মস্কো-রিয়াদ সম্পর্কে নতুন মাত্রা সৌদি বাদশাহর রাশিয়া সফর

আনিসুর রহমান এরশাদ

যুক্তরাষ্ট্রের একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব এখন মস্কোমুখী। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন শক্তির শূন্যস্থান পূরণই রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের এই নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। রাশিয়া এখন মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছে। আর তেল, সিরিয়া ও ইরান ইস্যুতে রাশিয়াকে পাশে চায় সৌদি আরব। এসব কারণে দুই আঞ্চলিক শক্তির কাছেই এ সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরব ও রাশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রায় ১ শ’ বছরের মধ্যে এটিই কোনো সৌদি বাদশার প্রথম মস্কো সফর। সিরিয়া ইস্যুতে তীব্র মতপার্থক্য ও জ্বালানি তেলের েেত্র পুরনো শত্রুতা সত্ত্বেও এ সফর দেশ দু’টির মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সৌদি আরবের স্নায়ুযুদ্ধের সময়কাল থেকে রাশিয়ার সঙ্গে একধরনের দূরত্ব ছিল। এই সফরের মাধ্যমে সেই বরফ ভালোভাবেই গলেছে।
অস্ত্র ও জ্বালানি চুক্তি সম্পাদন করেছে রিয়াদ ও মস্কো, যা সৌদি আরবের প্রতিরাব্যবস্থাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাবে। ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারে রাশিয়ার কাছ থেকে সর্বাধুনিক বিমান প্রতিরাব্যবস্থা এস-৪০০ ক্রয় এবং পেট্রোকেমিক্যাল খাতে ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের চুক্তিই দুই দেশের সম্পর্কের দৃশ্যমান অগ্রগতির প্রমাণ। ৩৬০টি ইন্টারসেপ্টর মিসাইল, সাতটি রাডার, ট্যাংকবিধ্বংসী পেণাস্ত্র ও বেশ কয়েকটি রকেট লঞ্চারসহ বিপুল সমরাস্ত্র কিনছে সৌদি আরব। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দরপতন ঠেকাতে উভয় দেশের মধ্যে জ্বালানি চুক্তিও স্বারিত হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল রফতানিকারক দেশ দু’টি তেল উত্তোলন সীমিত করতে ‘ওপেক’ চুক্তি বর্ধিত করার ব্যাপারে একমত হয়েছে।
রাশিয়া দাবি করেছে, ‘সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির সামরিক সহযোগিতা তৃতীয় কোনো দেশের জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে না।’ সৌদি আরবের সামরিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘সৌদি অ্যারাবিয়ান মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিজ’ বলছে, ‘সৌদি আরব প্রাথমিকভাবে রাশিয়ার এস-৪০০ বিমান প্রতিরাব্যবস্থা ও ট্যাংকবিধ্বংসী মিসাইল সিস্টেম ক্রয় করতে সম্মত হয়েছে, দেশটি থেকে ‘কাটিং এজ টেকনোলজি’ গ্রহণ করা হবে। তাদের দেশের সেনাবাহিনী ও সামরিক ব্যবস্থার উন্নতিতে এসব চুক্তি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’ সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ২০১৫ সালে ঘোষণা দিয়েছিল, আগামী পাঁচ বছরে তারা রাশিয়াতে এক হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ চুক্তিগুলোর ব্যাখ্যায় বলেন, এগুলো কেবল প্রথাগত জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পরমাণু শক্তির ব্যাপারেও কার্যকর হবে। এ ছাড়া মহাকাশ অভিযান, কৃষি-শিল্প এবং অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতেও কার্যকর হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে, ইরানের প্রভাব বাড়ছে; তখন সৌদি আরবের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের বিশেষ তাৎপর্য আছে। ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ বলেন, ‘এই সফরে আমাদের আশাবাদের প্রধান দিকটি হচ্ছে, এটা দ্বিপীয় সম্পর্ক উন্নয়নে একটি নতুন ও শক্তিশালী মাত্রা যুক্ত করবে।’ জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের রুশ-মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মার্ক এন কাতজ বলেন, ‘সৌদি আরব চায় ইরান বিষয়ে সহায়তা আর রাশিয়া চায় বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে। ফলে তারা একে অপরের কাজে আসবে।’
এক বিবৃতিতে বাদশাহ সালমান বলেন, ‘এই সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা বদ্ধপরিকর, অঙ্গীকারবদ্ধ। শান্তি ও সুরা নিশ্চিত করার জন্য আমরা এ দ্বিপীয় সম্পর্ককে জোরদার করার ল্েয কাজ করছি। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিরও উন্নয়ন ঘটবে। প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি বজায় রাখার বিষয়ে আলোচনা করেছি।’ সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবায়ের বলেছেন, রাশিয়া সৌদি আরবের ‘বন্ধুরাষ্ট্র’। তাই মস্কোর সাথে সব েেত্র সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী রিয়াদ। সৌদি-রাশিয়া সহযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যের বহু সমস্যার সমাধান করবে। রাশিয়া ও সৌদি আরব এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে পৌঁছেছে।’
মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থায়িত্বের ওপর জোর দেয়া এবং ইয়েমেন, সিরিয়ার সঙ্গে প্রতিবেশী হিসেবে ভালো সম্পর্ক রা করায় বাদশাহ সালমানের প্রশংসা করেছে মস্কো। ক্রেমলিনে নিজ বাসভবনে বাদশাহর সাথে বৈঠকের পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে সৌদি আরবের কোনো বাদশাহর এটিই প্রথম রাশিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফর। আজ থেকে ৯০ বছর আগে ১৯২৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সৌদি রাজতন্ত্রকে স্বীকৃতি দেয়। তাই আমাদের জন্য এ সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়াসহ এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা চায় সৌদি আরব। সৌদি আরব সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরোধিতায় সোচ্চার ছিল; অথচ আসাদের প্রধান সহযোগী রাশিয়া। ইয়েমেনে ত্রাণবাহী বিমান পাঠানোর ফলে রাশিয়ার সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি হয়। তবে এখন আর সৌদিরা আসাদকে মতা থেকে সরাতে চায় না এবং সিরিয়াকে রাশিয়ার সামরিক সহায়তার বিষয়েও সমালোচনা করছে না। সৌদি আরব এখন শান্তি আলোচনার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনাও করছে। সিরিয়ায় রাশিয়া, ইরান ও তুরস্ক যে ‘সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠা করেছে সে ব্যাপারেও সুর নরম করেছেন সালমান। রাশিয়াও সিরিয়া প্রশ্নে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে সৌদি আরবকে পাশে চায়। সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন কমাতে সিরিয়া থেকে রাশিয়া সেনা প্রত্যাহারও করেছে। এখন মস্কো জেরুসালেম, সিরিয়া ও লেবাননে ইরানের হস্তপেজনিত হুমকির বিষয়ে সৌদি আরবের উদ্বেগ কতটুকু আমলে নেবে তাই দেখার বিষয়।
অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, ‘রাশিয়া থেকে রিয়াদের বিমান প্রতিরাব্যবস্থা কেনার ঘোষণা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে চিন্তিত করে তুলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য কমে যাওয়ার শঙ্কা থেকেই রিয়াদের এই রাশিয়া-তোষণ। এটিও সৌদি বাদশার রাশিয়া সফরের নেপথ্যে কারণ।’ রাশিয়া থেকে বিমান প্রতিরাব্যবস্থা কিনতে সম্মত হওয়ার এক দিন পরই সৌদি আরবের কাছে উন্নত প্রযুক্তির টার্মিনাল হাই-অ্যালটিটুড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) পেণাস্ত্র প্রতিরাব্যবস্থা বিক্রিতে অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। রাশিয়ার বিষয়ে সৌদি আরবের আন্তরিক হওয়ার পেছনে কিছু কিছু েেত্র চাপ হিসেবে কাজ করেছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রুশ সমর্থিত বাশার সরকারের সফলতা ও সৌদি সমর্থিত বিদ্রোহীদের পিছু হটা।
রিয়াদ ও মস্কোর মধ্যে শীতল সম্পর্ক বিরাজের অবস্থা হঠাৎ করে হয়নি। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য পড়ে যাওয়া রোধ করার প্রয়োজন থেকেই দু’টি দেশ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও পরস্পরের আরো কাছাকাছি আসতে শুরু করে, যে সম্পর্ক দ্রুত গভীর হয়ে উঠতে থাকে। দু’টি দেশই ২০১৮ সালের মার্চের শেষ পর্যন্ত তেলের উৎপাদন হ্রাস করার বিষয়ে ওপেক ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনে সহায়তা করেছে। সৌদি আরব ২০১৫ সাল থেকে রাশিয়ার সঙ্গে বড় ধরনের অস্ত্র চুক্তি করার চেষ্টা করছে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবায়ের বলেছিলেন, তিনি ‘রাশিয়ার সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কোন্নয়ন করতে চান।’
সৌদি বাদশাহর সফর শুধু সফর নয়, মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার ভাবমূর্তির পরিবর্তনে এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ইরান হলো সৌদি আরবের শত্রু অথচ সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে সুন্নি শিবিরের নেতা। ইসরায়েল সৌদি আরবের প।ে এমতাবস্থায় সিরিয়ায় ইরানের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে রাশিয়া বেকায়দায় পড়েছিল। রাশিয়া শুধু সিরিয়া বা ইরানের বন্ধু হতে চায় না। অপর দিকের্ ‘ইসরাইলও একজন খেলোয়ার।
সৌদি আরব রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির দেশ। রিয়াদ খুব ভালো করেই বোঝে, মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক সংহত করার মানে এই নয় যে তার ঐতিহাসিক সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রকে পরিত্যাগ করতে হবে। রিয়াদ-ওয়াশিংটন সম্পর্ক অনেক বেশি গভীর ও কৌশলগত কারণে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার অর্থ হলো, সীমিত পরিসরের বিদ্যমান জোটগুলোর বাইরে গিয়ে রিয়াদ তার জাতীয় স্বার্থকে আরো বড় পরিসরে দেখতে চায়। কারণ সীমিত পরিসরের জোটগুলোর মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। হ

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.