মাদরাসা শিক্ষায় সামগ্রিকতা অপরিহার্য

মাওলানা সাইয়েদ সালমান হুসাইনী নদভী

আমরা যে নবীর উম্মত, তিনি বিশ্বনবী। সেই নবীর আলোচনা হতেই পারে না আন্তর্জাতিকতা ছাড়া, বিশ^জনীনতা ছাড়া ও বিশ^ায়ন ছাড়া। সেই নবীর কার্যক্রম শুরু হয়েছে এখান থেকে যে, তিনি রাহমাতুল্লিল আলামিন। তিনি পুরো মানবতার নবী। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেনÑ
‘(হে নবী!) আপনি বলুন, হে মানুষেরা, আমি তোমাদের সবার কাছে আল্লাহর রাসূল। (সূরা আরাফ-১৫৮)।
আর তিনি যে ব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন, তা ছিল বিশ^জনীন ব্যবস্থা। তিনি কী শিক্ষাব্যবস্থা এ জন্য নিয়ে এসেছিলেন যে, কিছু সংখ্যক প্রথাগত আলেম তৈরি হবেন যারা মিম্বার ও মেহরাবের শোভা হবেন, যারা সিরাতের বয়ান দেবেন, যারা ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন? আবু বকর, ওমর, উসমান, আলী, খালেদ ইবনুল ওলিদ, আমর ইবনুল আস, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, জায়দ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহুম আরো নাম নিতে থাকুনÑ তাদের কি তৈরি করা হয়েছিল শুধু এ জন্য যে, তারা আমাদের মিম্বর ও আমাদের মেহরাবের শোভা হবেন? আমাদের খানকাহ ও মাদরাসাগুলোতে কিছু সাধক ও বুজুুর্গ তৈরি হয়ে যাবেন? নবীর মিশনের কী এই উদ্দেশ্য ছিল? নবীর মিশন প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেনÑ
‘সেই সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে পথনির্দেশনা ও সত্যধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন এ জন্য যে, তিনি তাকে জয়ী করবেন সব ধর্মের ওপর যদিও মুশরিকরা অপছন্দ করে’ (সূরা সফ্ফ-৯)
আল্লাহ তায়ালা নবী মিশনের মহান উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। সুতরাং তিনি কি এতে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন যে, জাহেলি ব্যবস্থায় জোড়াতালি লাগানো হবে? তিনি কি এতে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন যে, সারা বিশে^ চলবে অন্য কোনো ব্যবস্থা? মুসলিম দেশের অলিগলিতে সেকুলার ব্যবস্থা চালু হবে যা ভিক্ষা চেয়ে নেয়া হয়েছে ব্রিটেন থেকে? আমেরিকা থেকে ভিক্ষা চেয়ে নেয়া হয়েছে? ইউরোপের থুথু চেটে মানুষ জীবনযাপন করবে? আর ইসলাম যে তাওহিদি ব্যবস্থার উন্মেষ ঘটিয়েছে তা ভুলে যাবে? ইসলাম সেই সময়ে রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের অট্টালিকা খান খান করে দিয়েছিল এবং প্রমাণ করেছিল মানুষকে গোলাম করে রাখা যায় না। ইসলামের নীতি ও আদর্শ উচ্চারণ করেছিলেন একজন অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত সাহাবি (রিবয়ি ইবনে আমের) ইরানের সেনাপ্রধান রুস্তমের সামনে। তিনি বলেছিলেনÑ
‘আল্লাহ তায়ালা আমাদের অভ্যুদয় ঘটিয়েছেন এ জন্য যে, তিনি যাকে চান তাকে আমরা বান্দার গোলামি থেকে উদ্ধার করে এক অদ্বিতীয় আল্লাহর দাসত্বে, পৃথিবীর সঙ্কীর্ণতা থেকে প্রশস্ততায় এবং ধর্মগুলোর অত্যাচার থেকে ইসলামের সুবিচারের দিকে নিয়ে যাবো। অর্থাৎ আমরা একটি ইনসাফপূর্ণ ব্যবস্থার উন্মেষ ঘটাতে এসেছি, আমরা মানুষকে অত্যাচার থেকে উদ্ধার করতে এসেছি, সব ধরনের শোষণ থেকে রক্ষা করতে এসেছি, মানবতাকে জালিমদের কবল থেকে মুক্ত করতে এসেছি এবং ধর্মগুলোর অত্যাচার ও অবিচার থেকে মুক্ত করতে এসেছি।’
মোট কথা, ইসলামের সূচনা হয়েছিল তার এই শিক্ষাদর্শন ঘোষণার মাধ্যমে।
‘পড়ো নিজের সেই প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন’ (সূরা আলাক-১)।
তাঁর নামগুলো ও গুণাবলি, সত্তা ও কার্যাবলির ওপর দৃঢ় বিশ^াস রেখে পড়ো, যিনি সৃষ্টি করেছেন। এখানে তাঁর সৃষ্টি বিশেষণ উল্লেখ করা হয়েছে এবং কী পড়তে হবে তা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। তবে সৃষ্টি বিশেষণ উল্লেখ করায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ‘প্রত্যেক সৃষ্টিকে পড়ো।’ তিনি সৃষ্টিকুলের স্রষ্টা। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে পড়ো। তাঁর নিদর্শনাবলির মাধ্যমে তার নিকট পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করো। তাঁর নিদর্শনাবলি রয়েছে গাছের পাতায় পাতায়, পানির ফোঁটায় ফোঁটায়, বাতাসের প্রবাহে, ফলে ফলে, ফুলে ফুলে, অণু-পরমাণুতে, তারকারাজি ও গ্রহপুঞ্জে, নক্ষত্রপুঞ্জে।
‘আর রয়েছে তোমাদের নিজেদেরই সত্তায়, তবুও কি তোমরা দেখ না?’ (সূরা জারিয়াত-২১)।
তাঁর নিদর্শন রয়েছে তোমাদের অস্তিত্বে, মস্তিষ্কে, দেহের কাঠামোয়, কোষগুলোতে (ঈবষষং), তোমাদের শিরা-উপশিরায়।
আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করছেনÑ ‘আমি তাদেরকে পর্যায়ক্রমে দেখাব আমার নিদর্শনাবলি আকাশমণ্ডলীতে এবং তাদের নিজেদের সত্তায়ও, এ পর্যন্ত যে, তাদের কাছে এ সত্য উদ্ভাসিত হয়ে যাবে যে, আল্লাহ তায়ালা সত্য’ (সূরা হা-মিম সাজদা-৫৩)।
সুতরাং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে যে শিক্ষাব্যবস্থার উন্মেষ ঘটানো হয়েছিল, তা জাপানের প্রান্ত থেকে আমেরিকার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত, ককেশাস থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত এবং সুমেরু থেকে কুমেরু পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু আমরা ত্রুটি করেছি। আমরা স্পেন থেকে বের হওয়ার পর সেই সূত্র ভুলে গিয়েছি। আমরা ইবনে খালদুন, শাতেবি, ইবনে তায়মিয়া হাররানি, মুজাদ্দিদে আলফেছানি এবং শাহওয়ালি উল্লাহ দেহলভিকে ভুলে গিয়েছি। আমরা জাহরাবি, কিন্দি, ফারাবি এবং ইবনে সিনাকে ভুলে গিয়েছি। ফল হয়েছে এই, আমরা দ্বারে দ্বারে ঘুরতে বাধ্য হচ্ছি। আমরা ভিখারির পেয়ালা হাতে নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা অন্যদের কাছে চেয়ে বেড়াচ্ছি এবং একটি ছোট্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অবস্থান করে ভাবছি, নবীর ওয়ারিস এসব আলেম যারা মাদরাসার চার দেয়ালের মধ্যে তৈরি হচ্ছেনÑ যাদের হাতে না আছে আইন, না আছে রাজনীতি; না আছে শাসন, না আছে প্রশাসন, না আছে সমাজ, না আছে অর্থনীতি, যাদের হাতে না আছে সংস্কৃতি ও না আছে সভ্যতার নিয়ন্ত্রণ। তারা সম্পূর্ণ কোণঠাসা ও তাদেরকে আতঙ্কের দৃষ্টিতে দেখা হয়। তাদের ওপর নানা অভিযোগ আরোপ করা হয়। তাদেরকে বিশে^র জন্য আতঙ্কের পাত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যাদের কাজ ছিল আবু বকর সিদ্দিক, ওমর ফারুক, ওসমান, ইবনে আফফান এবং আলী ইবনে আবী তালেবের খেলাফতের ভার নেয়া, তারা কুফুর ও শিরক ব্যবস্থার অনুসারী ও অনুগত, বরং সুবোধ শিষ্য ও ছাত্রে পরিণত হয়েছে।
বারো-তেরোশ বছরের ইতিহাসে এমনকি কখনো হয়েছে যে, আমাদের কোনো দেশে দু’টি শিক্ষাব্যবস্থায় ছিল। একটি ধর্মীয় এবং অন্যটি ধর্মহীন। দুই প্রকারের আইন। দুই ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা। যুগলতা ও দ্বৈততার কোনো নজিরই ছিল না। মাওলানা মানাজির আহসান গিলানী রহ:-কে আল্লাহ তায়ালা উঁচু মাকাম দান করুন। তিনি তাঁর ‘হিন্দুস্তানকে নেজামে তালিম ওয়া তারবিয়াত’ গ্রন্থে প্রমাণ করেছেন, প্রত্যেক স্থানে মুসলমানদের একটি একক শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল। ইংরেজরা ও প্রত্যেক দেশের সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি তা ধ্বংস করে নিজেদের অসার ব্যবস্থা চালু করেছে।
হজরত মাওলানা কাসেম নানুতবি রহ: যখন শামেলিতে যুদ্ধের ময়দানে পরাজিত হলেন তখন যেন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এখন বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তার যুদ্ধ অবলম্বন করতে হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি অসহায় অবস্থায় ছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তাঁর হাতে ক্ষমতা ছিল না। নিজের সামগ্রিক ও সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার সুযোগ ছিল না। এ জন্য তিনি চেয়েছিলেন, অবশিষ্ট যতটুকু মূলধন আছে, তা সংরক্ষণ করা যাক। যেমন ১৯৭২ সালে যখন ভারতে মুসলিম পার্সনাল ‘ল’ বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যখন শরিয়া আদালতের যুগ শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং পারিবারিক আইনও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল, তখন উলামায়ে কেরাম ঐক্যবদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, কমপক্ষে ইসলামের পারিবারিক আইন সংরক্ষণের জন্য একটি বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা এই আইন সংরক্ষণের চেষ্টা করবে। কিন্তু বলুন, ইসলাম কি শুধু পারিবারিক আইনের নাম? আমরা যদি অসহায় ও অপরাগ অবস্থায় একটি ছোট পরিসর সংরক্ষণের চিন্তা করে থাকি, তাহলে আমাদের অতীতের বিস্তৃত পরিসর ভুলে যাওয়া উচিত এবং কয়েকটি টুকরায় সন্তুষ্ট থাকা উচিত।
বর্তমানে মাদরাসাগুলোতে যে ব্যবস্থা চালু আছে, সত্য কথা হলোÑ তা ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার একটি ছোট্ট অংশ, কাপড়ের একটা টুকরা, খাবারের একটি লোকমা, সমষ্টির একটি অংশ।
এ জন্য উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব হলোÑ তারা সেই ব্যক্তিদের দল তৈরি করবেন, যারা পূর্ণ যোগ্যতার সাথে জীবনের ব্যবস্থা হাতে নিতে পারেন। এ জন্য শিক্ষার ইসলামীকরণ প্রয়োজন। আধুনিক ও ধর্মীয় বিভাজনের অবসান হওয়া প্রয়োজন। শরিয়তই আধুনিক। ইসলামে আধুনিক যুগের সব সমস্যার সমাধান রয়েছে। এর জন্য বাস্তব পরিস্থিতি বদলাতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা নিজেদের হাতে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাকে আধুনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতোই মিশ্র রাখতে হবে। তাতে দেশীয় ভাষা, আরবি ভাষা ও ধর্মশিক্ষা দশম শ্রেণী পর্যন্ত রাখতে হবে। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষায় পৃথক পৃথক অনুষদ ও গবেষণার কাজ শুরু করতে হবে। শরিয়া বিভাগ, ভাষা বিভাগ, চিকিৎসা বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ, আধুনিক বিজ্ঞান বিভাগ ইত্যাদি বিভাগে মাধ্যমিক স্তর সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারবে।
ইসলামাবাদ ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ও কুয়ালালামপুর ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির নমুনা কাজে লাগানো যেতে পারে। দ¦ীনি মাদরাসা ও জামেয়াগুলোকে ধীরে ধীরে ওই নিয়মে নিজেদের পরিবেশ, নিজেদের দীক্ষা ও নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রেখেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এভাবেই আমাদেরকে একক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এখন প্রাথমিক পর্যায়ে মাদরাসার সাথে সাথে ও মাদরাসার তত্ত্বাবধানে ইসলামি স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু এই দ্বৈত শিক্ষাব্যবস্থা স্থায়ীভাবে থেকে যেতে পারে না। এ জন্য পর্যায়ক্রমে সেই একক শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের চেষ্টা সাধনা করতে হবে।
আলহামদুলিল্লাহ, এখন বিভিন্ন স্থানে ইসলামি স্কুল ও কলেজের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে এবং ইসলামি বিশ^বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতাও আমাদের সামনে রয়েছে। এগুলো কাজে লাগানো প্রয়োজন।
লেখক : দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামার শরিয়াহ বিভাগের ডিন এবং জামেয়া সাইয়েদ আহমদ
শহীদ-এর রেক্টর)
অনুবাদ : মাওলানা লিয়াকত আলী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.