দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য
দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য

দিল্লি ও ঢাকা তীব্র মতপার্থক্য

নয়া দিগন্ত অনলাইন

বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবিত বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডরকে কেন্দ্র করে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। তার কারণ, এ করিডোরটিকে চীন তাদের উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট রোড ইনিশিয়াটিভে’র অংশ হিসেবেই দেখাতে চায়- কিন্তু সেটি পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে এ যুক্তিতে ভারত তা আগেই প্রত্যাখ্যান করেছে। 
ভারত সমগ্র কাশ্মিরকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে থাকে এবং সেই ভূখণ্ডের ওপর অন্য দেশের কোনো আন্তর্জাতিক প্রকল্প মেনে নেয়াকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের সাথে আপস হিসেবেই দেখে।


কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক গত সপ্তাহে দিল্লি সফর করেছেন, তার দেশের কাছে অর্থনীতির দাবি আগে এবং বাংলাদেশ আশপাশের বিভিন্ন দেশের সাথে সংযোগ গড়ে তোলাতেই বেশি গুরুত্ব দেবে। ফলে গত আট-নয় বছরে ভারত ও বাংলাদেশ মিলে প্রায় এক শ’র কাছাকাছি কানেক্টিভিটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পর হয়েছে এখন বিসিআইএম করিডরকে ঘিরে দুটো দেশ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে আর তার মূলে আছে এ প্রকল্পে চীনের ভূমিকা।


কাশ্মির এলাকার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে চীনের বেল্ট রোড ইনিশিয়াটিভ থেকে ভারত গত মে মাসেই নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিলÑ আর বিসিআইএমও যেহেতু চীনের সেই উদ্যোগেরই অংশ, তাই ভারত সেখানেও শীতল মনোভাব দেখাচ্ছে।


দিল্লির ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিটের মঞ্চে কিন্তু শহীদুল হক পরিষ্কার করে দিয়েছেন, তারা বিষয়টিকে ভারতের মতো করে দেখছেন না।


মি হক সেখানে বলেন, ‘সার্বভৌমত্ব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভৌগোলিক ও অন্যভাবেও যেহেতু আমরা ছোট দেশÑ তাই সেই সীমাবদ্ধতা দূর করতে হলে আমাদের বাকি দুনিয়ার সাথে সংযোগ স্থাপন করতেই হবে। তাই আমাদের এলাকার অন্য অনেক দেশের চেয়ে অনেক আগে আমরা নিজেদের দরজা খুলে দিয়েছি।’
‘শেখ হাসিনা সরকারের নীতিও খুব স্পষ্ট, দেশের মানুষের স্বার্থেই আমাদের সংযুক্ত হতে হবে, সার্বভৌমত্বের নামে আমরা বিচ্ছিন্ন থাকব তা হতে পারে না।’


কিন্তু চীনের প্রতি ইঙ্গিত করে ভারতের সাবেক কূটনীতিক তথা সহকারী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা লীলা পোনাপ্পা বলছিলেন, একটা বহুপাকি প্রকল্পে কোনো বিশেষ একজন অন্যায় আধিপত্য দেখাবে এটা ভারতের পে মানা সম্ভব নয়।


মিস পোনাপ্পার যুক্তি, ‘ঠিক এই কারণেই চীনের বেল্ট রোড ইনিশিয়াটিভ নিয়ে ভারত ধীরে সুস্থে এগোতে চায়। আর ইউরোপের অভিজ্ঞতা আমাদের বলে, ঠিকমতো জমি প্রস্তুত না করে ও সবাইকে তৈরি হওয়ার সময় না দিয়ে যদি এগোনো হয় তাহলে দারুণ পরিকল্পনাও মুখ থুবড়ে পড়ে, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নই তখন বড় হয়ে ওঠে।’ তবে বিসিআইএম করিডরকে যে বেল্ট রোড ইনিশিয়াটিভের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, চীন এটা স্পষ্টভাবে বললে হয়তো এ সমস্যার সমাধান হতে পারে, মনে করছেন দিল্লিতে আসিয়ান-ইন্ডিয়া সেন্টারের প্রধান ড. প্রবীর দে।


বহু বছর ধরে তিনি এ আলোচনা প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি যুক্ত, আর বেল্ট- রোডের অনেক আগে থেকেই যে বিসিআইএম নিয়ে আলোচনা চলছে, সে কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন তিনি।
ড. দের কথায়, ‘বেল্ট রোড ইনিশিয়াটিভ বড়জোর পাঁচ-ছয় বছরের কনসেপ্ট। প্রথমে ছিল মেরিটাইম সিল্ক রোড, তারপর এল ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড। আর সেই জায়গায় বিসিআইএম নিয়ে আলোচনা চলছে গত কুড়ি বছর ধরে।’


‘বিসিআইএমের যে ট্র্যাক টু ফোরাম, যাকে বলা হয় কুনমিং ইনিশিয়াটিভ, তার সূচনা হয়েছিল কুনমিংয়ে ১৯৯৭ সালে। প্রথম বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল কলকাতা থেকে কুনমিংয়ের মধ্যে সড়ক সংযোগ গড়ে তোলাÑ যাকে বলা হতো ট্রান্সপোর্ট করিডর।’


‘ইকোনমিক করিডরের ভাবনাটা অবশ্য আরো পরে এল। এ প্রকল্প রূপায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য তা যে বিরাট উপকার বয়ে আনবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই। তাদের জন্য আরো একটা সুবিধা হলো চীনের সাথে তাদের সরাসরি কোনো সীমান্ত নেই ... কিন্তু ভারত-চীনের সীমান্ত আছে, আর সেটাও বিতর্কিত’, বলছিলেন প্রবীর দে।


একই ভাবনার শরিক শহীদুল হকও। তিনিও বলছেন বেল্ট রোডের চেয়ে বিসিআইএমের ভাবনা আসলেই অনেক বেশি পুরনো এবং বাংলাদেশ বহু বছর ধরে বিসিআইএম নিয়ে নিবিড় আলোচনা চালাচ্ছে।


কিন্তু চীনের নতুন পরিকল্পনা সেই আলোচনাকেই এখন থমকে দিয়েছে এবং প্রস্তাবিত করিডরের দুই গুরুত্বপূর্ণ শরিক দেশ, ভারত ও বাংলাদেশ সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি নিয়ে একমত হতে পারছে না।
অন্যভাবে বললে, বিতর্কিত কাশ্মিরের ছায়া পড়ার আপাতত আটকে গেছে কলকাতা-ঢাকা-মান্দালে-কুনমিংয়ের সেতুবন্ধন!

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.