কবি হাসান হাফিজের জন্মদিনে শুভেচ্ছা

আসাদ চৌধুরী

১৫ অক্টোবর ২০১৭ কবি হাসান হাফিজের ৬২তম জন্মবার্ষিকী। কবি ও সাংবাদিক (যোগ করতে পারি সম্পাদকও) হাসান হাফিজকে চিনি- তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন থেকেই। হাসান হাফিজ বানান আর ছন্দের ব্যাপারে এতই সচেতন ও সিরিয়াস যে, কবি রফিক আজাদ তাকে পুলিন বলতেন। দেখাদেখি আমিও তাকে পুলিনবিহারী সেন বলে ডাকতাম। পুলিনবিহারী বিখ্যাত ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে রবীন্দ্র রচনাবলীর প্রুফ দেখার জন্য। বাংলা একাডেমি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছেই- বিভিন্ন কাজে, কারণে-অকারণে হাসান হাফিজ আসতেন। তার ব্যক্তিত্বটাই এমন যে, তার সঙ্গ আমরা পছন্দ করতাম। এ কারণে ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি এসব বিষয় নিয়ে লিখতেন।
দৈনিক বাংলায় পুরোপুরি সাংবাদিক হিসেবে যোগ দিলেন। দৈনিক বাংলা সরকার বন্ধ করে দিলে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে আমার দেশে। সরকার এই পত্রিকাও বন্ধ করে দেয়, আর দুইবার অগ্নিকাণ্ডের ফলে একটা প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো আমাদের সামনে ঝুলে আছে।
কবিতা ছাড়াও তিনি লিখেছেন ছড়া, কবিতায় অনুবাদ করেছেন ঈশপের নীতিকাহিনীগুলো (আমিও একটা কী দুটো অনুবাদ করেছিলাম-বেশ কষ্ট হয়, স্বীকার করি)। এই বইগুলো বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে, দেখে খুশি হয়েছি। দেশ-বিদেশের রূপকথা, লোককাহিনী সমানে অনুবাদ করে চলেছেন। হাসান হাফিজের গদ্য বেশ ঝরঝরে, বাক্যগুলোও জটিল নয়- শিশু-কিশোরদের কাছে হাসান হাফিজ যে প্রিয় হয়ে উঠেছেন, বোধহয় এসব কারণেও।
হাসান হাফিজের একক কবিতার বইয়ের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়, ৪৬টি। কবিতা সমগ্র এক দুই তিন করে চতুর্থ খণ্ড প্রকাশের অপেক্ষায়। কলকাতা থেকেও তার প্রেমের কবিতার সঙ্কলন বেরিয়েছে। দু-একটি বইয়ের নাম বলি- অবাধ্য অর্জুন, তুমি বধূ অবিবাহের, দূরে পাহাড়ের ঘুম, সকল ডুবুরি নয় সমান সন্ধিৎসু, তৃষ্ণার তানপুরা, ভালোবাসার অগ্নিচুমুক, হৃদয় বড়ো কাঁদছে, না ওড়ে না পোড়ে প্রেম, নীরবতাই অস্ত্র আমার, ধাবমান সন্ধ্যার গৌরব, ফুল পাখি নদীও বিপদে- না, আর বলছি না, কী মনে হচ্ছে এখন, এই কবির কবিতা না-পড়লে অনুভূতির এবং অভিজ্ঞতার ভাঁজগুলোকে কি চেনা যাবে! তার সাম্প্রতিক একটি কবিতার বই ‘নিজেকেই এখনো চিনি না’। মুক্তি নাই নাই, নিঃশব্দে হজম করি, গোধূলির ত্রাস, প্রত্যয়ে অটুট থেকো, মানবপীড়ন যথেচ্ছাচার, গোপন দহনশিল্প, ভরসা বিশেষ নাই, উত্তর নাইÑ বেশ কয়েকবার করে পড়েছি, মিলিয়ে দেখতে চেয়েছি যে হাসান হাফিজকে আমি চিনি, অর্থাৎ চিনতাম তাহলে এ কোন হাসান হাফিজ!
হাসান একদিন আলাপ করিয়ে দিলেন স্ত্রীর সাথে, ওঁর নাম শাহীন আখতার। ওঁকে আমি পণ্ডিত বলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবদন্তিতুল্য অধ্যাপক আহমদ শরীফের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্রী ছিলেন (ওঁকে তিনি বইও উৎসর্গ করেছেন) তিনিÑ দুর্ধর্ষ মেধাবী, অধ্যাপনায় সফল। শরীফ স্যার ওঁকে মা বলতেন, তাঁর বিখ্যাত ও মূল্যবান বই বাঙালি ও বাঙলা সাহিত্য উৎসর্গ করেছেন। এই দম্পতির একটিই মাত্র সন্তান, যার নাম গৌরব, সে চিকিৎসকÑ পারিবারিকভাবে সুখী বলেই হয়তো হাসান হাফিজের মুখে সব সময় এমন অম্লান হাসিটি লেপ্টে থাকে।
সম্পাদনার কথাটি বলতেই হয়। এরই মধ্যে হাসান হাফিজের সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ত্রিশটি। এর মধ্যে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে যেসব বইÑ হুমায়ূন আহমেদ সমকালের চোখে, হুমায়ূন আহমেদ হৃদয়জুড়ে জোছনা, হুমায়ূন আহমেদ স্মারকগ্রন্থ, এক ডজন হুমায়ূন, হুমায়ূন আহমেদ আলোয় ভুবন ভরা (যে বইটির ভূমিকা লিখেছেন শ্রদ্ধেয় আনিসুজ্জামান স্যার)Ñ এই বইগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয় অকালপ্রয়াত কথাশিল্পীকে বুঝতে সাহায্য যে করবে, সন্দেহ নেই। প্রয়াত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পর্কে ‘সুনীল স্মরণে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়’ গ্রন্থটির কথা বলতেই হচ্ছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘পঞ্চাশ বছরের সাংবাদিকতা : জাতীয় প্রেস ক্লাব’ ছাড়াও দুই বাংলার প্রেমের কবিতা, মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ গল্প, ভয়ঙ্কর সব ভূতের গল্প, মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প, অদ্ভুতুড়ে ভূতের গল্প, বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ, বহুমাত্রিক নজরুল, মুক্তিযুদ্ধের সুনির্বাচিত কবিতা, মুক্তিযুদ্ধের সুনির্বাচিত গল্প, সবার সেরা ভূতের গল্প, ভূতপেতœীর শ্রেষ্ঠ গল্প এবং ২০১৪ সালে প্রকাশিত একুশের কবিতা। যৌথভাবে সম্পাদিত গ্রন্থÑ বাংলাদেশ পরিবেশচিত্র, হাজার বছরের ছড়া কবিতা, বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিতা।
একটি কবিতায় হাসান হাফিজ লিখেছেন :
এসেছি মনের ভুলে এসে কী মরেছি!
এমন আশ্চর্য পাপ একাই করেছি?
শুকনো ঝরা পাতা আমি একাই ঝরেছি
হৃদয় করুণাভাণ্ডে অমৃত ও গরল ভরেছি।
এসেছি গ্রহণ করো, করলেই মধুস্বাদ পাবে
নাহলে তোমার দিন বিরহের কটুকষ্টে যাবে।
দেশের বিভন্ন জায়গায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একসঙ্গে গিয়েছি, থেকেছি, খেয়েছি ও কবিতা পড়েছি, কতো জম্পেশ আড্ডা দিয়েছি, কত রাজা উজির মেরেছিÑতার শুমার করা মুশকিল। আশুতোষ এই মানুষটিকে আমি ভীষণ পছন্দ করি।
মেঘে মেঘে এত বেলা চলে গেছে, তাই তো। হাসান হাফিজের বয়স বাষট্টি পূর্ণ হচ্ছে এই অক্টোবরের ১৫ তারিখে। বালাই ষাট! আন্তরিকভাবে চাই হাসান হাফিজের সেঞ্চুরি হোক এবং এ কামনা করি।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.