ভারতে সন্ত্রস্ত রোহিঙ্গারা
ভারতে সন্ত্রস্ত রোহিঙ্গারা

ভারতে সন্ত্রস্ত রোহিঙ্গারা

বেলা ভাটিয়া

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে ভারত সরকারের অবস্থান মোলায়েম ভাষায় বললে, উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভারতে অবস্থানরত প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে বহিষ্কার করা হবে এবং নতুন করে কাউকে ঢুকতে দেয়া হবে না। এ অবস্থান অসাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির বরখেলাপ। এই নীতি পক্ষপাতদুষ্ট, বৈষম্যমূলক ও রক্ষণশীল। এই অভারতীয় নীতি আগের আদর্শ থেকে সরে আসা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে ভারতের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়দায়িত্ব পরিত্যাগের শামিল।

গত ৮ আগস্ট ভারত সরকার রোহিঙ্গাসহ অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও বহিষ্কার করার জন্য সব রাজ্যসরকারকে নির্দেশ দেয়। গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিদ্রোহ দমন অভিযান শুরু হওয়ার পর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পাঁচ লক্ষাধিক লোকের বাংলাদেশে অভিবাসন ঘটেছে। ভারত সরকার এ নিয়ে এখনো একগুঁয়ে আচরণ করে যাচ্ছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) এক কর্মকর্তা সম্প্রতি মিডিয়ার কাছে স্বীকার করেছেন, তারা মরিচের গুঁড়া ছিটানো ও স্ট্যান্ড গ্রেনেড ব্যবহার করছে। কয়েকটি রাজ্যে ইতোমধ্যেই রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের সরিয়ে দেয়ার কাজ শুরু হয়েছে।


বিষয়টি যখন সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন, তখন কোন যুক্তিতে এই কাজ বৈধ হতে পারে? ২৯ আগস্ট রোহিঙ্গা মুসলমানদের পক্ষ থেকে যে আবেদন পেশ করা হয়েছিল, তার প্রাথমিক শুনানি হয়েছে ৩ অক্টোবর। আবেদনকারীরা ইতোমধ্যে জাতিসঙ্ঘ উদ্বাস্তু সংস্থার নিবন্ধিত প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর প্রতিনিধি। তারা ভারতে রয়েছেন ২০১১-১২ সাল থেকে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের হামলা থেকে রক্ষা পেতে হেঁটে তারা এত দূর এসেছেন। সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা আবেদনে রোহিঙ্গারা বলেছেন, তাদের বিতাড়ন হবে মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। এতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের আবার মিয়ানমারে পাঠানো হলে দু’টি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে। কারণ আন্তর্জাতিক আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বসবাস নিরাপদ না হলে কাউকে জোর করে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না। আবেদনে উদ্বাস্তুদের অধিকার সমুন্নতকারী আদালতের আগের বেশ কয়েকটি রায়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।


ভারত সরকার অবশ্য পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেছে, বিষয়টি বিচার বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত নয়। যুক্তি হিসেবে সরকার জানায়, মৌলিক অধিকার ভারতীয় নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য। বিষয়টি নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত। আর সরকারি নীতি বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে বারবার বদলে যেতে পারে। তা ছাড়া ভারত ১৯৫১ সালের উদ্বাস্তু কনভেনশন কিংবা ১৯৬৭ সালে এর প্রটোকলে সই করেনি। ফলে ভারত এসব অভিবাসীকে স্থান দিতে বাধ্য নয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারতের জাতীয় স্বার্থের জন্যও তারা হুমকি। এ ব্যাপারে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে তথ্য দেয়া হয়েছে, রোহিঙ্গাদের কয়েকজন সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে সম্পর্কিত। এ কথাও বলা হয়, রোহিঙ্গারা ভারতীয় সমাজের জনসংখ্যা ও সামাজিক কাঠামো বদলে দিতে পারে।


ডানপন্থী বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্ত আগের সরকারের অবস্থানের বিপরীত। ২০১৪ সাল পর্যন্ত ২৮টি দেশের প্রায় তিন লাখ উদ্বাস্তু ভারতে প্রবেশ করেছেন। নিজ দেশে বিরূপ পরিস্থিতির কারণে তারা পালিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। ১৯৫১ সালের উদ্বাস্তু কনভেনশন বা ১৯৬৭ সালের প্রটোকলে সই না করেও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তিতে ভারত সম্পৃক্ত হয়েছে। আর সেই সূত্রে বিপজ্জনক স্থানে উদ্বাস্তুদের ফেরত না পাঠানোর ব্যাপারে তার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ভারত সরকার রোহিঙ্গাদের প্রতি যে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তা দেশটির আগের আচরণের সাথে সাংঘর্ষিক। কেন? তারা কি সংখ্যালঘু নয় কিংবা তারা কি ধর্মীয় কারণে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে না?

বরং সবই স্বীকার করে নিচ্ছে, রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর অন্যতম। তাদের বড় অংশই মুসলিম। মিয়ানমার তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি, তারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী। এমনকি হিন্দু রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সরকার দ্বিতীয় শ্রেণীর গ্রিন সিটিজেনশিপ দিলেও মুসলিম রোহিঙ্গাদের তা-ও দেয়া হয়নি। 
মুসলিম রোহিঙ্গারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের হাতেও নির্যাতিত হচ্ছে। মিয়ানমারের পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তারা অপরাধ করেও দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গারা যে নৃশংস নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তা জাতিসঙ্ঘসহ সব আন্তর্জাতিক সংস্থা স্বীকার করছে। ভারত সরকার কি তা অবহিত নয়?


বিশ্বের কয়েকটি অংশের মতো ভারতও ক্রমবর্ধমান হারে ইসলামের সাথে সন্ত্রাসবাদকে গুলিয়ে ফেলছে। সীমান্তের বাইরে থেকে সন্ত্রাস জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে বিজেপি ব্যাপকভাবে প্রচার করছে। 


তবে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসে জড়িত থাকা নিয়ে সরকার সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা পেশ করলেও তা পানি পায়নি। ভারতের ছয়টি রাজ্যে রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সবচেয়ে বেশি আছে জম্মুতে। তারা সেখানে আছে পাঁচ বছর ধরে। জম্মুর বিজেপি নেতারাই প্রথম তাদের বহিষ্কার করার দাবি তোলেন। তাদের সরানো না হলে ‘কঠিন পরিণতি’ বরণ করতে হবে বলেও হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়।
কিন্তু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে জড়িত থাকার যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এনডিটিভির এক সমীক্ষায়। গত জানুয়ারিতে রাজ্য বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি বলেন, ‘উগ্রবাদী-সম্পৃক্ত কোনো ঘটনায় জম্মু ও কাশ্মিরের রোহিঙ্গাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এসব বিদেশী চরমপন্থী হয়ে উঠেছে, এমন কোনো আলামতও পাওয়া যায়নি। তাদের বিরুদ্ধে কেবল অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগ রয়েছে।’


এনডিটিভির সমীক্ষায় রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে ১৪টি এফআইআর দায়েরের প্রমাণ পাওয়া যায়। সমীক্ষায় বলা হয়, ‘আমরা ১৪টি এফআইআরের প্রতিটির সূত্র ধরে খোঁজ করেছি। এগুলোর মধ্যে আটটি ছিল ভিসার অভাবে, দু’টিতে ধর্ষণ, একটিতে গরু জবাই, একটিতে আঘাত সৃষ্টি, একটিতে কালোবাজারে পণ্য বিক্রি এবং অপরটিতে রেলওয়ের সম্পত্তি চুরির অভিযোগ ছিল।’ জম্মুর পুলিশপ্রধানও এ বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে বলেছেন, রোহিঙ্গারা ছোট অপরাধে জড়িত। এ ধরনের অপরাধ সমাজের অন্যান্য জনগোষ্ঠীও করে থাকে। সুপ্রিম কোর্টে জম্মুর রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্বকারী সিনিয়র অ্যাডভোকেট কলিন গনসালভেস বলেন, রোহিঙ্গারা একটি সন্ত্রাসী ঘটনার সাথেও জড়িত নয়।


সিনিয়র অ্যাডভোকেট ফালি নরিম্যান ৩ অক্টোবর শুনানিতে অংশ নিয়ে বলেন, কোনো রোহিঙ্গা সন্ত্রাসে জড়িত থাকলে তাকে বহিষ্কার করা যেতে পারে। এ জন্য রোহিঙ্গাদের গণহারে দোষী করা ঠিক হবে না।
সরকার যে পক্ষপাতদুষ্ট ও বৈষম্যমূলক নীতি অবলম্বন করেছে, সেটা বোঝার জন্য মুসলিম হওয়ার দরকার পড়ে না।


জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া এক ব্যাপার, আর একটি পুরো সমাজকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন ভিন্ন ব্যাপার। যারা আমাদের দেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে এবং যাদের আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন, তাদের জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তাড়িয়ে দেয়া উচিত হবে না। মুসলিমবিরোধী এবং রোহিঙ্গাবিরোধী এই মনোভাব সমাজে এবং সমাজের বহুত্ববাদের জন্য নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করেছে।
ভারত সরকার রোহিঙ্গা সঙ্কটে অনেকটা নীরব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেপ্টেম্বরের শুরুতে মিয়ানমার সফর করে বেশ দ্রুততার সাথে চরমপন্থী সহিংসতার নিন্দা করেছেন। কিন্তু গণ-অভিবাসনের ব্যাপারে নীরবতা পালন করেন। তবে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমালোচনার পর উদ্বেগ প্রকাশ করে অপারেশন ইনসানিয়াত চালু করেছেন। এ কর্মসূচির মধ্যে ছিল বাংলাদেশে খাবার ও ত্রাণসামগ্রী পাঠানো।


আরেকটি যুক্তিও শোনা যায়। কারো কারো প্রচার করা ওই যুক্তিটি হলোÑ রোহিঙ্গারা হলো মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। প্রতিটি দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখেও তাদের সীমানার ভেতরে বাড়াবাড়ি রকমের মানবাধিকার দলন নিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকা যায় না। তা ছাড়া ভারতীয় সংবিধানে (অনুচ্ছেদ ৫১ক) বলা হয়েছে, ভারতকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিকশিত করতে হবে। আর অনুচ্ছেদ ৫১গ-এ আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির বাধ্যবাধকতা পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এসব লঙ্ঘন করা হবে নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া। 
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপনিবেশ আমল থেকে রোহিঙ্গারা জাতিগত পরিচিতি ও নাগরিকত্ব সঙ্কটে ভুগছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে ভারতকে অবশ্যই সঙ্ঘাতের মূল কারণ শনাক্ত ও রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসতে হবে। একমাত্র শান্তিপূর্ণ প্রতিবেশীই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। 


লেখক : ভারতীয় শিক্ষাবিদ এবং মানবাধিকার কর্মী
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.