চোখের জলে

সিরাজুল করিম

গতকাল থেকে নাসরিন অকারণে আমার ওপর অভিমান করে আছে। তার অভিমান ভাঙানোর জন্য আমি সকাল থেকে তাকে কিছুক্ষণ পর পর টেলিফোন করছিলাম। অনেক চেষ্টার পর অবশেষে সে টেলিফোন ধরল দ্বিপ্রহরের ভরদুপুরে। 

রাজ! কী ব্যাপার! তুমি যে বারবার আমাকে টেলিফোন করছ!
একা ভালো লাগে না, তাই।
তা হলে কাউকে নিয়ে এসো।
আমি গরিব, কেউ আমার কাছে আসে না।
চেষ্টা করে দেখেছ?
না দেখিনি।
তা হলে কী করে বুঝলে আমি আসব তোমার কাছে, সাড়া দেবো তোমার ডাকে?
বোঝা যায় তোমার চোখ দেখলেই, বোঝা যায় তা তোমার চোখের তারায় তারায়, চোখের ভাষায়।
সব বোঝ, শুধু বোঝ না আমার শূন্যতা, আমার হাহাকার।
বুঝি বলেই তো হাহাকার তাড়াতে চাই, তোমার শূন্য হৃদয় আমার ভালোবাসায় ভরাতে চাই। এখন বলো কখন আসছ?
যখন ডাকবে, যখন বলবে তখন।
তা হলে এসো বিকেল চারটায়, রেলওয়ের হেড অফিসের সামনে সাত রাস্তার মাথায়।
ভাবলাম নাসরিনের অভিমান ভেঙেছে। নাসরিনের মনের জমানো বরফ গলে জল হয়ে যেন দুর্বার বেগে সাগর পানে ছুটে চলছে।
চারটা বেজেছে কবে। নাসরিন আসে না। আমার মন অস্থির হয়ে ওঠে তার জন্য। আবার টেলিফোন করব ভাবছি, এমন সময় নাসরিন এলো রিকশায় করে কদমতলির দিক থেকে। হাতে একটা ব্যাগ।
এত যে দেরি করলে?
দেখছ না বুড়োটা রিকশা টানতেই পারে না।
তা হলে জোয়ান মরদের রিকশায় উঠলে তো হতো। তাড়াতাড়ি আসতে পারতে। আরো বেশিক্ষণ থাকতে পারতাম।
আসতে পেরেছি এটাই তো সৌভাগ্য।
সৌভাগ্য কার? আমার না তোমার?
আমাদের দু’জনের।
এবার চলো সামনের বাটালি পাহাড়ে।
না, অত উঁচুতে উঠতে পারব না।
কেন? তোমার শরীর তো হালকা। এখনো ভারী হয়নি।
আমি তো আছি। উঠতে পারবে আমার হাত ধরে, আমার হাতে হাত রেখে।
ক’দিন থাকবে আমার সাথে যে তোমার হাত ধরে উঠব আর বসব।
যত দিন বলবে তত দিন।
যদি বলি সারা জীবন।
তা হলে তাই।
আচ্ছা সে দেখা যাবে।
পাহাড়ের কোল বেয়ে আমরা হেঁটে চলেছি পাশাপাশি। দু’পাহাড়ের মাঝে পিচঢালা পথ চলে গেছে এঁকে বেঁকে। মোড় ফিরলেই টাইগার পাস। একটু পর বাটালি পাহাড়। অবশেষে নাসরিনকে নিয়ে আমি পাহাড়ের পাদদেশে এসে দাঁড়ালাম। তাকালাম ওপরের দিকে। পাহাড়ের গোড়া থেকে এক চিলতে আকাশ দেখা যায়। সাদা মেঘ খেলে বেড়ায় আকাশের গায়। পাশের বনে বনে কাশফুল। শরতের ঝরে পড়া বিকেলে যেন সূর্যের আলোয় ছড়িয়ে পড়ছে হলুদ রঙের আভা। আমরা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছি। নাসরিনের হাত আমার হাতে। বাটালির চূড়ায় ওঠে চার দিক তাকালাম। এক নজরে চট্টগ্রাম শহর আর বন্দর দুটোই দেখলাম। দেখলাম কাছের আর দূরের পাহাড়, সাগরের মোহনায় ঝাঁক ঝাঁক জাহাজ আর কর্ণফুলীর বুকে সারি সারি ভাসমান সাম্পান।
রাজ!
বলো!
চট্টগ্রামের সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ, আমি অভিভূত। এত সুন্দর তোমাদের চট্টগ্রাম। এখানে না এলে বোঝাই যেত না।
বললাম, আমাদের নয়, চট্টগ্রাম আমাদের তোমাদের সবার।

ক’দিন হলো। নাসরিন এসেছে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম দেখবে বলে। দেখে চোখ জুড়াবে, মন ভরাবে। আমার সাথে তার পরিচয় ঢাকায় ক’বছর আগে। সন তারিখ মনে নেই। মাঝে মাঝে দেখা হতো। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছেড়ে আমরা দিগি¦দিক ছুটে বেড়াতাম। গত কয়েক দিন থেকে আমি আছি তার সাথে ছায়ার মতো। ছায়া যেমন কায়া ছাড়ে না, এ ক’দিন থেকে সেও তেমনি ছাড়েনি আমাকে। গতকাল গিয়েছি পতেঙ্গায়। সৈকতে গিয়ে সাগরের ঢেউ গুনেছি, দু’জনে অনেকক্ষণ সাগরজলে ভেসেছি। নাসরিন উঠেছে ফ’য়জ লেকের অভিজাত এলাকায় তার এক আত্মীয়ের বাসায়। আজ সে বিদায় নিয়ে এসেছে তাদের থেকে ঢাকায় ফিরবে বলে।
রাজ! কী হলো, কথা বলছ না যে!
তুমি যে প্রেমে পড়েছ, তাই কথা হারিয়ে নির্বাক হয়েছি।
বলত কার প্রেমে?
কেন, চট্টগ্রামের।
হ্যাঁ, তাই। তুমি ঠিকই বলেছ। আমি তার প্রেমে পড়েছি। আমি তার প্রেমের বাঁধনে ধরা দিয়েছি। নিজের বুকে হাত দিয়ে বললাম, তাহলে চট্টগ্রামের এই গরিবের কী হবে?

যা হওয়ার তা-ই হবে। আমি চট্টগ্রামের প্রেমের জোয়ারে ভেসে বেড়াব আর তুমি আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়বে। আমি থাকব চট্টগ্রামকে নিয়ে মিলনের আনন্দে আর তুমি জ্বলবে বিরহের জ্বালায়। এই বলে সে আমার দু’হাত তার কোলে তুলে নিলো। পাশের সিঁড়িতে আমরা কতক্ষণ বসে রইলাম মনে নেই। তবে মাগরিবের আজানের ধ্বনিতে বুঝতে পারলাম সন্ধ্যা হয়েছে।
চার দিকে দ্রুত আঁধার নেমে আসছে। বৈদ্যুতিক আলো তা যেন প্রতিহত করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। দূরের জাহাজে আলো নয়, যেন জোনাকি পোকার দল পাখা মেলে দুলছে। নাসরিনকে বললাম, তোমার ট্রেনের সময় হয়ে এসেছে, চলো উঠি।
অনুরোধের সুরে নাসরিন বলল, আরেকটু বসি। বললাম, শেষ মুহূর্তে মায়া বাড়িয়ে লাভ কী? ও বলল, মায়া তো ছাড়ে না। মায়া আছে জড়িয়ে আমার সারা অঙ্গে গোটা শরীরে। মায়া ভরে আছে আমার দেহ মন। আমি যে মায়ার জালে জড়িয়ে পড়েছি।
নাসরিন এত মায়া কার জন্য?
যে আমার পাশে আছে আমার মন জুড়ে, আমার মন ভরে তারই জন্য। প্রয়োজনে সব কিছু উপেক্ষা করে আমি জীবনভর তার জন্য অপেক্ষা করব। এই বলে সে তার দু’হাত দিয়ে আমাকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি তার দু’হাত থেকে নিজকে মুক্ত করলাম। আমরা রিকশায় এলাম অদূরে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে। ব্রিটিশ আমলের নির্মিত পুরনো স্টেশনের পাশেই নতুন স্টেশন, আধুনিক স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন। ঢাকার উদ্দেশে গ্রিন অ্যারো ট্রেনখানা দাঁড়িয়ে আছে ৩ নম্বর লাইনে। ২ নম্বরে আছে শাখা লাইনের ট্রেন পটিয়া হয়ে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী। নাসরিন ট্রেনে উঠল। আমিও উঠলাম তার সাথে। কিছুক্ষণ বসলাম তার পাশের শূন্য আসনে। ট্রেন ছাড়ার বাঁশি বাজল। নাসরিন থেকে বিদায় নিয়ে আমি নেমে পড়লাম। এবার ইঞ্জিনের হুইসেলের শব্দে নাসরিন কেঁপে ওঠে। জানালা দিয়ে তার দু’হাত তখনো আমার দু’হাতে। আমার দু’হাত সে ধরে আছে শক্তভাবে। ট্রেন ছেড়ে দিলো। আমাদের হাতের বাঁধন আলগা হলো। ছিন্ন হলো কোভেলেন্ট বা ইলেকট্রোভেলেন্ট নয়। ছিন্ন হলো আমাদের দু’জনের দু’হাতের বন্ধন। নিজের অসহায় দু’হাত টেনে নিলাম নিজের দিকে। হাত ছাড়ানোর সময় হাতে কিসের যেন উষ্ণতা অনুভব করলাম। দেখলাম, নাসরিনের দুফোটা চোখের জল আমার দু’হাত বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। চানমিয়া লেনের ফুফাতো ভাইয়ের ভাড়া করা বাসাই আমার আস্তানা, আমার ঠিকানা। সেখানে ফিরতে ফিরতে বারবার জিজ্ঞেস করলাম নিজেকে, নাসরিন কি আমার থেকে বিদায় নিলো? নাসরিন কি তাহলে আমাকে বিদায় দিলো তার চোখের জলে?

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.