এক ম্যাচেই পাল্টে গেল দৃশ্যপট

জসিম উদ্দিন রানা

একটি মাত্র ম্যাচেই পাল্টে গেল পুরো দৃশ্যপট। মুছে গেল আগের ম্যাচগুলোর হারের বেদনা ও গ্লানি। অবনমিত শির উঁচু হলো। বুক চেতিয়ে বলার সময় হলো আমাদের আর এশিয়া কাপের বাছাই পর্ব খেলতে হবে না। বাংলাদেশের হকির জন্য এটি বড় প্রাপ্তি। পাশাপাশি এ কথাটিও উঠে এলো যারা খেলে এত বড় একটি অর্জন এনে দিলেন তাদের প্রত্যাশা পূরণ হয় কি? অবনমনের একবারে শুরুর দিকে হকি দলের প্রধান কোচ মাহবুব হারুনের প্রত্যাশা ষষ্ঠ হতে চায় বাংলাদেশ। এ নিয়ে মিডিয়ায় প্রচুর মাতামাতি। পরে বাস্তবতা ও র্যাঙ্কিংয়ের নিরিখে বলা হয় ষষ্ঠ স্থান কঠিন। তখন থেকে চলতে থাকে পঞ্চম হতে অষ্টমের ইঁদুর বিড়াল খেলা। কোনো স্থানেই ওপরই জোর করে কিছু বলতে পারেননি দলের কর্তাব্যক্তিরা। চীনের একটি প্রদেশের সাথে কয়েকটি প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলার পর আত্মবিশ্বাসে একটু ভরপুর হয়ে আবারো ষষ্ঠের গুণগান। ফ্লাডলাইট ও মাঠ পরিষ্কারের জন্য দল চলে যায় মওলানা ভাসানী ছেড়ে বিকেএসপিতে। সেখানে প্র্যাকটিসে সময়মতো না আসা, নির্ধারিত সময়ে সেশন মোতাবেক অনুশীলন না করা এবং ক্যাম্পে না থাকার অভিযোগও ওঠে। যেটি কোনোভাবেই মানতে পারেননি দলের কোচ ও সহকারী কোচ। অথচ এটি সর্বজনবিদিত। মাঠকর্মী থেকে শুরু করে কর্মকর্তারাও জানেন।
এর পর থেকে শুরু হয় নানা অজুহাত। সবই নিজেদের বাঁচাতে। খেলোয়াড়দের মিডিয়ার সাথে কথা বলা নিষেধ করা হয়েছে আরো আগেই। কখনো প্র্যাকটিস ম্যাচ, কখনো টার্ফের সমালোচনা, কখনো সুযোগ-সুবিধার অজুহাত। এরপর ঘরের মাঠে ১৯৮৫ সালের এশিয়া কাপ ব্যাপক প্রচার পায়। ওই সময়ে হকি জাগরণের সাথে বর্তমানের তুলনাও চলে আসে। ওই সময় অলিম্পিক জেতা পাকিস্তান তাজা স্মৃতি নিয়ে বাংলাদেশে আসে। তাদেরকে ৬৮ মিনিট পর্যন্ত রুখে দিয়েছিল বাংলাদেশের চাকলাদার, লুলু, কিসমত, পিরু, সাব্বির ইউসুফ, চুন্নুরা। পরে একটি গোল হজম করতে হলো। পরের ম্যাচগুলোতে চীন ও জাপানের সাথে ড্র। প্রথম ম্যাচে জুম্মন লুসাইয়ের হ্যাটট্রিকে ইরানকে গুঁড়িয়ে দেয়। স্থান নির্ধারণীতে মালয়েশিয়ার সাথে হার মেনে ষষ্ঠ হয় বাংলাদেশ।
ওখানে স্থান নির্ধারণ কোনো বিষয় ছিল না। বাংলাদেশ যে ভালো খেলেছে সেটিই উঠে এসেছে। মিডিয়ার দু’টি সংগঠন সাবেক ও বর্তমানদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়ার পর থেকেই মানসিক চাপে ভুগতে থাকে বর্তমান স্কোয়াড। অতিরিক্ত চাপে পড়ে যায় তারা। শিডিউল অনুযায়ী দশম এশিয়া কাপে প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। অতীতের দোহাই দিয়ে মানসিকভাবে চাঙ্গা করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত সেটি হয়নি। কোচের কৌশলগুলোর ধারে কাছেও ছিল না জিমি বাহিনী। পাকিস্তানকে দুমড়িয়ে মুচড়িয়ে ফেলার লক্ষ্যে যে যার মতো খেলতে গিয়ে ৭টি গোল হজম করতে হয়। অথচ পরে দেখা গেল পাকিস্তানের খোলসে বর্তমান দলটি একেবারেই সাদামাটা। শুধু চাপের কারণেই বাংলাদেশ দলের এই করুণ পরিণতি। পরের ম্যাচে মুখোমুখি ভারত। যারা পরপর কয়েকটি বিগ ম্যাচে পাকিস্তানকে হারায় তারা বাংলাদেশের সাথে জিতবেÑ এটিই স্বাভাবিক। তারাও সাতবার বল পাঠায় বাংলাদেশের জালে। সাতের বেশি ভারতীয়দের যেতে দেয়নি এটাও বাংলাদেশের একটি ছোটখাটো প্রাপ্তি। তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে যেমন হারার আগে হেরেছে, তেমনটি হয়নি ভারতের বেলায়। জিমির কথায়, ‘তারা ম্যাচেই ছিলেন’। তৃতীয় ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে ৫৮ মিনিটে পর্যন্ত ১-১ গোলে ড্র। শেষ দুই মিনিটে স্ট্যামিনার অভাবে যেতে পারেননি মার্কিংয়ে। ফল যা হওয়ার তাই হলো। জাপানের কাছে ৩-১ গোলের হার।
প্রথম পর্বে ১৭ গোল হজম করে এক গোল দিয়ে তলানিতে থেকে দ্বিতীয় পর্বে প্রাক স্থান নির্ধারণীতে প্রতিপক্ষ চীন। তাদেরকে একবারই হারানোর রেকর্ড ছিল ২০১৩ সালে ওয়ার্ল্ড হকি লিগ রাউন্ড টুয়ে। এই ম্যাচের আগে একটি গুঞ্জন রটে যায়। সেটি হলো প্লেয়াররা কী পায়। অন্যান্য দেশের চেয়ে তাদেরকে কী সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়।

অবশ্য এটি নতুন কিছু নয়। প্রতিটি টুর্নামেন্টের আগেই এ বিষয়টি উঠে আসে। ম্যাচ চলাকালে অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশের প্লেয়াররা দশ ভাগের এক ভাগ ভাতাও পান না। অন্যান্য খেলায় সরকারের পক্ষ থেকেও পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকে। হকিতে যা দেয়া হয় সেটি খুবই নগণ্য। এখানে প্রতিটি প্লেয়ারই দেশের জন্য খেলে। একজন রিকশাওয়ালার আয়ও আমাদের চেয়ে বেশি। বলেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন খেলোয়াড়। তারা আরো বলেন, অনেকেই বিভিন্নভাবে সুযোগ-সুবিধার কথা বলেন কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। শুধু হকিকে ভালোবাসি বলেই খেলি। আমরা এশিয়া কাপ ও এশিয়ান গেমসে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করলাম। এখন কী পুরস্কার দেয়া হবে, সেটির অপেক্ষায় আছি। আমরা যদি খারাপই করতাম তাহলে এতক্ষণে যে কথাটি সবার আগে উঠত, সেটি হলো ‘আমাদের দেশপ্রেম নেই’। কিন্তু বাস্তবতাটা নিয়ে ভাবেন না কেউই, কষ্টটা আমাদের এখানেই।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.