিচয়ের কারণেই আরাকানে এই গণহত্যা। অথচ আমাদের দেশের কিছু বুদ্ধিজীবী এখনো বলছেনÑ এটাকে সংখ্যালঘু বা জাতিগত নিধন বলা যাবে কিন্তু মুসলিম নিধন বলা যাবে না। আল্লাহ তায়লা বলেন, ‘যাদেরকে তাদের ঘর থেকে বহিষ্কার করা হলো তাদের কোনো অপরাধ ছিল না, তারা শুধু এই স্বীকৃতি প্রদান করত আল্লাহ আমাদের রব। (সূরা আল হাজ, আয়াত- ৪১)। ১৯৪৮ সালের গণভোটে রোহিঙ্গারা ভোট দিয়েছে। ১৯৬২ সালের পর থেকে কার্যত চলছে সামরিক শাসন। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল এখনো থামেনি।
নতুন করে এসেছেন প্রায় পাঁচ লাখের মতো। আরাকানের ভেতরে যারা রয়েছেন তাদের কী করুণ অবস্থা তা আমাদের জানা নেই। প্রবাসী রোহিঙ্গারা নেতারা দাবি করছেনÑ ইতোমধ্যে ১০ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। তারা যেভাবে ধারাবাহিকভাবে রোহিঙ্গা জনপদগুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে এতে প্রমাণিত হয় সহজেই সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ওআইসির ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন, কেন দেশে দেশে মুসলিমরা হবে শরণার্থী? এর উত্তর তাকে যেমন খুঁজে বের করতে হবে। তেমনি মুসলিম শাসক গোষ্ঠীকেও ভাবতে হবে। আজ প্রয়োজন তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের মতো ঈমানদার ও মধ্যপন্থী নেতৃত্বের। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলিমদের চোখ ভিন্ন হতে পারে কিন্তু তাদের চোখের পানি সারা বিশ্বের সব মুসলিমের। কেবল রোহিঙ্গা মুসলিম বলেই নয় কাশ্মির, জিয়াং, ফিলিস্তিন, সুদান, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, সিরিয়া, মিসর, চেচনিয়া সর্বত্রই মুসলিমদের ওপর নির্যাতন। আর মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্য সহ¯্রাধিক রকমের বোমা তারা পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সহজ বোমাটির নাম হচ্ছে ‘জঙ্গিবাদ’। ধারণা করা হচ্ছে এটিও অসহায় রোহিঙ্গাদের ওপর সু চি ও তাদের সেনাবাহিনী চাপিয়ে দেবে।
আরাকানের মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের চিত্র এবং বাংলাদেশের শরণার্থী হিসেবে তাদের হিজরতের দৃশ্য গোটা বিশ্ববিবেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জাতিসঙ্ঘ আরাকানের মুসলিম গণহত্যাকে পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ হিসেবে চিহ্নি করেছে। ফ্রান্সসহ মুসলিম জাতীর কমিউনিটির বাইরেও অনেক দেশ এটিকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দল-মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ আশা করেছিল বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো রোহিঙ্গাদের এই অবর্ণনীয় নির্যাতনের বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সর্বশেষ জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর মুখোশ উন্মোচিত হয়ে গেল। চীন বৌদ্ধ হিসেবে এবং রাশিয়া কমিউনিজমের আলোকে তাদের সমর্থন প্রদান করছে। রাশিয়া আগেই এটাকে অভিহিত করল আন্তঃধর্মীয় সঙ্ঘাত বলে। চীন ও ভারত পরস্পরবিরোধী হলেও রোহিঙ্গাদের দমনে তারা মিয়ানমারের পক্ষ অবলম্বন করছে। কারণ এ দু’টি দেশেও মুসলিমরা নির্যাতিত হয়। মুসলমানদের চিরশত্রু ইসরাইল তাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করছে। যারা এক দশকেও সিরিয়া সঙ্কট সমাধান চাইলোনা তারা এক মাসে রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধান করে দেবে এ আশা করাও দুস্কর। তবে মানুষ এবং মুসলমান হিসেবে আমাদের সবাইকেই সাধ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসতে হবে এবং সাহায্য অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের দেশে যারা আশ্রয় নিয়েছেন তাদের জান-মাল, ইজ্জতের নিরাপত্তা দিতে হবে। অমুসলিমদের প্রতিও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওয়াদা রক্ষা করতে হবে।
লেখক : সাবেক খতিব
ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান,
কিশোরগঞ্জ।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.