আমাদের অনুভূতিগুলো! : জীবনের বাঁকে বাঁকে

কাজী সুলতানুল আরেফিন

আমাদের অনুভূতিগুলো আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা একবার ভেবে দেখা দরকার। আমরা বর্তমানে জীবনের সব অনুভূতি আপনজনের চেয়েও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করতে বেশি পছন্দ করি। আবার অনেক কাজ যেন শুধু সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করার জন্যই করা হয়! সুখ, কষ্ট আর ক্ষোভের প্রকাশ আমরা সামাজিক মাধ্যম আর মিডিয়ায় দেখাচ্ছি। আসলেই কি আমরা এমন? কেউ দুর্ঘটনা আর আক্রমণের শিকার হলে আমরা ব্যস্ত থাকি ছবি তোলা আর ভিডিও করা নিয়ে! একটিবার যদি ভুক্তভোগী এর স্থলে নিজেকে কল্পনা করা যায় বা ভাবা যায়, তাহলে বোঝা যাবে মনবিকতা আজ কোথায় গিয়ে নেমেছে। আমারই সহজাতি এর কাছে আমার প্রাণের কোনো মূল্যই নেই। কেউ আমাকে কুপিয়ে মারছে আর আমারই জাতি বা সম্প্রদায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার ছবি তুলছে বা ভিডিও করছে। তখন মনে হবে এ দুনিয়ায় আমার মতো অসহায় আর কেউ নেই। একজন মানুষের জীবনের চেয়ে এই ছবি তোলার দাম বেশি হয়ে গেল? অথচ একটা সময় আমরা নাটক দেখেও কেঁদেছি। এজন সেজনের কাছে ছুটে গিয়েছি নাটকে অমুক ভাইয়ের মৃত্যু বা ফাঁসি ঠেকানো যায় কি না! বাস্তবে অপরের বিপদ দেখে ঝাঁপ দিয়েছি কিছু না বুঝে। আমাদের সে অনুভূতিগুলো কোথায় হারিয়ে গেল? কোথায় লুকিয়ে গেল মানবতা? এত তাড়াতাড়ি কিছুটা সময়ের ব্যবধানে আমরা বদলে গেলাম কিভাবে? কিছু প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে সাহায্যকারীও বিপদে পড়ে এমন চিন্তা চেপে ধরেছে আমাদের। এমন গ্রাস করা চিন্তা থেকে আমরা কবে নিস্তার পাব?
এরপর আসি ‘সেলফি’ প্রসঙ্গ নিয়ে। মৃত্যুপথযাত্রী অনেক মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলা নিয়ে মাঝে মধ্যে নানা সমালোচনার জন্ম হয়। আচ্ছা আমরা সেলফিতে এত মজে গেলাম কেন?
সেলফি জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর সেলফি এখন দিন দিন খুব বাজে কিছুতে রূপান্তরিত হচ্ছে। সেলফি যেন আজ বাধ্যবাধকতায় পরিণত হচ্ছে! সব কিছুতেই যেন সেলফি না তুললেই নয়। কোনো কিছুতেই অতিরিক্ত আসক্তি ভালো নয়। সকালের ঘুম থেকে জেগে উঠা থেকে শুরু করে খেতে বসা থেকে বাথরুমে যাওয়ার সেলফিও তুলে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। সবচেয়ে খারাফ লাগলো মৃত লাশের সাথে সেলফি তুলা দেখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ ধরনের কিছু সেলফি সমালোচনার ঝড় তুলেছে। এর মধ্যে কিছু ছিল মজা করে তৈরি করা! কিন্তু দু-একটা আসলও ছিল। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অনেক সেলফি আপলোড দেখা গেছে। হায়রে মানবজাতি কবর জিয়ারতেও সেলফি! অনেকেই এসব সেলফির সমালোচনা করতে গিয়ে ভালো করে সেলফি আপলোডকারীদের জাত ধুয়ে দিয়েছেন। আমি বলি এ সেলফিগুলোর সমালোচনা করে কী হবে? যারা এ সেলফিগুলো তুলেছে এবং আপলোড করেছে সমালোচনা মনে হয় না তাদের অনুভূতিতে লাগবে। কারণ একজন আপনজনের শেষ বিদায়ে যাদের আত্মারাম কেঁপে উঠেনি! মৃত্যুপথযাত্রীর কারো জন্য কষ্ট লাগেনি যাদের! যাদের অনুভূতিতে এতটুকু ভাটা পড়েনি! যাদের মগ্নতা ছিল সেলফি তোলা আর সেলফির ফোজ দেয়ার মধ্যে। তাদের অনুভূতির রঙ নিয়েও প্রশ্ন জাগে। সেলফি তোলা পাপের মধ্যে হয়তো পড়ে কি না জানি না, তবে এটা জানি মানুষ সেলফি তুলে আনন্দের মুহূর্তে। তাই মৃত ব্যক্তি বা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বা মৃত্যুপথযাত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলা মানবিক অনুভূতির প্রকাশ পায় না। এদের তোলা সেলফিগুলো কোনো যুক্তির মধ্যেই পড়ে না। এদের নৈতিকতা বা মনুষ্যত্ব আজ কোথায় গিয়ে নেমেছে তা চিন্তা করে দেখার বিষয়। আমরা কিভাবে আজ সামাজিক মাধ্যমের কাছে বন্দী হয়ে গেলাম তা আরেকবার ভেবে দেখা দরকার। মানুষ হিসেবে আর কী কী দেখতে হবে তা ভেবে আঁতকে উঠি। আমরা কি আমাদের হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি ফিরিয়ে আনার প্রয়াস করতে পারি না?
পূর্ব শিলুয়া, ছাগলনাইয়া, ফেনী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.