মিয়ানমারে জেনারেলদের বিচার কি সম্ভব

আলমগীর কবির

গত ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যে হত্যা, নির্যাতন, নারীদের সম্ভ্রমহানি, সম্পদ কেড়ে নেয়া আর গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী যে নিধনযজ্ঞ চালায়; এখনো বন্ধ হয়নি। এই অবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সেনাকর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাদের বিচার করার প্রস্তাব করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিচার কি চলমান বৈশ্বিক অবস্থার মধ্যে সম্ভব?
কারণ রাশিয়া, চীন ও ভারতের প্রত্যক্ষ সমর্থন রয়েছে দেশটির সেনাবাহিনীর ওপর। আর মিয়ানমারের জেনারেলরা রোহিঙ্গা ইস্যুকে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পটভূমি থেকে মূল্যায়ন করে থাকে। জেনারেলরা কেন্দ্রীয়ভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখা এবং ক্ষমতা নিরঙ্কুশকরণে বিশ্বাসী। তারা ভুলভাবে মনে করে থাকে, পশ্চিম মিয়ানমারে কখনো মুসলমান উপস্থিতি ছিল না। তাই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের কেউ নয়, বরং রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি একটি হুমকি। এই হুমকি মোকাবেলা করতে চীন, রাশিয়া ও ভারত দেশটিকে সাহস দিচ্ছে। এই সাহস দেয়ার পেছনে তিন দেশের লক্ষ্য প্রায় অভিন্ন।
রাখাইন রাজ্যের গ্যাস-তেল একা চীন ভোগ করবে, রাশিয়া চায় না। চীন মিয়ানমারের সাথে সরাসরি সড়ক ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ নির্মাণ করেছে। পেছনে পড়ে মিয়ানমারকে নিজেদের পকেটে রাখতে রাশিয়া সামরিক বাণিজ্যের পথ ধরেছে। ২০০১ সাল থেকেই রাশিয়া মিয়ানমার বিমানবাহিনীকে তাদের অত্যাধুনিক মিগ-২৯ যুদ্ধ বিমান সরবরাহ করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে তারা পাঠিয়েছে হেলিকাপ্টার গানশিপ ও সামরিক পরিবহন হেলিকাপ্টার। সব কিছু বিবেচনায় এ কথা বলা অন্যায় হবে না যে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাশিয়ার একটি নিয়মিত কায়েন্ট। আর ভারত সীমান্তে নিজ দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে মিয়ানমারের সাথে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছে।
অর্থাৎ মিয়ানমারকে নিয়ে বিশ্বশক্তিগুলো যে পরিষ্কারভাবে দুই দলে বিভক্ত সেটা আলাদাভাবে বুঝানোর কিছু নেই। ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলস কর্মকর্তারা যখন মিয়ানমার জেনারেলদের বিচারের কথা বলেন, তখন কি এই বিষয়গুলো মাথায় রাখা হয়নি। উত্তরটা হলোÑ বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এ কারণেই বিচারের জন্য আরো কিছু দিন সময় নিতে চান তারা। মাঝখানের সময়টায় রাখাইনে সহিংসতায় তিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য সহায়তা বাড়ানোরও আলোচনা চলছে। এক মাস আগেও এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি আলোচনায় ছিল না। এতেই প্রমাণ হয়, সেনাবাহিনীর নির্যাতনে মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে যাওয়া পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের কতটা চাপে ফেলেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সেনাবাহিনীর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বিশ্বজুড়ে যখন শান্তিতে নোবেলজয়ী গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সু চির সমালোচনা চলছে, তখন পশ্চিমা কূটনীতিকদের মধ্যে খুব কম জনই তার (সু চি) বিকল্প দেখতে পাচ্ছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ১৬ অক্টোবর মিয়ানমার প্রসঙ্গে বৈঠকে বসবেন; যদিও তারা মনে করছেন না শিগগির নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে কোনো পদপে নেয়া হবে। মিয়ানমার নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আলোচনা সম্পর্কে অবগত দুই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হাইয়াংসহ কয়েকজন জেনারেল এবং রোহিঙ্গাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার অভিযোগে রাখাইন বৌদ্ধ মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিবেচনা চলছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হলে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ জব্দ, যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ নিষিদ্ধ, তাদের সাথে আমেরিকানদের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধসহ আরো কিছু বিষয় আসতে পারে। মার্কিন ওই দুই কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি নিয়ে ইউরোপ, জাপান ও দণি-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সরকারের সাথে আলোচনার কারণে ওয়াশিংটন এ বিষয়ে সাবধানতার সাথে এগোচ্ছে। তারা এ বিষয়ে একমত যে সমস্যার মূলে সেনাবাহিনী, বিশেষত কমান্ডার ইন চিফ, যাকে যেকোনো শাস্তিমূলক পদেেপ ‘টার্গেট’ করা দরকার। ১৮ মাস আগে সু চি মতায় আসার পর মিয়ানমারের সাথে পশ্চিমাদের সুসম্পর্ক দেখা দিলেও চীনের তুলনায় তেমনটা নয় বলে স্বীকার করেন কূটনীতিকেরা। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের তেমন বিনিয়োগ নেই, সামরিক সংশ্লিষ্টতাও কম।
২০১২ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সরাসরি দেশ পরিচালনা থেকে সরে দাঁড়ালে দেশটির ওপর থেকে ইইউ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। তবে নব্বইয়ের দশক থেকে চলে আসা অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল আছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের ওপর থেকে বেশির ভাগ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা রেখেছে। ওয়াশিংটনে নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা না থাকলেও আগামী নভেম্বরের প্রথমার্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এশিয়া সফরের সময় মিয়ানমার বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার পরিকল্পনায় পৌঁছানোর আশা করছে ওয়াশিংটন। ওই কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে একটি কড়া বার্তা দিতে চাইছে প্রশাসন। কিন্তু পাছে না এই বার্তাই আবার দেশটির ওপর চীনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরো বাড়িয়ে দেয়ার সুযোগ করে দেয়Ñ তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। হ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.