দেশ একদিন নিজ পায়ে দাঁড়াবে : আজিজা রাহিমজাদা

ভিন দেশ
মো: আবদুস সালিম


আজিজা রাহিমজাদা। ডাকনাম আজিজা। আজিজার বয়স এখন ১৬ বছর। বছর কয়েক আগে থেকে আজিজা সবার কাছে পরিচিত আফগানিস্তানের মানবাধিকারকর্মী হিসেবে। শিশুদের নিয়েই বেশি ভাবনা তার। তিনি মনে করেন, শিশুরাই দেশ বা বিশ্বের ভবিষ্যৎ। তাদের শিক্ষা, বাসস্থান, খাদ্য, সুপেয় পানি, নিরাপত্তা ইত্যাদি অধিকার নিশ্চিত করা গেলে এ সংক্রান্ত সব সমস্যা দূর হবে। আর সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন ‘শিশুদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে পরিচিত আজিজা রাহিমজাদা।
আজিজার জন্ম পারবান প্রদেশে এক যুদ্ধবিধ্বস্ত উদ্বাস্তু পরিবারে। এমন পরিবারে বড় হয়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন, আফগানিস্তানের মানুষ এখন কোন তিমিরে আছে। আজিজা বলেন, আমি শিশুদের নানা পরামর্শ দিই। শিক্ষার মূল্য কী তা বুঝাই। কারণ, যুদ্ধের বছরগুলোতে শিশুদের খুবই কষ্ট হয়েছে, যা বলার ভাষা আমার জানা নেই।’ তিনি আরো বলেন, শিক্ষিত নয় ওদের পরিবারগুলোও। সে জন্য এ সংক্রান্ত নানা বিষয় আগে বুঝাতে হয় অভিভাবকদের, যাতে তারা তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ বা উৎসাহিত হয়। অর্থাৎ এ জন্য দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়। তার পরও মনে করি সাফল্য আসবে।
আজিজার এ সংক্রান্ত সফলতা দেখে এসব কাজে এগিয়ে আসে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা মোবাইল মিনি সার্কাস ফর চিলড্রেন বা এমএমসিসি। এই সংস্থার কর্মকর্তারা বলেন, আজিজার আত্মবিশ্বাস ও কর্মকাণ্ড আমাদের উৎসাহিত করেছে। সে কারণে তার সাথে এক না হয়ে পারলাম না। আমরা দেখেছি, ক্রমে ক্রমে শিশুদের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে থাকে আজিজা। অবশ্য সংস্থা অনেক বছর আগে থেকে আফগানিস্তানে নানা ধরনের জনহিতকর কাজ করে আসছে। এই সংস্থা কেবল আফগান শিশুদের দেখাশোনা করে না, বরং তরুণসমাজের উন্নয়নের জন্যও কাজ করে যাচ্ছে। আজিজা ও তাদের লক্ষ্য হলো, যে করেই হোক সাম্প্রদায়িক সমস্যাও দূর করতে হবে। কারণ, একটি সমস্যা আরেকটি বিষয়ের সাথে জড়িয়ে আছে। এখান থেকে যথাযথ নেতৃত্ব দিতে পারে এমন কর্মঠ মানুষও খুঁজে বের করে আনতে হবে।
কাবুলে একটি শূরা বা পরামর্শ সভার আয়োজন করে সংস্থাটি। সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয় শিশুবান্ধব আজিজাকে। আজিজা শিশুদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। সুপেয় পানি, শিক্ষা ইত্যাদির কথা তুলে ধরেন। তার নানা প্রস্তাবে সাড়া দেয় সংস্থাটি। সবচেয়ে আগে জোর দেয়া হয় নিরাপদ পানির প্রতি। বলা হয়েছে, উদ্বাস্তু শিবিরে পানির স্বল্পতা থাকলে বা একেবারেই না থাকলে এর চাপ পড়ে শিশুদের উপরও। বড়দের পাশাপাশি শিশুদেরও দূর-দূরান্তে ছুটতে হয় পানি আনার জন্য। এতে তাদের খুবই কষ্ট হয়। অনেকে অসুস্থও হয়ে পড়ে। তখন চিকিৎসা, ভালো খাবার ইত্যাদিও তেমন জোটে না। এসব সমস্যার কথা ভেবে আজিজা নিজের ক্যাম্পের অগণিত পরিবারের জন্য পানির পাইপের ব্যবস্থা করেন। বিদ্যালয়ে যাওয়ার অধিকার আদায় করেছে প্রায় ২৫ হাজার উদ্বাস্তু শিশু। এসব জনহিতকর কাজে ব্যাপক সফলতার কারণে আজিজা পান আন্তর্জাতিক শিশুশান্তি পুরস্কার। তিনি বলেন, ছড়িয়ে দেয়া হোক শিক্ষার বিশ্বজনীন অধিকারের বার্তা। তাহলেই আফগান তরুণসমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে যথাযথ মৌলিক অধিকার। মাথায় স্কার্ফ জড়ানো মাটির ঘরের মেঝেতে বসে আজিজা গণমাধ্যমকে বলেন, এসব শিশু যুদ্ধের সরাসরি বা প্রত্যক্ষ ফল। তবুও আমার বিশ্বাস, নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিলেও ঠিকই একদিন ফিরে যাবে নিজেদের আসল ঠিকানায়। আর যা হচ্ছে তা সাময়িক। এখন সব বাধা অতিক্রম করতে হবে ধৈর্র্যের সাথে।
আজিজা এসব বিষয় নিয়ে সরকারি উচ্চপর্যায়েও আলাপ আলোচনা করেন। পার্লামেন্টেও স্থান পায় তা। এভাবে এগিয়ে যেতে থাকেন আজিজা। ক্রমে তহবিলেরও ব্যবস্থা হয়। তার মানে শিশু-কিশোরদের ভাগ্যের পরিবর্তন হতে থাকে। অনেকে বলেন, তার এ সাফল্য রীতিমতো বিস্ময়কর। শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়া মানে বিশাল পরিবর্তনের হাতছানি।
তাদের দুঃখ দুর্দশা দেখতে আজিজা ঘুরে বেড়ান বিভিন্ন প্রদেশে। তিনি দেখেন, স্কুলে যায় না বা যেতে পারছে না চার মিলিয়নের বেশি শিশু। ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ ২৫ বছরের নিচে, যাদের চাহিদা পাহাড়সম। কাবুলের প্রায় ৫৯টি উদ্বাস্তুশিবিরে রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার শিশু। আর এরাই দেশের সম্পদ। আজিজার মা একটি স্কুলের বাবুর্চি। এতেই বুঝা যাওয়ার কথা, তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। সফলতার পরও আজিজা রাহিমজাদা বলেন, ‘আমি সবার সহযোগিতায় যতটুকু করতে পেরেছি তা প্রয়োজনের তুলনায় কিছুই নয়। দেশ একদিন নিজ পায়ে দাঁড়াবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.