প্রিয় ছাত্রদের সাথে গোপাল স্যার; গোপাল স্যারের জীর্ণ ভবন ভেঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন বাসস্থান
প্রিয় ছাত্রদের সাথে গোপাল স্যার; গোপাল স্যারের জীর্ণ ভবন ভেঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন বাসস্থান

ছাত্রদের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন গোপাল স্যার

এস আর শানু খান

বর্তমানে আমাদের দেশের ছাত্রসমাজের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, কোন ছাত্র কোন শিক্ষককে কতখানি হেনস্তা করতে পারল। কতখানি অপমান, লাঞ্ছনা আর নিচে নামাতে পারল; যার প্রমাণ আমাদের চারপাশের পরিস্থিতি। পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে স্কুলের ছাত্রদের হাতে শিক্ষক লাঞ্ছিত, কলেজের ম্যাডাম ছাত্রদের দ্বারা উত্ত্যক্ত হয়েছেন। আর দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা তো আরো শোচনীয়। শিক্ষার্র্থীদের হাতে অধ্যাপকেরা লাঞ্ছিত যেন ডাল-ভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে। যেখানে আমাদের ছাত্রসমাজ শিক্ষাগুরুর মর্যাদা কবিতার মূলমন্ত্র ভুলে গিয়ে শিক্ষক মানেই একটি ঘৃণিত ও অবহেলিত চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করে, সেই যুুগে এই কৃতী ব্যক্তিত্ব মো: রহমান মৃধার মহৎ উদ্যোগ চোখে আঙুল দিয়ে শিখিয়ে দেবে শিক্ষকের অবদান কতটুকু প্রত্যেক মানুষের জীবনে। আর শিক্ষকদের প্রতিই বা ছাত্রের দায়িত্ব কতখানি। এমন একটি সময় রহমান মৃধার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নজর কাড়ে সবার।
মাগুরা জেলার শালিখা থানাধীন গঙ্গারামপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম মনোখালী। জন্মসূত্রে একই গ্রামে বসবাস হওয়ার সুবাদে সেই ছোটবেলা থেকেই গোপাল স্যার একটি পরিচিত নাম। পেশায় একজন শিক্ষক। পেশাজীবনের পুরোটা সময় যিনি পার করেছেন শিক্ষাদানের মতো মহৎ কাজ করে। শিক্ষকতাজীবনে ছাত্রদের পড়াশোনার ব্যাপারে উৎসাহ প্রদানে যিনি ছিলেন ধারালো হাতিয়ার। সম্ভ্রান্ত ঠাকুর পরিবারে জন্ম নেয়া এই কৃষ্ণ গোপাল ভট্টাচার্যের বাবাও ছিলেন একজন শিক্ষক। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাবু কৃষ্ণ গোপাল ভট্টাচার্য যে স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন পরবর্তীকালে ঠিক সেই স্কুলেরই শিক্ষক হয়েছিলেন এবং পেশাজীবনের দীর্ঘ সময় ঠিক সেই স্কুলেই পার করেছেন। অবশেষে খালি হাতে অবসর গ্রহণ করেছেন। স্বনামধন্য সে স্কুলের নাম গঙ্গারামপুর প্রসন্ন কুমার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, যেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯০০ সালে। চলতি বছরই এই জ্ঞানী, বিকশিত জ্ঞানের ভাণ্ডার, নক্ষত্র তৈরির কারিগর, প্রতিভারশ্মির জন্মদাতা, মেধা তালিকায় যশোর বোর্ডের খ্যাতনামা ও বারবার জেলা চ্যাম্পিয়ন হওয়া এই স্কুলের ঠিক পূর্ব পাশ ঘেঁষেই বয়ে গেছে নবগঙ্গা নদী। মাগুরা জেলার শালিখা থানাধীন গঙ্গারামপুরে অবস্থিত ১১৬ বছরের এই বিদ্যালয়ের ফলাফল বছরের পর বছর মানুষের নজর কেড়ে নিচ্ছে। আকর্ষণ করে তুলছে স্কুলের প্রতি।
৩৫ বছর এ স্কুলে শিক্ষিকতা করে গোপাল স্যার অবসর নিয়েছেন শূন্য হাতে। অসুখ-বিসুখে ভগ্ন স্বাস্থ্য। জরাজীর্ণ বাড়ি। স্যারের এ অবস্থা দেখে মাস দুয়েক আগে গোপাল স্যারকে নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম, সেখানে গোপাল স্যার ও আমার একটি ছবিও। ক্যাপশনটি ছিল স্যারের অসুস্থতা। সোস্যাল মিডিয়ার যুগে সেই আর্টিকেলটি ঘুরতে ঘুরতে শেষে রহমান মৃধার নজরে আসে। ১৯৮৫ সালে সুইডেনে যাওয়া রহমান মৃধা স্কুলজীবনে মাত্র দুই বছর গঙ্গারামপুর প্রসন্ন কুমার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন এবং তখনকার সময় খুব ভালো রেজাল্ট করেই ম্যাট্রিক পাস করেছিলেন। যার ফলে গোপাল স্যারের সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তার। স্যারের ছবি ও অসুস্থতার কথা শুনে মুহূর্তেই বিমর্ষ হয়ে পড়েন তিনি। নানা মাধ্যমে নানা লোকের মাধ্যমে সুদূর সুইডেন থেকেই স্যারের খোঁজখবর নিতে উঠেপড়ে লাগেন। স্যারের বর্তমান অবস্থান জানতে পাগলের মতো হয়ে পড়েন। অবশেষে দেশে কর্মরত এক বন্ধুর মাধ্যমে স্যারের সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পারেন। বন্ধু জুলফিকার একজন ব্যাংকার। তাকে স্যারের বাড়ি পাঠিয়ে স্যারের সাথে কথা বলেন। সব ধরনের খোঁজখবর নেন, কিন্তু স্যারের বর্তমান অবস্থা শুনে লজ্জিত হন তিনি। নিজেকে বিরাট অপরাধী মনে করেন। তার সাথে কথা বললে তিনি জানান, আমি যখন স্যারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অবগত হই, তখন সত্যিই আমি বেঁচে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলি, নিজেকে মানুষ হিসেবে দাবি করার সাহস ভুলে যাই, আর যখন আমি ভাবি, আমি তার এক হতভাগা ছাত্র তখন তো মনে হয়েছিল আমি মরেই যাই। তারপর আমি স্যারের কাছে আবেদন করি, স্যারকে একটি বাড়ি করে দেয়ার জন্য। কিন্তু স্যার কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। অবশেষে ছেলে হিসেবে জোর আবদার করি এবং নিজের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ ভিক্ষা চাই স্যারের কাছে এবং স্যার অনুমতি দেন। আমি সেভাবে এগিয়ে যাই। আমি স্যারের বাড়ির কাজটা দ্রুত করার জন্য আমার ছোট ভাইকে সুইডেন থেকে বাড়ি পাঠাই ও স্যারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। এখনো চলছে তেমনটিই। বন্ধু জুলফিকার ও এ রকম আরো অনেকে, যাদের বেশির ভাগই এখন পেশাজীবী, কেউ আবার অবসর নিয়েছেন। অনেকেই এগিয়ে আসতে চান। আমার সাথে থাকতে চান। প্রথমে আমি সবাইকে না করলেও পরক্ষণে আমার মনের ভেতর একটি চিন্তার উদয় হয়। স্যার তো আর শুধু আমার না। স্যারকে কিছু করে দিতে সবারই মন চায়। অবশেষে সবাইকে সাথে নিয়ে আমিও খুব মজা পাই এবং সেই পরিকল্পনার ওপরই এগোচ্ছি। ইতোমধ্যে অনেকেই আমার এ মতের সাথে একমত হয়েছেন। আশা করা যায়, শিগগিরই স্যারের এই বাসভবনটি নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করতে পারব। উল্লেখ্য, বাড়িটির নকশা এঁকেছেন সুইডেনের একজন নামকরা প্রকৌশলী। আর আমাদের এ কাজ গোটা ছাত্রসমাজের কাছে একটি মেসেজ হয়ে থাকবে চিরকাল। আমাদের এ মহৎ উদ্যোগ দেখে দেশের ছাত্রসমাজ উৎসাহিত হবে। এগিয়ে আসবে স্যারদের মর্যাদা রক্ষায়। আর আমি গোটা বিশ্বের ছাত্রদের জানিয়ে দিতে চাই, গোপাল স্যারের মতো মহৎ ব্যক্তিত্ব, যারা যুগের পর যুগ নিঃস্বার্থভাবে দেশের সেবায়, দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন সর্বক্ষণ, সেসব মানুষের জীবনের শেষ সময়টি যেন দুরূহ, কায়-ক্লেশের জীবন না হয়, সে জন্য আমার এই উদ্যোগ। জানি না জাতি কী হিসেবে দেখবে। ভালো থাকবেন সবাই। স্যারেরা যেন কখনো ভুলে না যান যে, গোটা বিশ্বে তাদের অজস্র সন্তান রয়েছে। এভাবেই নিজের অনুভূতি জানান সুইডেন নাগরিক রহমান মৃধা (জন্মস্থান বাংলাদেশ)।
স্যারের বাড়িটি এমনভাবে নির্মাণ করা হবে, যেটা স্যারের অবর্তমানেও স্যারের ¯েœহতুল্য ছাত্ররা এসে দেখে যাবেন স্যারের সব স্মৃতি। স্যারের ব্যবহারের সব জিনিস সংরক্ষণ করে রাখার ব্যবস্থা করা হবে। এখানে একটি ক্ষুদ্র পরিসরের লাইব্রেরি থাকবে।
গত ২ অক্টোবর সকাল ১০টায় মাগুরা জেলা প্রশাসক, মনোখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষক-শিক্ষিকা ও গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে গোপাল স্যারের বাড়ি নির্মাণের শুভ উদ্বোধন করেন স্যারের ছাত্ররা।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.