সুন্দরী প্রতিযোগিতা কি বিকিনি প্রসার বাড়ানোর চেষ্টা
সুন্দরী প্রতিযোগিতা কি বিকিনি প্রসার বাড়ানোর চেষ্টা

সুন্দরী প্রতিযোগিতা কি বিকিনি প্রসার বাড়ানোর চেষ্টা

ডয়চে ভেলে

বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা নতুন কিছু নয়৷ চলছে গত কয়েক দশক ধরে৷ কিন্তু বিতর্কও যেন পিছু ছাড়ছে না এ সব প্রতিযোগিতার৷ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে : সুন্দরী প্রতিযোগিতা কি নারীকে পণ্য হিসেবে তুলে ধরছে?

বিশ্বের অন্যতম সুন্দরী প্রতিযোগিতা ‘মিস ওয়ার্ল্ড'-এর যাত্রা শুরু সেই ১৯৫১ সালে৷ বর্তমানে বিশ্বে এখন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে চলছে এমন প্রতিযোগিতার কথা বিবেচনা করা হলে, সবচেয়ে পুরনো আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতা এটি৷ বর্তমানে এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখা হচ্ছে বলা হলেও শুরুটা ছিল ‘বিকিনি প্রতিযোগিতা' হিসেবে৷

বিকিনির প্রসার বাড়ানোর প্রতিযোগিতা
পঞ্চাশের দশকের শুরুর কথা৷ বিকিনি তখন বাজারে নতুন৷ সমাজে তখনো এটি প্রতিষ্ঠা পায়নি৷ বরং এই পোশাককে ‘অভদ্র' হিসেবেই বিবেচনা করা হতো, যারা পরতেন, তাদের কপালে জুটতো ‘বেহায়া' তকমা৷ এই পোশাককে তখন জনপ্রিয় এবং সমাজে গ্রহণযোগ্য করার দায়িত্ব নিলেন ব্রিটিশ টিভি হোস্ট এরিক মোরলে৷ ‘ফেস্টিভ্যাল অব ব্রিটেন-'এর অংশ হিসেবে তিনি চালু করলেন ‘বিকিনি প্রতিযোগিতা'৷

সুন্দরী প্রতিযোগিতায় কি বিকিনি রাউন্ড থাকা উচিত?
প্রথম প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন সুইডেনের কার্স্টিন হাকানসন৷ তিনি বিকিনি পরেই বিজয়ীর মুকুট গ্রহণ করেন, যা সেই সময় বিকিনি বিতর্কে ঘি ঢালে৷ তবে তাতে পিছিয়ে যাননি এরিক৷ বরং সিদ্ধান্ত নেন বিকিনি সুন্দরী বাছাইয়ের প্রতিযোগিতাকে বার্ষিক রূপ দেয়ার৷ তখন ‘মিস ওয়ার্ল্ড' টাইটেলটির ট্রেডমার্কও করে নেন নিজের নামে৷ আর এভাবেই ‘বিকিনি প্রতিযোগিতা' দ্রুতই ‘মিস ওয়ার্ল্ড' প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়৷ তবে রক্ষণশীল দেশগুলো থেকে শুরুর দিকে প্রতিযোগীদের তেমন পাওয়া যায়নি৷

অবশেষে ‘বিকিনি বাতিল'
শুধু রক্ষণশীল দেশগুলোই নয়, সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বিকিনি রাউন্ড বাতিলের কথা খোদ পোপও বলেছেন একসময়৷ ক্রমাগত বিতর্কের মুখে প্রতিযোগিতার বিকিনি রাউন্ডে নানা সময় পরিবর্তন আনেন এরিক৷ ১৯৭৬ সালে সাঁতারের পোশাকের বদলে ইভিনিংগাউন ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়৷ আবার ২০১৩ সালে সুইমওয়ারের সঙ্গে কোমরের নিচের দিকটা ঢাকতে বাড়তি এক টুকরো কাপড়ও যোগ করা হয়৷

তবে সবচয়ে বড় সিদ্ধান্তটি এসেছে ২০১৪ সালে, এরিকের মৃত্যুর ১৪ বছর পর৷ ‘মিস ওয়ার্ল্ড' প্রতিযোগিতার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, প্রতিযোগিতার বিকিনি রাউন্ড আর থাকছে না, ভবিষ্যতেও থাকবে না৷ অর্থাৎ পুরোপুরি বাতিল৷ মিস ওয়ার্ল্ডের চেয়ারওম্যান জুলিয়া মোরলে এই বিষয়ে বলেন, ‘‘মেয়েরা শুধুমাত্র বিকিনি পরে হাঁটাচলা করছে, এমনটা দেখার আমার দরকার নেই৷ এটা নারীর জন্য কোনো কিছু বয়ে আনে না৷ আর এতে আমাদের কারোরই বাড়তি কোনো কিছু হয় না৷''

শুধু মিস ওয়ার্ল্ড নয়, আরো আছে
আন্তর্জাতিক বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতার ধারাবাহিকতার বিচারে মিস ওয়ার্ল্ড সবচেয়ে পুরনো হলেও জনপ্রিয়তার দিক থেকে কেউ কেউ এগিয়ে রাখে ‘মিস ইউনিভার্স' প্রতিযোগিতাকে৷ ১৯৫২ সালে এই প্রতিযোগিতা শুরুর সময়েই বিকিনি নিষিদ্ধ করা হয়, যদিও তা পুনরায় চালু করা হয় ১৯৯৭ সালে৷ বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৯৯৬ থেকে ২০১৫ সাল অবধি এই প্রতিযোগিতা পরিচালনাকারী কোম্পানির মালিক ছিলেন৷

মিস ওয়ার্ল্ড এবং মিস ইউনিভার্সের বাইরে আরেকটি আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতার নাম ‘মিস আর্থ'৷ মূলত পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০১ সাল থেকে এই প্রতিযোগিতা শুরু করা হয়৷ এতে প্রতিযোগীদের বিকিনি পরা বাধ্যতামূলক৷ আর ২০০৩ সালে প্রতিযোগিতায় আফগান সুন্দরী ভিদা সামাদজাই বিকিনি পরায় নিজ দেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন৷

এখানে আরো একটি প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ না করলেই নয়, সেটি হচ্ছে, ‘মিস ইন্টারন্যাশনাল'৷ জাপানে ১৯৬০ সাল থেকে প্রতিযোগিতাটি চলছে৷ প্রতিযোগিতা শুরুর বছরে বিকিনি পরার বিষয়টি না থাকলেও ১৯৬৪ সাল থেকে তা বাধ্যতামূলক করা হয়৷ এছাড়া বিভিন্ন দেশে অসংখ্য সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়৷

নারীর ক্ষমতায়ন, নাকি নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার?
বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতার সঙ্গে বিকিনিকে জড়িয়ে বিতর্ক এজন্য যে, বিকিনির মাধ্যমে নারীর শারীরিক গঠনের দিকটির বিচার করা হয়, যা অনেকের মতে নারীকে পণ্য হিসেবে তুলে ধরারই নামান্তর৷ শুধু তাই নয়, সেরা সুন্দরী বাছাই করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীর উচ্চতা, শারীরিক গঠন, এমনকি গায়ের রং কেমন হবে তারও একটি মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেয়া হয়৷ ফলে নারীবাদীরা মনে করেন, এ ধরনের প্রতিযোগিতা আসলে শুধু নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিচার করে, যা সমাজে নারীর সৌন্দর্যের একটি মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেয়৷ ফলে, এই মাপকাঠি যারা উৎরাতে পারেন না, তারা হীনমন্যতায় ভোগেন৷ আর যারা সেই মাপকাঠিতে পৌঁছাতে চান, তারা সেটা করতে গিয়ে সময় এবং অর্থ দু'টিই খরচ করেন, যা প্রকারান্তরে বিভিন্ন কোম্পানির ব্যবসা বাড়াতে সহায়তা করছে৷

অন্যদিকে, সুন্দরী প্রতিযোগিতার পক্ষের মানুষরা এটিকে দেখছেন নারীর ক্ষমতায়নের এক মাধ্যম হিসেবে৷ বিশেষ করে, বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় মেয়েদের মেধা, নেতৃত্বদানের ক্ষমতা, শিক্ষাগত যোগ্যতাও বিবেচনায় আনা হচ্ছে, যা ইতিবাচক হিসেবে মনে করছেন তারা৷ এ ধরনের প্রতিযোগিতা নারীকে ঘরের বাইরে নিয়ে আসছে, তার আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে বলেও বিশ্বাস করেন কেউ কেউ৷

তবে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতা নিয়ে নানা বিতর্কের বাইরে মাঝে মাঝেই প্রতিযোগীদের নিয়েও বিতর্কের সৃষ্টি হয়৷ ২০১২ সালে মিস ইউনিভার্স ক্যানাডা হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যান জেনা টালাচকোভা৷ শুরুর দিকে তাকে গ্রহণে আপত্তি জানায় কর্তৃপক্ষ, কেননা, তিনি ছিলেন হিজড়া, অর্থাৎ জন্মগতভাবে নারী নন৷ পরে অবশ্য তীব্র আপত্তির মুখে টালাচকোভাকে গ্রহণ করে আয়োজক কর্তৃপক্ষ৷ তবে তার পুরস্কার জয় করা হয়নি৷

আবার কেউ কেউ পুরস্কার জিতেও তা ধরে রাখতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন৷ ১৯৯৬ সালে ‘মিস ইউনিভার্স' জয় করেন ভেনিজুয়েলার আলিসিয়া মাচাডো৷ কিন্তু পুরস্কার জয়ের কিছুদিন পর খবর আসে তিনি অনেক মুটিয়ে গেছেন৷ আর আয়োজক কর্তৃপক্ষও তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে তার পুরস্কার প্রথম রানার-আপকে দেয়ার কথা বিবেচনায় আনে৷ যদিও শেষমেষ সেটা হয়নি৷ কিন্তু শুধুমাত্র মুটিয়ে যাওয়ায় আয়োজকদের এমন আচরণ অনেকেই পছন্দ করেননি৷ এছাড়া প্রতিযোগিতার আগে বিয়ের কথা লুকানোয়, অন্তসত্ত্বা হওয়ায় কিংবা পুরস্কার জয়ের পর বাড়াবাড়িরকম যৌন সম্পর্কে জড়ানোর দায়েও খেতাব খোয়ানোর রেকর্ড রয়েছে৷

বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও বাণিজ্যিক দিক দিয়ে এগুলো অত্যন্ত লাভজনক আয়োজন৷ মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর এসব প্রতিযোগিতার প্রচার সত্ত্ব কিনতে রেকর্ড অর্থ খরচ করে৷ আর বিভিন্ন প্রসাধনী প্রতিষ্ঠানও নানাভাবে লাভবান হয় প্রতিযোগিতাগুলো থেকে৷ ফলে বিতর্ক যতই থাক, সেরা সুন্দরী খোঁজার এসব প্রতিযোগিতা কখনো থামবে, এমন ইঙ্গিত নেই৷

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.