রোহিঙ্গা নিধন ফিলিস্তিন ট্র্যাজেডিকে স্মরণ করিয়ে দেয়
রোহিঙ্গা নিধন ফিলিস্তিন ট্র্যাজেডিকে স্মরণ করিয়ে দেয়

রোহিঙ্গা নিধন ফিলিস্তিন ট্র্যাজেডিকে স্মরণ করিয়ে দেয়

মোস্তফা কারকুইতি

জাতিসঙ্ঘ প্রধান অবশেষে কথা বলেছেন এবং নোবেল বিজয়ী ও মিয়ানমারের প্রকৃত নেত্রী অং সান সু চিকে সেনা অভিযানের মাধ্যমে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমের প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া বন্ধ করতে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। যাই হোক না কেন, দেরিতে হলেও এটা ভালো। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিয়ো গুতেরেস মিয়ানমারের নেত্রীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, রাখাইন রাজ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে গণহত্যা চালানো হচ্ছে- তা বন্ধ করতে এটা সু চির জন্য শেষ সুযোগ।

জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বিবিসি ওয়ার্ল্ড নিউজকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর বলেন, ‘এখন থেকে তিনি সক্রিয় না হলে এই ট্র্যাজেডি নিশ্চিতভাবে ভয়ানক আকার ধারণ করবে।’ গত তিন সপ্তাহে বাধ্য হয়ে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে প্রবেশ করার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। বেশ কয়েক বছর ধরে পাশবিক নির্যাতন এবং জাতিগত নির্মূল অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত ৯ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল এবং পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

রাখাইন রাজ্যের রাষ্ট্রবিহীন ইন্দো-আর্য জাতিগোষ্ঠীর রোহিঙ্গারা এখন সত্যিকারের গণহত্যার শিকার। ২০১৫ সালের আগের রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কট এবং ২০১৬ ও ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দমনাভিযান সু চির সম্পূর্ণ জ্ঞাতসারেই হয়েছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী প্রায় ১৩ লাখ। তারা প্রধানত রাখাইন রাজ্যে বসবাস করে। এক লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে শিবিরেই আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তারা বাড়িঘর ও ভিটেমাটি ছাড়া, অর্থাৎ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত।

মিয়ানমারে যা ঘটছে তা বিভিন্নভাবে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনে যা ঘটেছিল, তারই বেদনাদায়ক স্মৃতিকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকে লাখ লাখ ফিলিস্তিনির ব্যাপক হারে বাস্তুচ্যুতি ও দেশান্তরিত হওয়ার মতো বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছিল। বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নাগরিককে তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হয়। রোহিঙ্গা এবং ফিলিস্তিনি উভয় জনগোষ্ঠীকেই বারবার নির্যাতনের মাধ্যমে স্থানচ্যুত করে তাদের নাগরিকত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মুসলিম। আবার সেখানে সংখ্যালঘু হিন্দুরাও রয়েছেন। ২০১৩ সালের জাতিসঙ্ঘ রিপোর্টে রোহিঙ্গাদের বিশ্বের ‘অত্যন্ত নির্যাতিত সংখ্যালঘু’ হিসেবে বর্ণনা করে বলা হয়েছে, ১৯৮২ সালের বর্মী নাগরিকত্ব আইনের আওতায় রোহিঙ্গাদের সরকারিভাবে নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। এই আইন রোহিঙ্গাদের জাতীয়তা অর্জনের অধিকার দিতে কার্যকরভাবে অস্বীকার করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে (এইচআরডব্লিউ), মিয়ানমারের আইনে রোহিঙ্গাদের দেশটির অন্যতম জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। অথচ অষ্টম শতাব্দীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলামের আগমনের সময় রোহিঙ্গারা সেখানে ছিল বলে ইতিহাস চিহ্নিত করেছে।
চলাচলের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষালাভ এবং সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে হয়। তাদের ১৯৭৮, ১৯৯১-৯২, ২০১২, ২০১৫ এবং ২০১৬-১৭ সালে বারবার সামরিক দমনাভিযানের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু এই জঘন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত বিশ্ব সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে কার্যকর প্রতিবাদ জানানো হয়নি।

জাতিসঙ্ঘ আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও দমনাভিযানকে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ তথা জাতিগত নির্মূল অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছে। মিয়ানমার বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ইয়াংহি লি মনে করেন, এই দমনাভিযান সুনিশ্চিতভাবে গোটা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দেশ থেকে বের করে দেয়ার প্রয়াস। মিয়ানমার সরকার ‘রোহিঙ্গা’ নাম বা পরিভাষাটিকে স্বীকার করে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। এর পরিবর্তে তারা রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ নামে অভিহিত করছে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে যে অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে, সেটাকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘বর্ণবৈষম্যবাদের’ সাথে তুলনা করেছে।

অনেক মানবাধিকার সংগঠনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এটা সুস্পষ্ট, মিয়ানমার সরকার রাখাইনে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীকেই সেখানে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তাই তারা মুসলিম রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বের করে দেয়ার লক্ষ্যেই তাদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালাচ্ছে। যেসব খবর পাওয়া গেছে তা ভয়ঙ্কর : হাজার হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছে। গোটা পরিবারকে জীবিত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। পাঁচ বছর বয়সী শিশুদেরও শিরñেদ করা হয়েছে। নারীদের ধর্ষণ এবং সীমান্তে স্থলমাইন পুঁতে রাখা হয়েছে। হাজার হাজার নির্দোষ বেসামরিক লোক বাংলাদেশের নিরাপদ ভূখণ্ডে পালিয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য যখন প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সীমান্ত এলাকা ও নোম্যানস ল্যান্ডে ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখছে।

লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটিতে ইন্টারন্যাশনাল স্টেট ক্রাইম ইনিশিয়েটিভের উদ্যোগে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, মিয়ানমারের মুসলিম রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর প্রভাবশালী চরমপন্থী গ্রুপ এবং এমনকি সরকারি কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ এবং মিয়ানমারের সরকার যে গণহত্যা চালাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে দেরিতে হলেও নিন্দা জানানো শুরু হয়েছে। ওই সমীক্ষার উপসংহার টানতে গিয়ে বলা হয়েছে, কয়েক দশকের অত্যাচার নির্যাতনের পর ‘রোহিঙ্গারা গণহত্যার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।’

এই রিপোর্টে গণহত্যা বিশেষজ্ঞ দ্যানিয়েল ফেয়ারস্টেইনের অনুসরণ করে গণহত্যার ছয় পর্যায়ের কাঠামো তুলে ধরা হয়। তার বইয়ে গণহত্যাকে সাক্ষাৎকার গ্রহণ, মিডিয়া রিপোর্ট ও সরকারি দলিলাদির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। রিপার্টে রোহিঙ্গাদের ওপর প্রথম চারটি পর্যায়ে কিভাবে নির্যাতন চালানো হয় তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

এই চারটি পর্যায় বা ধাপ হলো : কলঙ্কিত করা এবং মনুষ্যোচিত গুণাবলি থেকে বিচ্যুত করা, হয়রানি বা নাজেহাল করা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে আতঙ্কিত করা, বিচ্ছিন্ন করা এবং সরিয়ে রাখা বা নিঃসঙ্গ করা, পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে পরিপূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়ার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। ষষ্ঠ পর্যায় হলো : নির্যাতনের শিকার গ্রুপটিকে সামরিক ইতিহাস থেকে অপসারণ বা সরিয়ে দেয়া। রিপোর্ট অনুযায়ী ইতোমধ্যে এসব বিষয় মিয়ানমারে চলমান রয়েছে।

সরকারিভাবে স্বীকৃত দেশের ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র রোহিঙ্গাদেরই মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ, সামরিক জান্তা এবং সরকার টার্গেট করেছে। দশকের পর দশক ধরে তারা বৈষম্য, বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। কিন্তু এখন তারা সম্পূর্ণভাবে জাতিগত নির্মূলের শিকারে পরিণত হয়েছে। দেশের মূল নেত্রী ও নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি এ ব্যাপারে কিছুই বলছেন না। তিনি সমালোচনা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এমনকি জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে তার নির্ধারিত ভাষণ প্রদান করাও বাতিল করেছেন। সাবেক একজন মানবাধিকার নেত্রী হিসেবে সু চি তার নৈতিক দায়িত্বকে নিশ্চিতভাবে অবহেলা করছেন। তার নিষ্ক্রিয়তা কেবল ইসরাইলের মতো অত্যন্ত চরমপন্থী সরকারগুলোকে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের মাত্রাকে আরো বিস্তৃত করতে উৎসাহী করবে।

লেখক : একজন কলামিস্ট ও লন্ডনের ফরেন
প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট
গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.