চোখ

শওকত নূর

মুসাব্বির সাহেব লোকজন একেবারেই পছন্দ করেন না। একা থাকতে খুব ভালোবাসেন। একসময় ছোটদের পছন্দ করতেন; তাদের স্নেহ করতেনÑ এখন তা-ও করেন না। উল্টো ছোটদেরই এখন বেশি অপছন্দ করেন। তাদের দেখলেই শুধু দূর দূর ছাই ছাই করেন। তারা বেশি শব্দ করলে লাঠি বাগিয়ে তেড়ে যান। এটা হয়তো তার বয়স বেশি হওয়ার কারণে। একা মানুষ; নিরিবিলি থাকেন। চোখে আজকাল খুবই কম দেখেন। শরীরও ভালো যায় না। ফলে ও রকমই অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে।
গাঁয়ের শেষ মাথায় এক ফাঁকা বাড়িতে মুসাব্বির সাহেব থাকেন। জীবিকার জন্য এক দোকান দিয়েছেন অল্প দূরের প্রাইমারি স্কুলের পাশে। দোকানে তরুণ এক কর্মচারী আছে। বেচা বিক্রির পর যে টাকা পয়সা সে বুঝিয়ে দেয় তাতেই তার দিন চলে যায়। স্কুলের টিফিন ঘণ্টায় কোনো কোনো দিন দোকানে খুব ভিড় পড়ে যায়। ছাত্ররা টিফিন কেনে। তারা প্রায়ই খুব হইচই বাধায়। এমন সময়গুলোতে রীতিমতো তেড়ে যান মুসাব্বির সাহেব। লাঠি উঁচিয়ে বলেন, আমার বিপণির সামনে এত হই হট্টগোল কিসের? আমার এত কাইস্টামারের প্রয়োজন নাই। দোকান বন্ধ করো মফিজ। দ্রুত ঝাপ ফালাই দিয়া তালা-ঝুলাও। বন্ধ করো জলদি।
মফিজ কোনো আপত্তি না করে দোকানের ঝাপ ফেলে তাতে তালা ঝুলিয়ে দেয়। তার পর অদূরের বটগাছের নিচে গিয়ে ঘুমায়। ছেলেপুলেরা মন খারাপ করে স্কুলে ফিরে যায়।
একসময় মুসাব্বির সাহেবের বয়স আরো বেড়ে গিয়ে তার দুই চোখে ছানি পড়ে। এখন তিনি খুবই সামান্য দেখতে পান। ভিড়বাট্টা এখন তার আরো বেশি অপছন্দ। সর্বদা কান খোলা রেখে ভাবেন, ওই বুঝি দোকানের সামনে গোলমাল বেধে গেল। হইচই শোনামাত্র লাঠি উঁচিয়ে দোকানের উদ্দেশে তেড়ে যান। চোখের সমস্যা থেকে এখন তার মাথায়ও হয়তো কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। প্রায়ই আবোল-তাবোল বকেন। লাঠি ছুড়ে মারেন। ছাত্ররা কিছু মনে করে না। নীরবে চলে যায়।
এক দিন স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাহেব স্কুলের বড় ছাত্রদের ডেকে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করলেন। তিনি জানালেন পরের সপ্তাহে পাশের গাঁয়ের ইউনিয়ন অফিস চত্বরে একদল ভ্রাম্যমাণ চক্ষু চিকিৎসক আসবেন। তারা বিনা মূল্যে বয়স্কদের চোখ অপারেশন করবেন। ক্যাম্প করে মাস দুই থাকবেন তারা। মুসাব্বির সাহেবকে যদি রাজি করিয়ে সেখানে নিয়ে যাওয়া যায় তবে তার চোখ দুটো নিশ্চয়ই ভালো করা যাবে। এটা আসলে সবারই কর্তব্য। ছাত্ররা এ বিষয়ে খুবই উৎসাহী হলো। সে দিন বিকেলেই তারা প্রধান শিক্ষক সাহেবের সাথে গিয়ে মুসাব্বির সাহেবকে চোখ অপারেশনের বিষয়ে রাজি করালো।
অপারেশনে মুসাব্বির সাহেবের চোখের ছানি দূর হয়েছে। এখন তিনি সবই দেখতে পান। বেশ স্পষ্ট দেখতে পান। প্রতিদিন অদূরে গাছের নিচে বসে দোকানের ভিড় দেখেন। এখন ভিড় দেখতে একটুও খারাপ লাগে না তার। স্কুলের ছাত্রদের দেখলে তার খুশির সীমা থাকে না। ছুটির পর ছোট-বড় অনেককে থামিয়ে একে একে তাদের নাম-ঠিকানা, রোল নম্বর প্রভৃতি জিজ্ঞেস করেন। নানা হিতোপদেশ দেন। আর এক দৃষ্টে তাদের মুখের দিকে চেয়ে থাকেন। মনে মনে ভাবেন, এখন তিনি পুরোপুরি নতুন এক জীবন পেয়েছেন। তার একটাই কারণ; তা হলোÑ শিক্ষক ও ছাত্রদের কল্যাণে ফিরে পাওয়া তার সুস্থ সবল দু’টি চোখ।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.