পায়ে হেঁটে দরিদ্র আরজিনার কলেজ জীবন

রশিদ আনছারী চিলমারী, কুড়িগ্রাম

দরিদ্র আরজিনা প্রতিদিন প্রায় ১০ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে কলেজে যান লেখাপড়া করার জন্য। তার যাতায়াতে কিছু রাস্তা ভালো থাকলেও বেশির ভাগ রাস্তাই দুর্গম। তাই তাকে বাধ্য হয়ে পায়ে হেঁটে কলেজে যাতায়াত করতে হচ্ছে। তার চোখের দৃষ্টিশক্তি কম থাকায় ক্লাসে ব্ল্যাক বোর্ডে তাকাতে পারেন না। শিক্ষক ব্ল্যাক বোর্ডে কী লেখেন, তা সে দেখে না। এ কারণে বিজ্ঞান শাখা পরিবর্তন করে আরজিনা আক্তার উচ্চমাধ্যমিকে অধ্যয়ন করছে বাণিজ্য শাখায়। তবে তার প্রত্যাশা ছিল বিজ্ঞান শাখায় লেখাপড়া করে সমাজের দর্পণ হবে। কিন্তু কেউ তার দিকে তাকায়নি। এক দিকে দরিদ্র অপর দিকে গোটা শরীর ধবল।
জানা গেছে, গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের তিস্তা নদীর পাড় ঘেঁষা পাড়াসাদুয়া গ্রামের দিনমজুর আমিন উদ্দিনের বড় মেয়ে আরজিনা আক্তার। মা হাউসী বেগম গৃহিণী। আমিন উদ্দিন জানান, তার দুই ছেলে, দুই মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী এবং বৃদ্ধ মাসহ সাত সদস্যের সংসার। অল্প কিছু দিন হলো বৃদ্ধা মা মারা গেছেন। ছয় শতক জমির ওপর তার বাড়ি। এত দিন ছিল একটি টিনের ঝুপড়ি। মা মারা যাওয়ার পর মায়ের ঘরটি এখন তার। তা হলোÑ ভাঙাভুঙা দুইটি ঘর। আর অন্য কোনো জমিজমা তার নেই। এ সাত সদস্যের সংসার চালাতে আমিন উদ্দিনকে হাড়ভাঙা শ্রম দিতে হয়। কখনো কখনো তাকে যেতে হয় নিজ জেলার বাইরে। যেমনÑ বগুড়া দিনাজপুর, পাবনা, ঢাকা ময়মনসিংহ, নওগাঁ ও জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় যেতে হচ্ছে তাকে কাজের সন্ধানে। এভাবে চলে তার সাত সদস্যের সংসার নিভু নিভু করে। দিনমজুর আমিন উদ্দিন মজুরি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। একবেলা খাবার জুটলেও আরেক বেলা থাকে না। সংসারে উপার্জন করার আর কেউ নেই। ছেলে দু’টি একেবারেই ছোট। শত কষ্টের মাঝেও মেয়েকে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আজ কলেজ পর্যন্ত নিয়েছেন। তার স্বপ্ন মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলবেন। কিন্তু কিভাবে? কে নেবে তার স্বপ্নপূরণের ভার। আরজিনাকে বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে বাহারের ঘাট পর্যন্ত পৌঁছার পর বান্ধবীদের সহযোগিতায় অটোনছিমন গাড়িতে করে কলেজ পৌঁছতে হয়। অন্যথায় পায়ে হেঁটেই সম্পূর্ণ রাস্তা যেতে হয় তাকে। পথের গাড়ি ভাড়ার টাকা দেয়ার মতো সাধ্য তার বাবার নেই। তার পরও তার জামাকাপড় বইখাতা খাবারের ব্যবস্থা তো আছেই। একজন গরিব বাবা মেয়ের আবদার মেটাতে না পেরে মাঝে মধ্যে লজ্জায় চোখের পানি ফেলেন আর সৃষ্টিকর্তার দয়া কামনা করেন, মেয়েকে মানুষ করতে। আরজিনার গায়ের রঙ সাদা (ধবল) চোখের দৃষ্টি কম। মা-বাবা তাকে শত কষ্টের মাঝেও লেখাপড়া করার জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে থাকে। ২০১১ সালে পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষায় মাদারীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৪.৮৩ পেয়ে সাধারণ বৃত্তি পায়। ২০১৪ সালে জেএসসি পরীক্ষায় কাশিমবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে অংশ নিয়ে জিপিএ ৫ পেয়ে সাধারণ বৃত্তি পায়। ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় কাশিমবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ৪.২৭ পেয়েছে। বর্তমানে সে চিলমারীর গোলাম হাবিব মহিলা ডিগ্রি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক বাণিজ্য শাখায় অধ্যয়ন করছে। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি কম হওয়ায় ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ডে তাকাতে পারে না। বাধ্য হয়ে সে বিজ্ঞান শাখা বাদ দিয়ে বাণিজ্য শখায় পড়েছেন। চিলমারী গোলাম হাবিব মহিলা ডিগ্রি কলেজ কর্তৃপক্ষ যদি গরিব এই মেয়েটিকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়, তাহলে সে তার ভবিষ্যৎ লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে বলে আশা করা যায়। এ ছাড়া সমাজের দানবীর ব্যক্তিরা তার প্রতি আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে সে একদিন সমাজের দর্পণ হয়ে দাঁড়াতে পারবে। আরজিনা জানায়, জীবনে যত কষ্টই হোক লেখাপড়া করে আমার লক্ষ্যে পৌঁছার চেষ্টা চালিয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ। আরজিনার মা-বাবা জানান, আল্লাহর ইচ্ছায় কেউ যদি আমাদের মেয়ের সহযোগিতায় এগিয়ে আসত, তাহলে কিছুটা কষ্ট লাঘব হতো। বাড়িয়ে দেবেন কি কেউ সহযোগিতার হাত ?

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.