সন্ত্রাস নিয়ে অপপ্রচার
সন্ত্রাস নিয়ে অপপ্রচার

সন্ত্রাস নিয়ে অপপ্রচার

মঈনুল আলম

পাশ্চাত্য সমাজের অনেক ন্যায়নীতিসচেতন নাগরিক প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো মুসলিম দ্বারা সংঘটিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে কেন পাইকারিভাবে ‘ইসলামিক টেরোরিজম’ অথবা ‘ইসলামিস্ট টেরোরিজম’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে? কেন এই প্রবণতা?

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি সৌদি আরব সফরকালে তার ভাষণে ‘ইসলামিক এক্সট্রিমিজম’ উল্লেখ করেন। তার ভাষণলেখক ‘ইসলামিস্ট এক্সট্রিমিজম’ লিখে দিয়েছিলেন। ট্রাম্প ‘ভুল করে’-এর স্থলে ‘ইসলামিক’ শব্দটি উচ্চারণ করেন।

‘ইসলামিস্ট’ বা ‘ইসলামিক’ যে শব্দই হোক, এভাবে সন্ত্রাসকে বাস্তবে ইসলাম ধর্মেরই একটি অবিচ্ছেদ্য কর্মকাণ্ডরূপে পাশ্চাত্যের সাধারণ মানুষের মনে ধারণা সৃষ্টি করার অপপ্রয়াস চলছে।
কানাডার বৃহত্তম সংবাদপত্র ‘টরন্টো স্টার’-এর কলামিস্ট পারদকার এই প্রয়াসের কঠোর সমালোচনা করেছেন। ২৪ মে (২০১৭) প্রকাশিত তার কলামে শিরোনাম হচ্ছে ‘‘সন্ত্রাসীদের ‘ইসলামিক’ এবং ‘ইসলামিস্ট’ বলে অভিহিত করা আমাদের বন্ধ করতে হবে” (We should stop labeling terrorists as ÔIslamic’ and ‘Islamist’’)। তিনি প্রশ্ন করেছেন, “কোনো সন্ত্রাসীর উল্লেখ করাকালে কোনো-না-কোনোভাবে ইসলামকে কেন টেনে আনা হয়? প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী (যুক্তরাষ্ট্রে) ‘কু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান’ সন্ত্রাসীদের কি কখনো খ্রিষ্টান সন্ত্রাসী দল বলে উল্লেখ করা হয়েছে?”

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে প্রকৃতপক্ষে ক’জন মুসলিমের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে? যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক জরিপে প্রকাশ পেয়েছে, ২০১১ থেকে ১৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যে ৮৯টি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তার মাত্র ১১টি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে মুসলিমরা। বাকি ৭৮টি সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটিয়েছে অমুসলিমরা। কিন্তু তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে কেউ ‘খ্রিষ্টান সন্ত্রাসী কর্ম’ বলে অভিহিত করেনি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০১৫ সালে যে ২১১টি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটে, তার বেশির ভাগই ঘটিয়েছে অমুসলিম, ইউরোপীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। ইউরোপে কথিত জঙ্গিদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যেমন বাড়ছে, তার পাশাপাশি বাড়ছে শে^তাঙ্গ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যদি কোনো মুসলিম ঘটায়, পাশ্চাত্যের মিডিয়াতে এর প্রচারণা সাড়ে চার গুণ বেশি হয় অমুসলিম সন্ত্রাসীর কর্মকাণ্ডের প্রচারণার তুলনায়!

পারদকার ২০১৫ সালের একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। নেদারল্যান্ডসের দু’জন শ্বেতাঙ্গ নাগরিক ডাচ ভাষায় অনূদিত খ্রিষ্টানদের পবিত্র গ্রন্থ বাইবেলের একটি কপিকে পবিত্র কুরআনের মলাট পরিয়ে ‘এটা মুসলিমদের কুরআন’ বলে শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিদের হাতে দিয়ে তা থেকে কিছু বাছাই করা প্যারাগ্রাফ পড়তে বললেন। তারা উচ্চকণ্ঠে পড়লেন, ‘আমি কোনো স্ত্রীলোকের পাঠ গ্রহণ করা অনুমোদন করি না... কোনো স্ত্রীলোক যদি অবাধ্য হয়, তার হাত কেটে ফেলবে...’। এগুলো শুনে শ্রোতারা ‘ইসলাম ধর্ম কী নিষ্ঠুর’ বলে ধিক্কার দিতে লাগল। অথচ কথাগুলো ছিল বাইবেলের, বইটাও ছিল বাইবেল! এভাবে পাশ্চাত্যের কোনো কোনো মহল পরিকল্পিতভাবে ইসলামকে ‘সন্ত্রাসের ধর্ম’ বলে প্রচারের অপপ্রয়াস চালাচ্ছে।
ওবামা প্রশাসনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা কুইনটন ভিকটরোভিজ (uinton Wiktorowicz) ‘জিহাদি’ আন্দোলন নিয়ে অনেক বছর গবেষণা করেছেন। তিনি সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় লিখেছেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে যেসব মুসলিম তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে, তাদের বেশির ভাগই হচ্ছে ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রিধারী এবং তাদের খুব কমসংখ্যকই ইসলামিক স্টাডিজ অধ্যয়ন করেছে। তারা ইসলাম সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না, বলা যায়।

পাশ্চাত্যে যারা ‘ইসলামে সহিংসতা অবিচ্ছেদ্য’ বলে দেখাতে চায়, তারা দ্বিমত পোষণকারীদের প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কুরআন পড়েছেন?’ যেন কুরআন পড়লেই সেখানে ইসলামের অন্তর্নিহিত সহিংসতা প্রকাশ পাবে। পারদকার উপদেশ দিয়েছেন, এ রকম প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্নকারীকে জিজ্ঞেস করবেন, ‘আপনি কি বাইবেল পড়েছেন?’ প্রশ্নকারী চুপ হয়ে যাবে।

মিডিয়ায় পাশ্চাত্যের প্রচারণায় এ রকম ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বেশির ভাগই মুসলিমরা ঘটাচ্ছে অমুসলিম শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে এবং পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে। বাস্তবতা হলো, মুসলিম হিসেবে পরিচিত সন্ত্রাসীরা তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বেশির ভাগই ঘটাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে এবং ঘটাচ্ছে মুসলিম জনসাধারণেরই বিরুদ্ধে।

গত ৩০ মে কাবুলে সন্ত্রাসীদের বোমা বিস্ফোরণে নিহত ৯০ এবং আহত ৪০০ জন। এদের সবাই মুসলিম। তুরস্কে ২০১৬ সালের শুরুতে দুটো গাড়িবোমা বিস্ফোরণে ৬৭ জন মারা গেল, সবাই মুসলিম। আবার জুন মাসে তুরস্কে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে মারা যায় ৪৫ জন। ২০১৫ সালে ইয়েমেনে একটি মসজিদে বোমা বিস্ফোরণে ১৪০ জন মুসল্লি মারা গেলেন! ২০১৫ সালে সৌদি আরবে একটি মসজিদে বোমা বিস্ফোরণে মারা গেলেন ২১ জন মুসল্লি।

পারদকার তার কলামে লিখেছেন, সন্ত্রাসীদের ‘সন্ত্রাসী’ই বলতে হবে। মুসলিম সন্ত্রাসীদের ‘ইসলামিক’ অথবা ‘ইসলামিস্ট’ অথবা ‘মুসলিম’ বলে প্রচারণা চালানো হবে, অথচ অমুসলিম সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে তাদের ধর্মের উল্লেখই থাকবে না, এ ধরনের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি যেটা পাশ্চাত্যে প্রচলিত হচ্ছে, তা সন্ত্রাস দমনে কোনোই সহায়ক হবে না। বরং আন্তঃসম্প্র্রদায় সন্দেহ ও বিদ্বেষ ঘনীভূত হয়ে পাশ্চাত্যের জনগণের নিরাপত্তাকে ক্রমবর্ধমান হুমকির সম্মুখীন করবে।

লেখক: প্রবীণ সাংবাদিক, প্রবাসী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.