মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং লাইং গং
মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং লাইং গং

মিয়ানমার চোখ থাকতে অন্ধ

প্রফেসর ইউসুফ হারুন

ওখানে কী হয়েছে। কিছু হয়নি। যুবকগুলোকে কে হত্যা করেছে? রোহিঙ্গা বাবারা। মেয়েগুলোকে কারা ধর্ষণ করেছে? রোহিঙ্গা ভাইয়েরা। এভাবে যে বা যারা মিথ্যা বলে, রাখঢাক না করে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে উত্তর দেন তারা কেমন মানুষ সুধী পাঠক ভালো বোঝেন। তবে ক্যাটেগরিক্যালি এদের মিথ্যাবাদী বলা সঙ্গত।

ধরে নিলাম মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং লাইং গংয়ের বয়স পঞ্চাশ চলছে। আর তার বয়সের বিশ-ত্রিশ গুণ অধিক সময় থেকে আরাকান তথা মিয়ানমারে বসবাস করছে রোহিঙ্গারা। একটা পুরাতন প্রাচীন বটবৃক্ষ দেখে এর আয়ুষ্কাল প্রশ্নে উত্তর দেয়া হয়, ‘আমি দেখছি এ রকম, বাবা দেখছেন এ রকম, দাদাও দেখেছেন এ রকম, প্রপিতামহরা এভাবে দেখে এসেছেন। তখন অনুসন্ধিৎসু বুঝে নেন এটি অনেক আগ থেকে এখানে আছে।
কিন্তু মানবকুলাঙ্গার ভূমিতস্কর বিশাল বৃক্ষের বিস্তৃত জায়গা জবরদখলের জন্য গাছ কেটে, ছেঁটে, প্রায় চিহ্ন মুছে নির্মূল করে বলতে চেষ্টা করছে ‘কই বটগাছ’। এটি সেই ভূমিদস্যু তস্করের সাজানো নাটকের সংলাপ বৈকি!

তেমনি জেনারেল গং বলেন, রোহিঙ্গা জাতের কেউ কখনো সেখানে ছিল না, সমস্যা হলো ‘বাঙালি’। শুধু বাঙালি বলে চালিয়ে দেয়ার বিপক্ষে যুক্তি দিয়ে বললে পাঠক সমাজ বুঝবেন, শত শত বছর আগে অবাঙালি মোঘল বাদশাহ সুজা তার পরিবার পরিজন, ঘনিষ্ঠজন, আত্মীয়বর্গ, লোক-লস্কর নিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রাচীন বাসস্থান আরাকানে অবস্থান করেছিলেন। তাই এ জনগোষ্ঠীকে শুধু বাঙালি বলে চালিয়ে এরা বেশিদূর অগ্রসর হওয়ার রাস্তা কুসুমাস্তীর্ণ নাও পেতে পারেন। সে দেশে শায়িত আছে মহামান্য মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ। তার স্বজন সহচরেরাও বাঙালি। যেখানে গলিত লাশের রহস্য উদঘাটন সম্ভব। সেখানে জীবন্ত ইতিহাসকে চাপা দিয়ে বিকৃত করা অসম্ভব। কিছু জ্বাজল্যমান বিষয় টেকনিক্যালি এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়াস পাচ্ছে- একটা হলো রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্বিচারে খুন, জখম, ধর্ষণ করা হচ্ছে কি না বলছে না, যেন কিছু হয়নি, দুধে ধোয়া। অন্যটি হলো, এরা মুসিলম নির্মূল, নিধন, ধ্বংস বিতাড়নের মাধ্যমে আরাকান রাজ্যকে মুসিলম জনশূন্য এলাকায় পরিণত করছে।

জেনারেল অ্যান্ড গং আজ যে এলাকাকে মুসলিম জনশূন্য করছে আগামীকাল তা অধিক শক্তিশালী জালিমপূর্ণ হতে পারে। মনে রাখতে হবে, জালিমের ওপর অধিক জালিম আপতিত হয়, সে জালিমের কিছু ক্ষতি করার ক্ষমতা বর্মি সেনাদের না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। আমরা তা বিশ্বাস করি।
জেনারেল গংকে বলছি’, মানুষ খুন করে ঔদ্ধত্য দেখাবেন না। কারণ একটি অবৈধ খুন করলে আপনি গোটা মানবতাকে খুন করলেন, তাহলে হাজার হাজার হত্যা করলে গোটা পৃথিবীর মানুষকে হাজার হাজার বার হত্যা করলেন, হত্যার পরিবর্তে হত্যা সঙ্ঘটিত হতে পারে। একজন কমব্যাট লোক হিসাবে তা আপনার অজানা নয়।

ঐশী বাণী থেকে বলতে হয় আল্লাহর নবী সুলেমান বাদশাহ তখনকার জনবিরল পৃথিবীর লোকদের ও প্রাণিকুলকে একবেলা খাওয়াতে পারেননি। আর আপনি কিভাবে ভাবতে পারেন যে বিশ্বের ৭০০ কোটি মানুষ এক জায়গায় থাকতে খেতে পারবে। এভাবে স্থানান্তর প্রক্রিয়া চলছে, চলবে।

মানবসভ্যতা সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকলে জেনারেল গং বুঝতে পারবেন, মানুষ সৃষ্টিলগ্ন থেকে ডিভাইডেড, ডাইভারটেড, ডাইভার সিফাইড, স্ক্যাটার্ড, ইনডিপেনডেন্ট, ফ্র্যাগমেন্টেড, আইসোলেটেড বিভিন্ন ধ্যান ধারণায় সামাজিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক, ভৌগোলিক, ধর্মীয়, পরিবেশগত আবহাওয়া ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে গোটা পৃথিবীতে যে যার মতো করে বাস করার জন্য ছুটে বেড়াচ্ছে। সে ছুটোছুটি আজকের দিনেও চলছে। কেউ আমেরিকায়, কেউ ইউরোপ কেউবা মেরু ইত্যাদি। আবার কেউ যাচ্ছে শহরে, কেউ গ্রামে, কেউ গ্রিন সোসাইটিতে, কেউ রৌদ্রকরোজ্জ্বল স্থানে, কেউ সমতলে, কেউ পাহাড়ে! মানুষকে বসবাসের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগে রেগুলেট, ডমিনেট, কন্ট্রোল করা যায় না, উচিতও নয়।

মি. জেনারেল, একটা ছোট মানসাঙ্কের জবাব দিন, আপনার অর্ধাঙ্গিনীসহ আপনার পূর্ণাঙ্গের চৌদ্দ-চৌদ্দ আটাশ পুরুষের আবাসস্থলের ভৌগোলিক বিবরণী কি আপনার জানা আছে বলে মনে করেন? যদি তা হয়, জানা না থাকে তাহলে কিভাবে রোহিঙ্গাদের চৌদ্দ পুরুষের ভিটেবাড়ির খবর আপনি রাখার ব্যর্থ প্রয়াস চালাচ্ছেন।

বন্ধুবর আফসোস! মানুষ খুন, জখম, ধর্ষণ করে আপনি একা, চিরস্থায়ী বাস করতে চান হয়তোবা। এর কোনোটাই সম্ভব নয়, একাও বাস করা যায় না, আর চিরস্থায়ীও হওয়া যায় না। মানুষ ‘মরণশীল’। মানব জন্মের উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীকে আরেকটু ভালো রেখে যাওয়া। বন্ধু, আপনি সমত হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়ে মানুষের কল্যাণে মনোনিবেশ করুন। 

লেখক : আর্থসামাজিক উন্নয়ন বিশ্লেষক

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.