ছেলের মৃত্যুরহস্য খুঁজতে পথে পথে ঘুরছেন বাবা
ছেলের মৃত্যুরহস্য খুঁজতে পথে পথে ঘুরছেন বাবা

ছেলের মৃত্যুরহস্য খুঁজতে পথে পথে ঘুরছেন বাবা

আবু সালেহ আকন

বরিশালের হিজলার এক অজপাড়াগাঁয়ের বাসিন্দা নজরুল মাঝি (৭০)। পেশায় কৃষক। রাজধানীর পথঘাটও ভালোভাবে চেনেন না। হাতেগোনা কয়েকবার এই শহরে এসেছিলেন মাত্র। তা-ও অন্যের সাথে। আর সেই শহরেই চার দিন ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ছেলের মৃত্যুরহস্য জানতে। তার বড় ছেলে আল আমিন মাঝি (৪০) খুন হয়েছেন। দুর্বৃত্তরা তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।

অথচ থানায় কোনো মামলা হয়নি, লাশের পোস্টমর্টেম হয়নি। তিনি জানতে পেরেছেন কারা তার ছেলেকে হত্যা করেছে। কিন্তু দুর্বৃত্তদের ভয়ে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি থানায় যেতে পারেননি। 
নজরুল মাঝি জানান, তার বাড়ি হিজলার লাসোকাঠী গ্রামে। একজন প্রান্তিক চাষি তিনি। পরের জমি চাষ করেন। তার বড় ছেলে আল আমিন মাঝি। চার মেয়ে এবং দুই ছেলের বাবা ছিলেন আল আমিন। ছয় সন্তান নিয়ে দিনমজুরি করে তার সংসার চলত।

ঢাকায় ডেমরার মাতুয়াইলের মোসলেম নগর এলাকার দোতলা মসজিদের সাথে একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। নজরুল বলেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর মৃত অবস্থায় তার ছেলের লাশ ঢাকা থেকে বাড়িতে নেয়া হয়। একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশটি বাড়িতে নিয়ে যায় আল আমিনের স্ত্রী ফাহিমা খাতুন ও তাদের সন্তানেরা। আল আমিনের লাশ দাফন কাফনের পর জানতে পারেন আল আমিনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ভয়ে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা কাউকে কিছু বলেননি। নজরুল বলেন, তিনি জানতে পেরেছেন; গত ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে কাজ শেষ করে নজরুল বাসায় ফিরছিলেন। বাসার সামান্য দূরে স্থানীয় সন্ত্রাসী মন্টু, জলিল ও আরিফ নিহত আল আমিনের কাছে নেশার টাকা দাবি করে। আল আমিন তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকে ওই তিন সন্ত্রাসী ধরে বেদম মারধর করে।

তাকে কিল-ঘুষি মারে এবং পায়ের নিচে ফেলে নির্যাতন করে। গুরুতর আহত হলেও আল আমিনের শরীর দিয়ে কোনো রক্তপাত হয়নি। আহতাবস্থায় তিনি বাসায় চলে যান। বাসায় গিয়ে বড় মেয়ের কাছে এসব কথা বলেন। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই আল আমিনের বুকে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। একটি সিএনজি অটোরিকশা ডেকে বাসার লোকজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন। হাসপাতালে নেয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। এ দিকে, যারা আল আমিনকে মারধর করেছে তারা আল আমিনকে হাসপাতালে নিতে দেখে ওই গাড়ির পিছু নেয়। পথে তারা গাড়ি আটকে দেয়।

সেখানে বিপ্লব নামে এক ব্যক্তিকে পাঠিয়ে আল আমিনের স্ত্রীকে বিষয়টি কাউকে না বলার জন্য হুমকি দেয়া হয়। ওই বিপ্লবই আল আমিনের স্ত্রীকে একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে দেয়। আল আমিনের লাশ মাতুয়াইলের বাসায়ও নিয়ে যেতে দেয়নি তারা। পথে থেকেই অ্যাম্বুলেন্স বরিশালের উদ্দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। রাত ৩টার দিকে আল আমিনের লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি হিজলার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। ১৪ সেপ্টেম্বর লাশটি দাফন করার পর নজরুল জানতে পারেন তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। আল আমিনের বড় মেয়ের কাছ থেকে তিনি বিস্তারিত জেনে অন্যদের কাছেও খোঁজ লাগান। সবার কাছ থেকে তিনি একই কথা শোনেন। নজরুল বলেন, কোথায় কার কাছে যাবেন, কার কাছে গেলে সন্তান হত্যার বিচার হবে তা ভেবে পাচ্ছি না।

শেষ পর্যন্ত তিনি পরিচিত এক প্রতিবেশীর সহায়তায় ঢাকায় আসেন। জিপিও এলাকায় তার এক পরিচিত লোকের কাছে গিয়ে বিস্তারিত জানালে ওই ব্যক্তি তাকে নিয়ে এই প্রতিবেদকের কাছে আসেন। নজরুল বলেন, দুই ছেলে এক মেয়ের মধ্যে আল আমিন ছিল সবার বড়। ছয় ছেলেমেয়ে নিয়ে সে ঢাকায় থাকত। মানুষের কাজ করে যে টাকা পেতো তাই দিয়ে সংসার চালাত। নেশা করার জন্য সে টাকা দিবে কোত্থেকে?


নজরুল বলেন, তিনি ঢাকায় এসেছেন ঠিকই। সন্তান হত্যার বিচারও চান। কিন্তু থানায় যেতেও তার ভয়। গতকাল পর্যন্ত তিনি থানায় যেতে পারেননি। তিনি নিশ্চয়তা চান থানায় গেলে সন্ত্রাসীরা তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তার ধারণা নিশ্চয়ই ওই সন্ত্রাসীরা খোঁজ রাখছে। থানায় গেলে তারও জীবন যেতে পারে, এই আশঙ্কা তার।


স্থানীয় সূত্র বলছে, যে এলাকায় এই হত্যার ঘটনা ঘটেছে সেটি মাদক ব্যবসায়ীদের একটি বড় ঘাঁটি। ওই এলাকা থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক সরবরাহ করা হয়। স্থানটি সন্ত্রাসীদের জন্য অভয়ারণ্য। এখানে রাজধানীর অনেক সন্ত্রাসী গিয়ে অবস্থান করে।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.