একক ক্ষমতা পেতে যাচ্ছেন শি জিনপিং

আহমেদ বায়েজীদ

চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির ১৯তম সম্মেলন শুরু হয়েছে গতকাল। বেইজিংয়ের গ্রেট হলে সপ্তাহব্যাপী এই সম্মেলনে নির্ধারিত হবে দলটির পরবর্তী নেতৃত্ব। একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু থাকায় কমিউনিস্ট পার্টির নেতারাই চীনের সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। তাই চীনের জাতীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও এই সম্মেলনের গুরুত্ব অপরিসীম। ধারণা করা হচ্ছে জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টির বর্তমান প্রধানের দায়িত্ব পালন করা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আরো এক মেয়াদে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, এবারের সম্মেলনের পর শি হয়ে উঠতে পারেন দলের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তার ব্যক্তিগত দর্শন দলটির সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে।
প্রতি পাঁচ বছর পরপর নির্বাচিত হয় চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব। ২০১২ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথমবারের মতো পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শি জিনপিং। নিয়ম অনুযায়ী পরের বছর মার্চে শপথ নিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গত কয়েক দশকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন শি। দলের ভেতরে তার যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপ পাল্টে দিয়েছে দলটির চেহারা। সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্রমে ক্ষমতাসীন এলিটে পরিণত হতে যাওয়া কমিউনিস্ট পার্টিকে আবার সাধারণ নাগরিকদের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাপক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি। দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার দায়ে দলের ১৪ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন। অনেককে কারাগারেও পাঠিয়েছেন। এরমধ্যে এমনকি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাও ছিলেন। দলের সাংগঠনিক কাঠামোকেও ঢেলে সাজিয়েছেন শি জিনপিং। ফলে দলের সাধারণ সদস্যদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা সাম্প্রতিক অতীতের যেকোনো নেতার চেয়ে বেশি। আবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শি জিনপিং অর্জন করেছেন দেশটির সাধারণ নাগরিকদের আস্থা। গত পাঁচ বছরে বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের যে উত্থান তা শি’র জাদুকরী নেতৃত্বেরই ফসল। বড় আকারের দু’টি সামরিক মহড়া দেশটির সামরিক বাহিনীর শক্তি ও উন্নতি উপস্থাপন করেছে, যা বিশ্বশক্তি হিসেবে চীনের অবস্থানকে আরো সংহত করেছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে চীনের অবস্থান অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে এই সময়ে। রাষ্ট্রনেতা নির্বাচনে চীনের সাধারণ নাগরিকদের মতামতের কোনো মূল্য না থাকলেও সাধারণের মধ্যে শি’র যে গ্রহণযোগ্যতা তার একটি পরোক্ষ ভূমিকা না থেকেই পারে না।
কিছু বিষয়ে সমালোচনাও হচ্ছে শি’র। বিশেষ করে দুর্নীতি দমনের নামে দলে তার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন করেছেন তিনি। এমনিতেই চীনে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু শি’র সময়ে সেটি কঠোর থেকে কঠোরতর হয়েছে। মানবাধিকার আইনজীবী ও কর্মীদের অনেকের ওপর নেমেছে নির্যাতনের খড়গ। জিন জিয়াংসহ বেশ কিছু অঞ্চলে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর চলছে ব্যাপক নির্যাতন। অভিযোগ আছে শি তার ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজনদের দলীয় নেতৃত্বে নিয়ে এসেছেন বলেও।
এবারের কাউন্সিলে শি আবারো দলীয় প্রধানের পদে মনোনীত হচ্ছেন তা অনেকটাই নিশ্চিত। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ স্ট্যান্ডিং কমিটিতে শি’র ঘনিষ্ঠরাই নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন বলেও শোনা যাচ্ছে। দলে এখন তার যে প্রভাব সেটি আরো জোরদার হবে সামনের বছরগুলোতে। বর্তমানে পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি মর্যাদায় দলীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও এবার তিনি চেয়ারম্যান পদমর্যাদায় উন্নীত হতে পারেন। আর তেমনটি হলে শি জিনপিং হবেন ১৯৮৯ সালের পর কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান পদে প্রথম কোনো নেতা। এর আগে মাও সে তুংসহ মাত্র তিনজন নেতা কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যানের মর্যাদা পেয়েছিলেন। পার্টিতে চেয়ারম্যান একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে দল পরিচালনা করতে হয় স্ট্যান্ডিং কমিটির পরামর্শে, বিভিন্ন বিষয়ে তাদের কাছে জবাবদিহিও করতে হয়। যেটি মূলত সম্মিলিত নেতৃত্ব। কিন্তু চেয়ারম্যান একক ক্ষমতায় দল পরিচালনা করার অধিকার রাখেন, কারো কাছে জবাবদিহিও করতে হয় না তাকে। দলে শি জিনপিংয়ের যে প্রভাব ও দলের বাইরে তার যে গ্রহণযোগ্যতা তাতে এই বিষয়টি সম্ভাব্য বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত দর্শনও দলের সংবিধানে যুক্ত হতে পারে। সব কিছু মিলে শি জিনপিং হয়তো চীন ও দেশটির ক্ষমতাসীন পার্টির একক অধিপতি হিসেবেই অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছেন। বেইজিংয়ের সিংগুয়া ইউনিভার্সিটির সাবেক প্রফেসর উ কিয়াং বলেন, ‘সম্মিলিত নেতৃত্ব ব্যবস্থা সরিয়ে শি একক নেতৃত্বের স্বৈরশাসন শুরু করতে যাচ্ছেন। তিনি নিরাপত্তা, সামরিক ও অর্থ ব্যবস্থার সংস্কার করেছেনÑ যাদের সবাইকে এখন তার কাছেই জবাবদিহি করতে হয়। দলকেও পাল্টে দিতে চলেছেন তিনি’। কয়েক বছর আগে শি’র নীতি ও দর্শনের প্রশংসা করে নিবন্ধ রচনা করতে অস্বীকৃতি জানানোয় এই প্রফেসরকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। লন্ডনের স্কুল অব অরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ স্যাং মনে করেন, শি জিনপিং ‘আমিই চীন’, ‘আমিই কমিউনিস্ট পাটি’ এ দর্শনে বাদশাহদের মতো নেতৃত্ব নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন।
কমিউনিস্ট পার্টিতে শি জিনপিংয়ের ক্ষমতা আরো সংহত হলে তার প্রভাব পড়বে সর্বত্র। চীনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা, অর্থনীতি, সামরিক ব্যবস্থা এমনকি বিশ্ব ক্ষমতার রাজনীতিতেও। নিজের মতো করে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের একক ক্ষমতা পাবেন শি। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন এর সুদূরপ্রসারী একটি প্রভাব পড়বে চীনের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও দর্শনে। এমনিতেই চীনের উত্তরোত্তর সাফল্যের পথে চালিত করার কারণে দেশটির সাবেক দুই নেতা মাও সেতুং ও ডেং জিয়াওপিংয়ের নামের সাথেই উচ্চারিত হচ্ছে শি’র নাম। আগের দুই নেতা বিশেষ করে ডেং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়ে কিংবদন্তি হলেও শি তার সাফল্যকে বিস্তৃত করেছেন অনেক ক্ষেত্রে। জাতীয় অর্থনীতিতে তার ‘সবাইকে নিয়ে অগ্রসর’ হওয়ার পরিকল্পনা জনগণের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। জাতীয় অর্থনীতির পাশাপাশি চীন এখন বৈশ্বিক অর্থনীতিরও সবচেয়ে বড় শক্তি। ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে চীনের অর্থনীতি বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। এশিয়া অঞ্চলে চীনের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রভাব দিন দিন বেড়েই চলছে। ফিলিপাইন, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ অনেক দেশই এখন চীনমুখী হয়ে পড়েছে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কাওয়াশিমা শিন মনে করেন, ‘অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন একটি ‘শি যুগে’ প্রবেশ করতে যাচ্ছে চীন’। চীনা সামরিক বাহিনীর পদক্ষেপ পড়তে যাচ্ছে সুদূর আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে। এসব কারণে শি জিনপিং তার ক্ষমতার নতুন মেয়াদে সারা বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
সমালোচকদের কাছে শি জিনপিংয়ের নতুন এই পরিকল্পনা স্বৈরতন্ত্র হিসেবে বিবেচিত হলেও তার সমর্থকেরা মনে করছেন এর ফলে শি হাত ধরে চীনের সাফল্য আরো গতি পাবে। যেমনটা বলেছেন দলটির অনানুষ্ঠানিক মুখপাত্র ভিক্টর গাও। তিনি বলেন, আমি মনে করি না, এই সম্মেলনের পর চীন একনায়কতন্ত্রের যুগে প্রবেশ করবে। এর মাধ্যমে মূলত কার্যকারিতা বৃদ্ধি ও দলের প্রতি আনুগত্যের ওপর গুরুত্বারোপ করা হবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.