রোহিঙ্গারা বলছেন, নিজেরা কষ্ট করছি তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু বাচ্চারা যখন খাওয়ার অভাবে কান্নাকাটি করে, নানা অসুখে কাঁদে তখন কষ্ট বেড়ে যায়।
রোহিঙ্গারা বলছেন, নিজেরা কষ্ট করছি তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু বাচ্চারা যখন খাওয়ার অভাবে কান্নাকাটি করে, নানা অসুখে কাঁদে তখন কষ্ট বেড়ে যায়।

নাগরিক অধিকার নিয়ে দেশে ফিরতে চান রোহিঙ্গারা

গোলাম আজম খান, কক্সবাজার (দক্ষিণ)

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া নিপীড়িত রোহিঙ্গারা দ্রুত ফিরতে চান নিজের দেশে। খেটে খাওয়া মানুষগুলো বাংলাদেশের শরণার্থী ক্যাম্পে নির্দিষ্ট এক জায়গায় বন্দি জীবন যাপনের আগেই তারা মিয়ানমারে গিয়ে স্বাধীন জীবনযাপন শুরু করতে চান। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংসতা থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা পাহাড়ে, বনে-জঙ্গলে, রাস্তার ধারে, নদীর পাড়ে ও ত্রিপলের ছাউনীর নিচে গাদাগাদি করে দিনাতিপাত করছেন।

আজ বুধবার সকালে উখিয়ার থাইংখালী অস্থায়ী ক্যাম্পের তাঁবুতে দেখা গেছে, বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে। পেটে ক্ষুধার পাশাপাশি সর্দিজ্বরে আক্রান্ত এসব শিশু। তাঁবুগুলোতে দেখা গেছে, নানা ধরনের সমস্যা আর দুর্ভোগ। ত্রাণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এখনো শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। চালু হয়নি রেশনিং পদ্ধতি। ডাল পেলে চাল নেই, আবার সবকিছু আছে কিন্তু লাকড়ি নেই। রোহিঙ্গারা জানালেন এভাবে তো থাকা যাচ্ছে না। তাই তারা তাদের দেশে দ্রুত ফিরতে চান। ঝড় বৃষ্টি ও রোদে তাঁবুতে অনেক কষ্টে দিন যাচ্ছে তাদের।

রোহিঙ্গারা বলছেন, নিজেরা কষ্ট করছি তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু বাচ্চারা যখন খাওয়ার অভাবে কান্নাকাটি করে, নানা অসুখে কাঁদে তখন কষ্ট আরো বেড়ে যায়।

তারা আরো জানান, ‘বাঁচার অধিকার পেলে আমরা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। মুসলিম রোহিঙ্গা হিসেবে বেঁচে থাকতে চাই। মিয়ানমারে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি করে দেয়ার জন্য বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানান তারা।

সুত্র জানায়, ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বৌদ্ধ সরকার বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করে আসছে। ২৫ বার বড় বড় অভিযান চালিয়ে মিয়ানমার সরকার ও বিভিন্ন বাহিনী মুসলিম এ জাতিগোষ্ঠীকে উৎখাত করার চেষ্টা করছে। গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, চাঁদাবাজী, আটক বাণিজ্য, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম আদায়সহ উচ্ছেদের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের উপর অমানষিক নীপিড়ন চালিয়েছে হানাদার বাহিনী।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গণহত্যা থেকে বাঁচতে রোহিঙ্গারা ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। পরে আবার ফিরেও গেছেন অনেকে। বিশেষ করে ১৯৯২ সালের পর হাজার হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে গেছেন। কিন্তু চলতি বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকে এমন রোহিঙ্গার ঢল কখনো চোখে পড়েনি। গত দেড় মাসে পাঁচ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এখনো হাজার হাজার রোহিঙ্গা আসছেন।

মিয়ানমারের যাদের গোয়ালভরা গরু, গোলাভরা ধান, দীঘি ভর্তি মাছ ও বড় বড় কাঠের বাড়ি ছিল আজ তারা শূন্য হাতে বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন। ত্রাণই তাদের একমাত্র ভরসা। এরকম মানবেতর অবস্থায় তারা কেউ থাকতে চান না। ফিরে যেতে চান নিজের দেশে। তবে ফিরে যাওয়ার পূর্বশর্তও রয়েছে রোহিঙ্গাদের।

কতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা মৌলভি জলিলুর রহমান বলেন, ‘একজন নাগরিকের যেসব অধিকার পাওয়ার কথা, সেসব অধিকার আমাদেরকে দিলে আমরা ফিরে যাবো।’

মংডু কাইন্দাপাড়ার আবু তাহের বলেন, ‘আমাদের নাগরিক অধিকার এবং নিরাপত্তা, পুড়িয়ে দেয়া ঘরবাড়ির ক্ষতিপূরণ ও জমি-জমা কাগজে কলমে লিখে ফিরিয়ে দিলে ফিরে যাবো।’

মংডুর ইয়াসমিনের পিতাকে খুন করেছে মিলিটারি। ইয়াসমিন বলেন, ‘লেখাপড়া ও পড়ালেখা শেষ করে চাকরি করার অধিকার, জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে আমরা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই।’

শীলখালীর আয়েশা জানান, তার কোনো শর্ত কিংবা দাবি নেই। শুধু স্বামী সংসার সন্তান নিয়ে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার খেয়ে বাঁচতে পারলে হয়।

সহজ সরল রোহিঙ্গাদের কোনো উচ্চাভিলাষ ও অতিরিক্ত চাহিদা নেই। অন্য দেশের নাগরিকদের মতো তারাও সব নাগরিক অধিকার নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের আদি বাসিন্দা হলেও কৌশলে তাদের নাগরিক অধিকারসহ সব অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে মিয়ানমার সরকার। তাদেরকে এক প্রকার বন্দি জীবনে আবদ্ধ রাখে প্রশাসন।

নির্যাতন-নিপীড়ন ধর্ষণ, গণহত্যা ও বাড়ীঘর পুড়িয়ে দেয়ার পর একেবারে নি:স্ব হয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া এবং গণহত্যা বন্ধের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মিয়ানমার সরকারকে চাপ দিচ্ছে। সেই চাপ থেকে মুক্ত হতে মিয়ানমার সরকার বাধ্য হয়ে বাংলাদেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলেছে। কিন্তু তার পরও গণহত্যা, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগ বন্ধ করেনি মিয়ানমার প্রশাসন। গত মঙ্গলবারও প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা বুচিডং এলাকা থেকে বাংলাদেশে এসেছেন। এখনো নাফ নদীর পাড়ে ২৫ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় সন্ধান করছেন।

এক রোহিঙ্গা জানান, ১৯৭৮ এবং ১৯৯২ সালে নির্যাতন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়েছিলো মিয়ানমার সরকার। কিন্তু নেয়ার পর নির্যাতনের মাত্রা দ্বিগুণ করেছে। এবারও ফিরিয়ে নিয়ে সাইলেন্ট কিলিং করে রোহিঙ্গা নির্মূল করবে বলে আশঙ্কা তাদের। এবার তারা নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধ করে নাগরিকত্ব প্রদান, মগদের সাথে সমঅধিকারে বাঁচার সুযোগ ও মিয়ানমারের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত চলাফেরার অধিকার চাইছেন।

কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা বিশ্ব সম্প্রদায় ও মিয়ানমার সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সম্প্রতি ২১ দফা দাবি তুলে ধরেছে। এসব দাবি পিভিসি সাইনবোর্ডে বাংলা ও ইংরেজিতে উল্লেখ করে উখিয়া উপজেলার কুতুপালং, বালুখালী, জামতলী, থাইনখালী ও টেকনাফ উপজেলার লেদা শরনার্থী শিবিরের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করেছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.