নিঃসঙ্গতা : চারাগল্প

মো: মাঈন উদ্দিন

পাঁচ বছর হলো ফরহাদ তালুকদার অধ্যাপনার চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। অবসরের পর তার দিনগুলো কাটছে একরকম নিঃসঙ্গভাবে। জীবনের এক পরাবাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি। অবশ্য জীবন চলার পথে কতশত বাস্তবতার মুখোমুখি তাকে হতে হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই; কিন্তু ইদানীং কেন যেন তার ভার সইতে পারছেন না।
আজ শরতের এই চাঁদটা আলো দিচ্ছে অকৃপণভাবে, তার আলো ঠিকরে পড়ছে ডালপালার ফাঁক দিয়ে। শরতের মাঝামাঝি সময়টার প্রকৃতিতে হালকা কুয়াশা নেমে আসে। ভিজিয়ে দিয়ে যায় মাটির ওপর সবুজ গালিচার মতো জেগে থাকা দূর্বাঘাসগুলো। হালকা কুয়াশা দূর্বাঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দু সঞ্চায়িত করলেও চাঁদ কিন্তু ঠিকই হাসছে। ফরহাদ তালুকদার এতক্ষণ পূর্বপাশের বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে দুলছিলেন। এবার তিনি গ্রিল ধরে আরো গভীরভাবে তাকালেন আকাশ পানে, যেখানে চাঁদ মনের আপন মাধুরী দিয়ে বিলাচ্ছে তার আলো। হৃদয়ের সাঁটানো ক্যানভাসে ভেসে উঠছে ধারণকৃত কতগুলো ছবি, যে ছবিগুলো আজো জীবন্ত, প্রাণবন্ত। হয়তো এ ছবিগুলো জীবন্ত রবে যত দিন চলবে নিঃশ্বাস।
মনে পড়ে, এমনি এক ঝলমলে আলোকময় রাতে শেফালীকে তিনি বউ করে ঘরে আনেন। মহা ধুমধামের সাথে বরণ করে নেয়া হয় নববধূকে। সে দিন এই আলিশান বাসা ছিল না, তার স্থলে ছিল একটি ছোট্ট টিনের ঘর। কিন্তু সেই ছোট্ট ঘরখানি শত-সহস্র ভালোবাসায় ভরপুর ছিল। কুঁড়েঘরের যে কক্ষটিতে ফরহাদ-শেফালীর বাসর হয়েছিল, সেই কক্ষটির পূর্ব দিকে একটি খিড়কি ছিল। শরতের ¯িœগ্ধ আলো খিড়কি দিয়ে সে রাতে উপচে পড়েছিল সারা কক্ষময়। শরতের ঝলমলে চাঁদের আলো শেফালীর রূপ-সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণে। শেফালীর লাজুক হাসি দেখে ফিক করে হেসেছিল আকাশের চাঁদ। হয়তো বা নববধূর রাঙা মুখখানী দেখার মানসে রাতের চাঁদ আকাশ থেকে নেমে এসেছিল বেশ কাছে। তাই ওই চাঁদকে মনে হয়েছিল পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও বিশাল, যেমনটি আজ দেখাচ্ছে, মনে হচ্ছে চাঁদ নয়, একটি পূর্ণ কাসার প্লেট ভাসছে আকাশে। আকাশজুড়ে কোথাও মেঘের লেশমাত্রও নেই। মনে পড়ে, ফরহাদ-শেফালীর চার চোখের দুষ্টুমিতে চাঁদ হেসেছিল মুখটিপে। কিন্তু আজ সেই চাঁদে কোনো দুষ্টুমি নেই, নেই কোনো চঞ্চলতা, আছে কেবল একরাশ হতাশা আর অসম্ভব এক সরলতা। শরতের এই চাঁদও জেনে গেছে, বিয়ের ১০ বছর যেতে না যেতেই সব মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে, সব ভালোবাসাকে পেছনে ফেলে অর্পা ও অনন্যাকে পৃথিবীর জমিনে রেখে শেফালী চলে গেছে না ফেরার দেশে। সে দিন মুষড়ে পড়েছিলেন ফরহাদ তালুকদার, অথৈ সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে শুরু করেন তিনি। কিন্তু ভেঙে পড়েননি, শক্ত করে হাল ধরেন দক্ষ নাবিকের মতো। ফরহাদ তালুকদারের শুভাকাক্সক্ষীরা তাকে অনেক পিড়াপিড়ি করেছে দ্বিতীয় বিয়ে করতে, কিন্তু ফরহাদ তালুকদার তার হৃদয়কে ভাগ করতে চাননি, ভালো করতে চাননি হৃদয়ের জমায়িত শীতল ভালোবাসাকে। তিনি আর বিয়ে করেননি। মেয়ে দুটিকে আগলে রেখেছেন পরম মমতায়। তিনি কখনো সেজেছেন বাবা, আবার কখনো মা। তিনি মেয়ে দুটিকে মায়ের অভাব বুঝতে দেননি এতটুকু। তাদের বড় করেছেন মায়ের মমতা ও বাবার স্নেহ দিয়ে।
বড় মেয়ে অর্পা এখন স্বামী-সন্তান নিয়ে আমেরিকায় থাকে। ছোট মেয়ে অনন্যার স্বামী মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। সেও এখন চট্টগ্রাম থাকে। মেয়েরা বহুবার বলেছে, বাবা তুমি চলে এসো, কিন্তু তালুকদার নিজ গ্রামের মায়া ত্যাগ করে যেতে রাজি হয়নি। এই গ্রাম, এই গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলো তাকে একান্ত আপনজন করে নিয়েছে। এ গ্রামের শ্যামল প্রকৃতি, সবুজ ধান গাছের শিষ বেয়ে আসা শীতল হাওয়া, কোকিলের সুরেলা কুহু তান, পত্রপল্লবের প্রাণ উদাস করা মর্মর ধ্বনি, তাকে সর্বদা বিমোহিত করে রেখেছে এতদিন; কিন্তু অবস্থা পাল্টে গেছে। এখন কখনো কখনো নিজেকে একা মনে হয়, বড্ড একা। পাহাড়সম রিক্ততা তাকে অস্থির করে তুলে। যে সময় তার চারপাশে থাকার কথা গুটিকয়েক নাতি-নাতনী, যাদের কোলাহলে ঘুম ভেঙে যাওয়ার কথা, সেখানে আজ তার চারদিকে কেবলই নিঝুম নিস্তব্ধ নীরবতা। এক অজানা মানসিক একাকিত্ব তাকে ঘুমাতে দেয় না। এ যেন নিজ গৃহে নিজ বৃদ্ধাশ্রম।
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.